করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ কিংবা ‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ ফলে ৪৯ দিন বা সাত সপ্তাহ পর গতকাল সোমবার চালু হয়েছে দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ। এতে আনন্দিত সাধারণ যাত্রীরা। দূরপাল্লার বাস, ট্রেন সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে চলাচল করলেও তেমন যাত্রী ছিল না। তবে বাসে বর্ধিত ৬০ শতাংশের চেয়ে ‘অতিরিক্ত ভাড়া’ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন যাত্রীরা। ট্রেনেও যাত্রী কম থাকায় অর্ধেকের বেশি আসন ফাঁকা দেখা গেছে। তবে ‘স্বাস্থ্যবিধি’ উপেক্ষা করেই চলছে লঞ্চ। প্রতিটি লঞ্চে মোট ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী বহন করার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। যাত্রীরা বলছেন, ‘ঈদের আগেই যদি সরকার এই সেবাগুলো চালু করত, তাহলে মানুষের এত হয়রানি হতো না।
কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এসেছেন রাতুল ইসলাম। ভেঙে ভেঙে ঢাকার দিকে আসার পথে দুইবার বাস পরিবর্তন করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বাসে স্বাস্থ্যবিধি মানা হলেও বর্ধিত ৬০ শতাংশের বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।’
তবে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েত উল্ল্যাহ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনেই দূরপাল্লার বাস চলাচল করছে। তবে যাত্রীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। হঠাৎ করে ডিক্লেয়ার হওয়ায় কেউ প্রস্তুত ছিল না। তাই যাত্রীর পরিমাণ কম। পুরো স্বাভাবিক হতে আরও দু-এক দিন সময় লাগবে।’ বর্ধিত ৬০ শতাংশের বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে এই পরিবহন নেতা বলেন, ‘এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে হাইওয়ে পুলিশ।’
এদিকে ভোরের আলো ফুটতেই গতকাল রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে গেছে দূরপাল্লার বাস ও ট্রেন। অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে বাস ও ট্রেনগুলো ছেড়ে যায়। তবে যাত্রী ছিল তুলনামূলক কম। গতকাল সকালে নগরীর কমলাপুর রেলস্টেশন, সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।
‘কম’ যাত্রী নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ছুটছে ট্রেন : গতকাল ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালেই যাত্রীবাহী ট্রেন বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে গেছে। তবে সাধারণ সময়ের তুলনায় যাত্রী কিছুটা কম বলে রেল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। করোনার ঊর্ধ্বগতি রোধে গত ৫ এপ্রিল সরকার লকডাউনের বিধিনিষেধ আরোপ করলে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকার গত রবিবার দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহনে বিধিনিষেধ শিথিল করলে সোমবার থেকে ট্রেন চালানোর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রাথমিকভাবে সারা দেশে ২৮ জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন, ৯টি মেইল এক্সপ্রেস ও কমিউটার ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। এসব ট্রেনের অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখা হচ্ছে এবং সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হচ্ছে।
গতকাল কমলাপুর রেলস্টেশন পরিদর্শনে গিয়ে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, আপাতত কেবল অনলাইনে টিকিট পাওয়া যাবে। ট্রেনের আসনসংখ্যার অর্ধেক টিকিট বিক্রি হবে। টিকিট ছাড়া কেউ স্টেশনে প্রবেশ করতে পারবে না।
সব স্টেশনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কড়া নির্দেশনা রয়েছে জানিয়ে রেলপথমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে যাত্রী কম। যাত্রীর সংখ্যা বাড়লে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
সব টিকিট অনলাইনে দেওয়ায় প্রথম দিন যাত্রী কিছুটা কম বলে জানান কমলাপুরের স্টেশন ম্যানেজার মাসুদ সারোয়ার। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রেলওয়ের ৩৬২টি ট্রেনের মধ্যে স্বাভাবিক সময়ে ১০২টি আন্তঃনগর, ২৬০টি লোকাল, কমিউটার ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করে।
লঞ্চে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে প্রায় দেড় মাস পর অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার যাত্রীবাহী লঞ্চ চালু হয়েছে। গতকাল রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, লালকুঠি থেকে বাদামতলী পর্যন্ত অর্ধশতাধিক লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীর জন্য অপেক্ষায়। প্রতিটি লঞ্চে মোট ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী বহন করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ঘাটে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি লঞ্চে সংক্রমণ ঠেকাতে আমরা মাইকিং করছি। লঞ্চ কর্র্তৃপক্ষকেও অনুরোধ করেছি যাত্রী হয়ে গেলেই যাতে লঞ্চ ছেড়ে দেয়। লঞ্চে যাত্রীদের মাস্ক পরতে অনুরোধ করছি। কিন্তু অনেকে কথা শোনে না।
বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা বলেছেন, যদি কোনো লঞ্চে স্বাস্থ্যবিধি না মানা হয়, তবে ওই লঞ্চের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। প্রয়োজনে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার সচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। গতকাল ঘাট থেকে ৫৫-৬০টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। মালিক সমিতির পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত মাইকিং করা হচ্ছে। কোনো লঞ্চ কর্র্তৃপক্ষ যদি স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ঢাকা নদীবন্দরের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জয়নাল আবেদীন বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী গতকাল সকাল ৬টা থেকে ঢাকা নদীবন্দর থেকে লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে। যাত্রীরা যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক পরিধান করে নিরাপদ, অর্থাৎ তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে গন্তব্যে পৌঁছায়, সে রকম দিকনির্দেশনা দিয়েছি। পাশাপাশি আমরা নৌ-পুলিশ ও লঞ্চ মালিক কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছি। যদি কেউ স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে, সেই লঞ্চের বিরুদ্ধে আমরা মামলা করব এবং তাদের লাইসেন্স বাতিল করব।
