কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর প্রস্থান

আপডেট : ২৬ মে ২০২১, ১২:০৬ এএম

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীকে এত তাড়াতাড়ি হারাতে হবে তা আমরা ভাবতে পারিনি। তবে, তিনি হয়তো আগেই জেনে গিয়েছিলেন তার জীবনবায়ুর পরিসমাপ্তির কথা। এ কথার প্রমাণ রয়েছে অমর একুশে বইমেলা ২০২১-এ প্রকাশিত তার সর্বশেষ কাব্য ‘যাত্রাপুস্তক’-এর গ্রন্থমুখ ‘সমর্পণ’-এ, তিনি লিখেছেন, ‘এখনও যে প্রস্তুত তাহা নহে। তবে সম্মুখে আর সময় দেখি না,...।’ এই বাক্য পড়ে চমকে গিয়েছিলাম, কেন তিনি এমন কথা লিখলেন? প্রশ্নটা তাকে করা হয়নি। এখন দেখছি না করা প্রশ্নের উত্তর তার তিরোধানের মাধ্যমে আমাদের সামনে উপস্থিত। কবির ‘যাত্রাপুস্তক’ যেন কবির অনন্তযাত্রার ইঙ্গিত দিয়ে গেছে, অনেক ভবিষ্যৎবাচক বক্তব্যে ঠাসা এই কাব্য। এটি পাঠ করে তাকে গত ৩০ মার্চ ২০২১ তারিখে একটি ছোট প্রতিক্রিয়া পাঠিয়েছিলাম। তা হলো: “আপনার ‘যাত্রাপুস্তক’ পাঠে অভিভূত হলাম। কী অপূর্ব কাব্যমাল্যের গ্রন্থনা! এই গ্রন্থের উচ্চারণ চিরায়ত বোধে নিত্যই নাড়া দেবে। আশ্চর্য আপনার বাণী ‘কল্যাণ যাহার মূল সেই ধরে জ্ঞানের স্বভাব’!” তিনি যথার্থভাবেই কল্যাণনিষ্ঠ জ্ঞান-স্বভাবের মানুষ ছিলেন। যার গ্রন্থনা রয়েছে তার কবিতায়। আজ তাই তার কবিতার দিকে ফিরে তাকাই। 

এক. কবির কাজ গভীর থেকে গভীরতর পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান। পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কবি সেই পথ দিয়েই প্রচলিত ঘটনা ও দৃশ্যের অন্তর্লোক ভেদ করে নতুন তথ্য ও তত্ত্ব আবিষ্কার করেন! কবির সেই গভীরতর পর্যবেক্ষণ এবং আবিষ্কারে কল্লোলিত হয়ে ওঠে দৃশ্য-অদৃশ্যের মর্মবাহী ভুবন। কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতা পাঠককে সে ধরনের অভিজ্ঞতায় জারিত ও রসবোধে উত্তীর্ণ করে। এখানে একটি কবিতার দৃষ্টান্ত দিয়ে তার কবিতার অন্তর্গত পর্যবেক্ষণ ও মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনার প্রমাণ উপস্থাপন করা হচ্ছে। কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কতো কাছে জলছত্র, কতো দূর চেরাপুঞ্জি (হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কতো কাছে জলছত্র, কতো দূর চেরাপুঞ্জি, বিশাকা প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৬) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘উন্মোচন’ শীর্ষক কবিতায় অসাধারণ পর্যবেক্ষণে প্রজ্ঞাবান কবির ঋদ্ধমনের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই কবিতার শুরুতেই কবি বৈজ্ঞানিকের সূত্রের মতো বলেছেন: “মেঘের গল্প প্রথমতঃ সমুদ্রের তলদেশ থেকে আসে”। (হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কবিতাসমগ্র, ১ম খন্ড ২০১৯ : ৫৫১)

