সাম্প্রতিক বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটিও যে আর প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়, সে কথা বলাবাহুল্য। অবশ্য স্মরণ করা যেতে পারে যে, দুই দশক আগেই এদেশের একজন কবি- লেখক-অধ্যাপক সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের সর্বোচ্চ এই পদটিকে ‘উপাশ্চার্য’ বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন। এই অভিধার মর্মার্থ ওই লেখকের সমকালে খুব বেশি বোঝা না গেলেও এখন যেন তা অক্ষরে অক্ষরেই যথার্থ বলে প্রমাণিত হচ্ছে। একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেক জন উপাচার্যের অনৈতিক ও বিতর্কিত কর্মকান্ড সম্পর্কিত সংবাদ শিরোনামই এটা বোঝার জন্য যথেষ্ট। তদুপরি বিতর্কিত এই উপাচার্যদের কয়েকজনের কর্মকান্ড এতদূর গড়িয়েছে যে, কোনো অভিধাই আর যথেষ্ট মনে হয় না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান এমনই একজন। পরপর দুই মেয়াদে দায়িত্বে থাকাকালে নানা বিতর্কিত কাজের জন্য তুমুলভাবে সমলোচিত ছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উপাচার্যদের অনৈতিক কর্মকান্ড বোঝাতে ‘সোবাহানিয়াকান্ড ’ অভিধাটিও চালু হয়েছিল তার নামানুসারেই।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উপাচার্য তার শেষ দুই কর্মদিবসে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সব ধরনের বিধিনিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যে কান্ড ঘটিয়েছেন তার নজির সম্ভবত ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। গত ৬ মে শেষ কার্যদিবসের আগের রাতে নয়জন শিক্ষকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিভিন্ন পদে মোট ১৪১ জনকে নিয়োগ দেন রাবি উপাচার্য অধ্যাপক সোবহান। এর আগে তিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন করে অবৈধভাবে নিজের মেয়েজামাইসহ আরও ৩৪ জন শিক্ষককে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করছিল বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিশনের তদন্ত কমিটি। সোমবার দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, অধ্যাপক এম আবদুস সোবহানের শেষ কর্মদিবসে নিয়োগ দেওয়া ১৪১ শিক্ষক-কর্মচারী এবং পূর্ববর্তী সময়ে নিয়োগ দেওয়া আরও ৩৪ জন শিক্ষকের নিয়োগসহ মোট ১৭৫ জনের নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে ‘বিধিবহির্ভূতভাবে’ এই নিয়োগ দেওয়ার জন্য অধ্যাপক সোবহানসহ দোষীদের বিচারের আওতায় আনা এবং তার বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞারও সুপারিশ করেছে কমিটি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তদন্ত কমিটি নির্ধারিত সাত কর্মদিবসের মধ্যেই তদন্ত শেষ করে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাবির এসব অবৈধ নিয়োগ বাতিল করা এবং অভিযুক্ত উপাচার্যসহ তাকে সহায়তাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।
উল্লেখ্য যে, গত বছরের ১০ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় রাবি উপাচার্য সোবহানকে চিঠি দিয়ে তার জামাতার নিয়োগ বাতিলসহ রাবিতে সব ধরনের নিয়োগ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা লংঘন করে বিদায়ের একদিন আগে তিনি ১৪১ জনকে নিয়োগ দেন। এছাড়া তিনি তার জামাতার নিয়োগও বাতিল করেননি। বরং সিন্ডিকেট সভা ডেকে তা স্থায়ী করেন গত ৩ মে বিদায়ের ঠিক তিন দিন আগে। নিয়োগ দেওয়া শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকাংশই সরাসরি ছাত্রলীগ নেতাকর্মী, আওয়ামী লীগ সমর্থক পরিবারের সদস্য বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পুলিশের কড়া পাহারায় ভিসি সোবহান ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। জানা গেছে, বিতর্কিত এসব নিয়োগের সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনে অধ্যাপক সোবহান ও তাকে সহযোগিতাকারী একজন ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও দুজন সহকারী রেজিস্ট্রার এবং উপাচার্যের জামাতাকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। নিয়োগ ঠেকাতে তৎপর না হওয়ায় দুই উপ-উপাচার্যকেও দায়ী করা হয়েছে। তবে উপাচার্য সোবহান এসব নিয়োগের সব দায় তার বলে নিজেই স্বীকার করেন। এখন প্রশ্ন হলো, উপাচার্য সোবহানসহ দোষী সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হবে কি না? নাকি বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এই তদন্ত প্রতিবেদনও অন্য অনেক প্রতিবেদনের মতো কালের আবর্তে চাপা পড়ে যাবে?
উপাচার্যের দায়িত্বে থাকাকালে দুই মেয়াদেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি ও টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগসহ নানারকম দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন রাবির এই সদ্য সাবেক উপাচার্য। এতসব অভিযোগ আর তদন্তের পরও যদি তিনি পার পেয়ে যান এবং তার দেওয়া অবৈধ নিয়োগ বাতিল না হয় তাহলে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। মনে রাখা দরকার, দেশের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য এবং দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। এই আট উপাচার্যের বাইরে আরও ১৩ উপাচার্যের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে তদন্ত শেষ করেছে কমিশন। মোট ২১ উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের বেশির ভাগই স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ, ভবন নির্মাণ ও কেনাকাটায় আর্থিক দুর্নীতি সংক্রান্ত। এই নির্মম বাস্তবতা থেকে দেশের উচ্চশিক্ষা ও বিশ^বিদ্যালয়গুলোকে বাঁচাতে দুর্নীতিগ্রস্ত উপাচার্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
