নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম রেললাইনকে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প গ্রহণের আগেই করা হবে সম্ভাব্যতা যাচাই। এজন্য সাড়ে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে রেল বিভাগ। যদিও এই রেলপথে হাইস্পিড ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে রেল বিভাগ। প্রস্তাবের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পিইসি সভার কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন নির্মাণের প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত উপযোগিতা যাচাই করতে চায় রেলওয়ে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ওভারহেড ক্যাটেনারি, সাব-স্টেশন এবং উপযুক্ত প্রযুক্তির চাহিদা নির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ কৌশল সম্পর্কে সুপারিশ প্রদান করা হবে।
এছাড়া বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পের জন্য বিদ্যুতের বর্তমান চাহিদা ও প্রাপ্যতা নির্ধারণ করা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলের জন্য সুপারিশও প্রদান করা হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো একই প্রাকৃতিক এবং অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অন্য দেশে গৃহীত ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ কৌশল সম্পর্কে সুপারিশ আমলে আনা হবে। সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পে বিদ্যমান নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ট্র্যাফিক পূর্বাভাস, লেভেল ক্রসিং গেট এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ের ওপর ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন গ্রহণ সম্পর্কিত স্পর্শকাতরতা বিশ্লেষণ করা হবে। প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হচ্ছে ১৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। চলতি বছর থেকে ২০২২ সালের আগস্ট নাগাদ কাজ শেষ করার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে। যদিও পরিকল্পনা কমিশন মেয়াদ আরও বাড়ানোর কথা বলেছে।
রেল বিভাগ জানায়, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিশদ ডিজাইনের জন্য পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ৪ জন ৩৬ জনমাস এবং স্থানীয় ১৩ জন ৭৮ জনমাস (একজন ব্যক্তির মাসভিত্তিক কাজকে জনমাস বলে)। এজন্য অফিসের যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র ক্রয় করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, দেশের বিভিন্ন রেল প্রকল্পকে ব্রডগেজ থেকে মিটারগেজ ও ডুয়েলগেজে রূপান্তর করার প্রকল্প চলমান রয়েছে। এক্ষেত্রে এই প্রকল্প গ্রহণ কতটুকু যৌক্তিক তার ব্যাখ্যা করতে হবে। এছাড়া প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এর মধ্যে পরামর্শকদের ভ্রমণ ব্যয় ও বিদেশে স্টাডি ট্যুর অন্যতম। প্রকল্পে পরামর্শকদের ভ্রমণ ব্যয় বাবদ প্রায় ২৯ লাখ টাকা ও কর্মকর্তাদের বিদেশে স্টাডি ট্যুর বাবদ ১০ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে, যা নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
রেল বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং টঙ্গী-জয়দেবপুরের মধ্যে চলমান ডাবল লাইন প্রকল্পটি ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ব্যবহারকে আরও কার্যকরী করার পরিপ্রেক্ষিতে ৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১৬ সালে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবের ওপর পিইসিও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পিইসি সভার সিদ্ধান্তের আলোকে ৮ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে সমীক্ষা প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। এত দিন পর এসে সমীক্ষার ছক পুনর্গঠন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
রেল বিভাগ বলছে, বিদ্যমান নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে রেলওয়ে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রবর্তন করা বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য একটি মাইলফলক হবে। এর ফলে ইলেকট্রিক ট্রেন চালু হলে ভ্রমণ সময় ও অপারেশনাল ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, বর্ণিত শহরগুলোতে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়নসহ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ইলেকট্রিক ট্রেন সর্বোচ্চ লোড ক্যাপাসিটি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এবং এর পরিবহন ব্যয়ও কম।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেন যোগাযোগ উন্নয়নে বিকল্প উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে কুমিল্লার লাকসাম পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে কর্ড লাইন। পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনে রূপান্তর করা হবে। এতে ব্যয় হবে হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। এ দুই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মাত্র আড়াই ঘণ্টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়া যাবে।
অন্যদিকে, হাইস্পিড ট্রেনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগবে এক ঘণ্টা। তবে এক্ষেত্রে রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হবে কমপক্ষে এক লাখ কোটি টাকা। এছাড়া রেলপথটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বছরে গড়ে ব্যয় হবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড ট্রেনে যাত্রীপ্রতি ভাড়া নিতে হবে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা, যা এ রুটের বিমান ভাড়ার সমান।
রেলওয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেনের যাত্রীসংখ্যা হবে দৈনিক গড়ে এক লাখ। তবে এর বড় অংশই দ্বিতীয় শ্রেণি, শোভন ও শোভন চেয়ারের যাত্রী।
রেলওয়ের প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা গেছে, বৈদ্যুতিক ইঞ্জিনের গতি সাধারণ ইঞ্জিনের চেয়ে কমপক্ষে দেড়গুণ বেশি হয়ে থাকে। ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে ব্রডগেজ ট্রেন চালানো যাবে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেনের সর্বোচ্চ গতিবেগ ৭৫ কিলোমিটার।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ছে। বর্তমানে অনেক উন্নত বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়েছে। তাই রেলে আমূল পরিবর্তন আনতে হলে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনের কোনো বিকল্প নেই।