সূত্র যাই হোক, কবির এই কাব্যিক চয়নে উল্লিখিত মেঘ এবং সমুদ্রের তলদেশকে মিলিয়ে দেখানোর প্রক্রিয়া পাঠককে শুরুতেই বিস্ময়ে ফেলে দেয়। কেননা মেঘ থাকে অনন্ত আকাশে বিস্তারিত, আর সমুদ্রের তলদেশ সে তো মানুষের পদতলের ভূমিতে গ্রথিত! কিন্তু সমুদ্র তলদেশও অনন্ত রহস্যে ঠাসা, শুধু তাই নয় সেখানে রয়েছে জীব-বৈচিত্র্যের সমাহার, রয়েছে ‘বালি ও লবণ’, ‘পাথর ও বরফের দাপট’, কবির ভাষ্যে পাই ‘পাথর ও বরফের দাপট শেষ হ’লে/জল এসে মেশে হাওয়ার সঙ্গে’ এবং ‘দু’বাহু বাড়িয়ে ডাকে:/ও সলোমন, তুই কোথায়’? (প্রাগুক্ত)

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী এইখানে এসে যখনই হাওয়ায় মেশা জলের কণ্ঠস্বর নিয়ে বললেন ‘ও সলোমন, তুই কোথায়?’ তখন অনেকগুলো ভাব-ব্যঞ্জনা পাঠকের চেতনায় নাড়া দিয়ে যায়। কেননা, সলোমন নামটি এমনই ব্যঞ্জনাময় যে তার সঙ্গে মহাকাব্যিক ইতিহাস বা অতিলৌকিক মিথের চরিত্রের সম্পর্ক রয়েছে। আসলে, ইতিহাস ও মিথের মিশ্রণে জারিত ঋদ্ধপাঠকের পরিচিত সলোমন চরিত্রটি জীব-জগতের সবার ভাষা হৃদয়ঙ্গম করতে পারতেন। কবিও জানতেন জল হয়ে হাওয়ার সঙ্গে মিশে গেলে তার কণ্ঠস্বর সেই সলোমন ছাড়া আর কে বুঝতে পারবে? তাই তিনি হৃদয়ের আবেগ দিয়ে সলোমনকে ডেকেছেন।

কবি যত স্বাভাবিকভাবেই সলোমনকে ডাকুন না কেন সচেতন পাঠকের মনে-চেতনায় কবির সলোমন সম্বোধনে সহসা ঢেউ খেলে যায় প্রাচীন ইতিহাসের আলো। সলোমন ছিলেন দারুণ নবি ও বাথসেবার সন্তান। হিব্রু বাইবেল অনুসারে তিনি ইসরায়েলের প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ একজন রাজা ছিলেন। তার জন্ম হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০১১ অব্দে এবং মৃত্যু আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৯৩১ অব্দে। কথিত আছে যে, সলোমনই জেরুজালেম নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। ধর্মীয় বিশ্বাসমতে সলোমন ছিলেন পুরো বিশ্বের সম্রাট। খ্রিস্টপূর্ব ৯৭০-৯৩১ অব্দ পর্যন্ত টানা ৪০ বছর সলোমন পুরো পৃথিবী শাসন করেন। শুধু মানুষেরই নয় তিনি উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলেরও সম্রাট ছিলেন, বুঝতেন মানুষ ছাড়াও পশু-পাখি ও জীবজগতের সবার ভাষা। ইতিহাসের সেই মহানায়ক সলোমনের নাম লোকায়তভঙ্গিতে কবিতায় গ্রন্থনের মাধ্যমে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী অসাধারণ দক্ষতায় উন্মোচন করেছেন এ জগতের ‘সৃষ্টি-রূপ’ ও তার অন্তর্গত অন্ত্যমিল! কিন্তু কীভাবে?