স্বাভাবিক দৌলতদিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাট : দূরপাল্লার বাস ও লঞ্চ চলাচলে স্বাভাবিক রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাট। ফলে এখানে যানবাহন ও যাত্রীদের চাপ আগের মতো তেমন লক্ষ করা যায়নি। এ ছাড়া গতকাল ভোর থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। গোপালগঞ্জ থেকে আসা সুবর্ণ পরিবহনের যাত্রী শাওন হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত দিন পর দূরপাল্লার পরিবহনগুলো চালু করে দেওয়ার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ, সরকার এটা যদি ঈদের আগে চালু করে দিত তাহলে আরও খুশি হতাম। ঈদের আগে বাড়ি যাওয়াটা যুদ্ধ মনে হয়েছিল, যা পরিবহন চালু হওয়ায় অনেকটাই লাঘব হয়েছে।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ট্রাফিক পরিদর্শক মো. আফতাফ উদ্দীন বলেন, ভোর থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। তবে লঞ্চঘাটে যাত্রীর তেমন ভিড় দেখা যাচ্ছে না।
বিআইডব্লিউটিএ দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফিরোজ শেখ বলেন, ‘দূরপাল্লার পরিবহন আজ থেকে চলাচল শুরু করলেও পরিবহন ও অন্যান্য যানবাহনকে ফেরি পেতে সমস্যা হচ্ছে না। ঘাটে ফেরিতে ওঠার জন্য ট্রাকের কিছুটা সিরিয়াল থাকলেও তা পর্যায়ক্রমে পার করে দেওয়া হচ্ছে। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া এই দুই নৌরুটে ১৫টি ফেরি সচল আছে, যা দিয়ে যানবাহন পারাপার করছে।’
বরিশাল রুটে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক, উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি : গত রবিবার অনুমতি দেওয়ার পর গতকাল সকাল ৬টায় বরিশাল নদীবন্দর থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু করে। তবে সব লঞ্চেই স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত ছিল। গতকাল সকাল ৬টা থেকে বরিশালের অভ্যন্তরীণ নৌরুটে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়। আর সন্ধ্যায় ঢাকার উদ্দেশে বরিশাল নদীবন্দর ত্যাগ করে বিলাসবহুল পাঁচটি লঞ্চ।
জানা গেছে, গতকাল সকাল ৬টা থেকে বরিশালের অভ্যন্তরীণ সবগুলো রুটে যাত্রী পরিবহন করেছে ছোট লঞ্চ। এসব লঞ্চে যাত্রীদের মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করে মালিক-শ্রমিকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বরিশাল নদীবন্দর কর্র্তৃপক্ষ। বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা ও বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা এখন মাস্ক পরিধানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছি। নদীবন্দরে যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে উৎসাহিত করতে কাজ করছি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বরিশাল নদীবন্দর থেকে খুব সকালেই বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতের জন্য পন্টুনে ভিড় করেছেন যাত্রীরা। যাত্রীদের শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে দেখা যায়নি। যাত্রীরা পন্টুনে সামাজিক দূরত্ব এবং মাস্ক সঠিকভাবে না পরলেও লঞ্চে ওঠার সময় মাস্ক পরে উঠছেন। আবার লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার পরে মাস্ক খুলে ফেলেছেন অনেকে। একাধিক যাত্রী জানান, মাস্ক পরলে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সে জন্য লঞ্চে ওঠার সময় মাস্ক পরি। পরে খুলে রেখেছি।
বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আবদুল হাসেম মাস্টার বলেন, সকাল থেকেই বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, মেহেন্দীগঞ্জ, হিজলা, কালীগঞ্জ, লালমোহন, চরকলমি, বোরহানউদ্দিন, বাহেরচর রুটে লঞ্চ চলাচল করছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে আজ যাত্রীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি। যদি তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অনিচ্ছুক হয় তাহলে প্রশাসনের সহায়তায় আমরা তাদের স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে বাধ্য করব।
চাঁদপুরে ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে করে লঞ্চ উঠছেন যাত্রীরা : ‘লকডাউনের’ কারণে বন্ধ থাকার পর আবারও শুরু হয়েছে লঞ্চ চলাচল। গতকাল ভোর ৬টায় চাঁদপুর লঞ্চঘাট থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায় এমভি রফরফ-৭। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেছে ৫টি এবং চাঁদপুর ঘাটে এসে ভিড়েছে ২টি লঞ্চ।
এদিকে চাঁদপুর ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া মাঝ নদীতে ট্রলারে করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাত্রী তুলতে দেখা যায় কয়েকটি লঞ্চকে; বিশেষ করে বিভিন্ন চর থেকে আসা যাত্রীরা ট্রলারে গাদাগাদি করে এসে মাঝ নদীতে চলন্ত লঞ্চে উঠছে। এতে করে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক জেলা বন্দর কর্মকর্তা কায়সারুল আলম বলেন, লঞ্চে যেন ধারণক্ষমতার অর্ধেকের বেশি যাত্রী পরিবহন করতে না পারে সে ব্যাপারে নজর রাখা হচ্ছে। তা ছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে মুখে মাস্ক পরিহিত অবস্থায় যাত্রীদের লঞ্চে ভ্রমণ করার জন্য আমরা মাইকিং করছি। তারপরও কিছু যাত্রী স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করছেন। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচলের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।
মাঝ নদীতে নৌকায় করে লঞ্চে যাত্রী ওঠার বিষয়ে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এভাবে ঝুঁকি নিয়ে ওঠা কোনোভাবেই ঠিক নয়। এতে করে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে ব্যাপারে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যদের সহায়তা কামনা করছি। এই প্রতিবেদন তৈরিতে চাঁদপুর, বরিশাল, গোয়ালন্দ রাজবাড়ী প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন।