এই প্রশ্ন থেকে ‘উন্মোচন’ কবিতার পরবর্তী স্তরগুলো পাঠ করা যেতে পারে। কবির একান্ত অভীপ্সা প্রকৃতির বায়ুস্তরের মতো তিনি তার ভাই সলোমনের সঙ্গে যাবেন ‘পুব থেকে পশ্চিমে’, এমনকি ‘উত্তর-দক্ষিণে’। এই অভিযাত্রার ভেতর তিনি নিশ্চিতভাবেই জানেন ‘স্তরে স্তরে’ ফুটে উঠবে ‘কুসুমের কলি’, আর সেই সুযোগে তিনি ও তার ভাই সলোমন ‘মসলা-মেঠাই মেখে’ ‘ঝাঁপ’ দেবেন ‘তরুণীর গালে’। এই তরুণী আর কেউ নয়, পৃথিবীর উর্বরাশক্তির প্রতীক, প্রেমের প্রতীক, মায়া ও মমতার প্রতীক, এমনকি সন্তানবৎসল মাতৃত্বের প্রতীক। লক্ষণীয় বিষয়, প্রশ্ন থাকলেও কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ভূগোলে সমুদ্র, নদী, হ্রদ, জঙ্গল, ফসলের মাঠ, মেঘ ও মেয়েরা একসূত্রে গাঁথা।

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী ‘উন্মোচন’ কবিতায় মেঘ-বৃষ্টি ও প্রকৃতির ভৌগোলিক জ্ঞানকে গ্রন্থন করতে গিয়ে যথাক্রমে তিনটি প্রশ্ন উপস্থাপন করেছেন: ১. ‘ওরে মেঘ, তোর বুকে কে খলবল করে?’ ২. ‘রবীন্দ্রনাথ কি সবকিছু জানতেন?’ এবং ৩. ‘তাদের কি ভ্রমণের কোনো দিক-নিশানা থাকে?’ উপর্যুক্ত প্রশ্নটির উত্তর অন্বেষণ করতে গিয়ে তিনি কবিতাটির শেষ স্তবক রচনা করেছেন। এক্ষেত্রে শেষ স্তবকের ৫টি চরণে অপূর্ব এক শৈল্পিক দক্ষতায় কবি তার তিনটি প্রশ্নের সমাধান উপস্থাপন করে লিখেছেন: মেঘের গল্প, হাওয়ার গল্প, ভূমি ও পাথরের গল্প/আগুন ও প্রাণের গল্পের সঙ্গে মিশে/প্রকৃতি অভিন্ন গল্প তৈরি করে/আর প্রকৃতি-ই স্তরে-স্তরে উন্মোচন করে সৃষ্টি-রূপ/অনন্ত-অসীম, স্থিতি ও গতি, আস্থা ও শূন্যতা! (প্রাগুক্ত)

পুরো কবিতাটিতে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী অপূর্ব পর্যবেক্ষণে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে, প্রজ্ঞাবান ঋষির মতো প্রকৃতির সব উপাদানকে অবিভাজ্য একটি সমীকরণে লিপিবদ্ধ করেছেন। এই আবিষ্কার অভিনব ও অনন্য। কেননা, শুরুতে তিনি মেঘের গল্প গ্রন্থন করেছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে মেঘের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে তিনি সমুদ্রের গভীরে অবগাহন করেছিলেন। আর সেই অবগাহনের ভেতর তিনি সৃষ্টির বিচিত্রলীলা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। সেখান থেকে হাওয়ার আবেগ নিয়ে, বৃষ্টি ও মেঘের যুগলবন্দিকে নানা ধরনের ভৌগোলিক অভিযাত্রায় প্রত্যক্ষ করেন। একসঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন নেপালের হিমালয়, ভারতের দার্জিলিং ও গ্যাংটক, বাংলাদেশের তেঁতুলিয়াকে। বৃষ্টি ও মেঘের সূত্রে ভূগোলের বিচিত্রতাকে ছুঁয়ে যায় যে আবহাওয়া সেখানে ভারতে পুরি ও বাংলাদেশের কক্সবাজার সমুদ্রের বাঁক ছুঁয়ে থাকা নদী ও হ্রদের পাশাপাশি জঙ্গল, ফসলের মাঠ, মানুষের আবেগ ও ভ্রমণের গতি সব যেন একাকার হয়ে যায়। আর এই সূত্রে কবি মেলাতে সক্ষম হন ‘মেঘের গল্প, হাওয়ার গল্প, ভূমি ও পাথরের গল্প’, শুধু তা-ই নয়, তার সঙ্গে কবি গভীর পর্যবেক্ষণশক্তিতে প্রত্যক্ষ করেন ‘আগুন ও প্রাণের গল্পের সঙ্গে মিশে’ কীভাবে ‘প্রকৃতি অভিন্ন গল্প তৈরি করে’।

কবির এই পর্যবেক্ষণ যতই সৃষ্টি আবেগের গ্রন্থনায় ঘটুক, তার সঙ্গে বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিভঙ্গি তীব্রভাবেই প্রত্যক্ষ করা যায়। কবি ‘অনন্ত-অসীম’-এর সৃষ্টি-রূপের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করে সহসা বলে ওঠেন ‘প্রকৃতি-ই স্তরে-স্তরে উন্মোচন করে সৃষ্টি-রূপ’ আর প্রকৃতির গভীরে মূর্তমান রয়েছে সৃষ্টির ‘অনন্ত-অসীম, স্থিতি ও গতি, আস্থা ও শূন্যতা!’ কবির এই ভাষ্য অনেকটা বৈজ্ঞানিকসূত্রের মতো হলেও তা পবিত্র ধর্মগ্রন্থের ভাষার মতো রহস্যে পরিপূর্ণ তথা প্রোফেটিক। কবির কাজ যেমন দৃশ্যগত প্রকৃতির অন্তর্গত সত্যকে নতুন ব্যাখ্যায় অভিষিক্ত করা এবং পাঠকের চেতনায় চেনা দৃশ্যকে নতুনভাবে ব্যঞ্জনাময় করে তোলা। কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর এই কবিতাটি সেই বৈশিষ্ট্যে নিশ্চিতভাবেই অনন্য। পরিশেষে ‘উন্মোচন’ কবিতার সূত্র ধরে বিশ্লেষকের বিবেচনায় স্পষ্ট করে বলা যায় যে, সৃষ্টি-রূপকে নতুনভাবে গ্রন্থন ও ব্যাখ্যার জন্য কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী অভিনন্দিত হবেন বারবার।

দুই. বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী জন্মেছিলেন ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা থানার রসুলপুর গ্রামের মাতুলালয়ে। তার পৈতৃক বাড়ি ছিল রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার কাচারিপাড়া গ্রামে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় ফরিদপুরের অতিবাহিত করে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে সমাপ্ত করেন। তবে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পরিচয়ের বাইরে নিজের সৃষ্টিশীল জীবনের পরিচয়কেই প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে ‘কৃষ্ণপক্ষে অগ্নিকা-’ উপন্যাস প্রকাশের মাধ্যমে তিনি সাহিত্যিক অভিযাত্রা শুরু করেন। পরে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ‘দাও বৃক্ষ দাও দিন’ কাব্য প্রকাশের পর থেকে তিনি ৩৫টির অধিক কাব্য এবং ১০টি শিশুকিশোর উপযোগী ছড়াগ্রন্থ ও অনুবাদ, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ সংকলন প্রভৃতি প্রকাশ করেন। সাহিত্যসৃষ্টির স্বীকৃতিতে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১) ও একুশে পদক (২০১৬) অর্জন করেন। ইতিমধ্যে দুইখ-ে তার ‘কবিতাসমগ্র’ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি তার বিপুল সৃষ্টিকর্মের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে অমøান থাকবেন বলে আশা করা যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত