চার মাসে চারবার বাড়ছে ভোজ্য তেলের দাম

আপডেট : ২৬ মে ২০২১, ০১:৫৬ এএম

চলতি বছরের চার মাসে তিন দফায় লিটারপ্রতি সয়াবিন তেলের দাম ২১ টাকা বেড়েছে। নতুন করে লিটারে আরও ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।

রাজস্ব আহরণ বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তার ভ্যাটনীতিতে অটল রয়েছে। করচাপের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় অস্থির দেশীয় ভোজ্য তেলের বাজার। এরই ধারাবাহিকতায় আমদানিকারকরা পণ্যটির দাম বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ফের এ প্রস্তাব দিয়েছেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠকে বসবেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠক থেকে আরেক দফা পণ্যটির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসবে। ভোজ্য তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে এনবিআরকে ভ্যাট হ্রাসের জন্য চিঠি দিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কয়েকবার আলোচনাও হয়। তবে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাটনীতিতে পরিবর্তন আসছে না। এটি হলে ভোজ্য তেলের বাজার লাগামহীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর বাড়তি দাম বহনে করোনা মহামারীর মধ্যে আরও পিষ্ট হবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।

গতকাল মঙ্গলবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভোজ্য তেলের দাম অনেক বাড়তি। আমরা হিসাব করি, বন্দরে কত দামে পণ্যটি পৌঁছাল। আমদানিকারকরা একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন দিয়ে পর্যালোচনা করে দেখব, এখন পণ্যটির দাম কত হওয়া উচিত। যদি দেখি, দাম বাড়ানো দরকার, তাহলে বাড়াব। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তি থাকল, কিন্তু আমরা বাড়ালাম না। তাহলে ওরা তো আর লোকসান দিয়ে আমদানি করবেন না।’

ট্যারিফ কমিশনের আগের প্রস্তাবনায় ভ্যাট কমানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। এটি বাস্তবায়ন কতদূর জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা এনবিআরকে চিঠি দিলাম, কথাও বললাম। কিন্তু কাজের কাজ তো কিছুই হলো না। যদিও ওরা অ্যাডভান্স ট্যাক্স (আগাম কর) প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু এটা তো বছর শেষে দিতেই হবে। বাজেটে ওরা কী করছে, আমি এখনো জানি না। তবে বাজেট বক্তব্যে আমরা বিষয়টি সংসদে তুলে ধরব। ভোজ্য তেলের ভ্যাট-ট্যাক্স নিয়ে বক্তব্য রাখব।’

এনবিআর সদস্য (ভ্যাট নীতি) মাসুদ সাদিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজেটে ভোজ্য তেলের ভ্যাটের ওপর কী নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, সেটি ৩ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদকে জানাবেন। আপাতত সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

অবশ্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবারের বাজেটে ভ্যাটনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসছে না। ভোজ্য তেলের ভ্যাটেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।’ ভোজ্য তেলের ভ্যাট প্রত্যাহার না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় বাজারেও দাম বেড়েছে। সেখানে কমলে এমনিতেই এখানেও কমে যাবে। ফলে ভ্যাট হ্রাস করে দাম কমানোর প্রয়োজন হয়তো পড়বে না। তারপরও পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে এনবিআর চেয়ারম্যান ও অর্থমন্ত্রীর ওপর। ওনারা চাইলে কমাতেও পারেন।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মে মালিকপক্ষ ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে প্রস্তাবনা দেয়। সেখানে লিটারপ্রতি বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম দেওয়া হয়েছে ১৫৬ টাকা, যা বর্তমানে ১৪১ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে লিটারপ্রতি ১৩০ টাকা, যা বর্তমানে ১১৯ টাকা এবং লিটারপ্রতি পাম অয়েলের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ১২০ টাকা, যা বর্তমানে ১০৬ টাকা।

এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে। এর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে গত ১৫ মার্চ লিটারপ্রতি আরও ৫ টাকা বাড়িয়ে ১৩৯ টাকা নির্ধারণ করে। তখন খোলা সয়াবিন তেলের খুচরামূল্য ১১৭ এবং ৫ লিটার বোতলের সয়াবিন তেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬৬০ টাকা।

গত ১৯ এপ্রিল লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় সমিতি। আর ২৫ এপ্রিল থেকে নতুন দামে পণ্যটি বিক্রি শুরু করে। গত ৩ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় লিটারপ্রতি সয়াবিন তেলের দাম ২ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তখন থেকে লিটারপ্রতি বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৪১, খোলা সয়াবিন তেল ১১৯, এক লিটারের বোতল ১৪১ এবং পাঁচ লিটারের বোতল ৬৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়ে আসছিল।

আমদানিকারক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এ মুহূর্তে ভোজ্য তেলের দাম সহনীয় রাখতে হলে অবশ্যই ভ্যাট কমাতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে যে পূর্বাভাস, তাতে আপাতত দাম কমার সম্ভাবনা নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কয়েকবার এনবিআরের কাছে ভ্যাট পুনর্নির্ধারণে চিঠি দিলেও আমলে নেওয়া হয়নি। তবে গত ১০ এপ্রিল রমজানের কথা বিবেচনা করে সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে ৪ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার করে এনবিআর।

ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আসন্ন বাজেটে ভোজ্য তেল আমদানিতে ভ্যাট কমানো না হলে পণ্যটির দাম দেড়শ’ টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য) এ.এইচ.এম. সফিকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় ওরা (আমদানিকারক) রমজানেই লিটারপ্রতি ৫ টাকা দাম বাড়াতে চেয়েছিল। আমরা ঈদ ও করোনার কথা বিবেচনা করে ২ টাকা বাড়িয়েছিলাম। নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে বৃহস্পতিবার মন্ত্রী (বাণিজ্যমন্ত্রী) ব্যবসায়ীদের ডেকেছেন। সেখানে একটি সিদ্ধান্ত হবে।’

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এখানে দাম অনেক কম। মন্ত্রণালয় দাম না বাড়ানোয় এলসি (আমদানি ঋণপত্র) খুলছেন না আমদানিকারকরা। তাই আমাদের দ্রুত একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে। সময় মতো এলসি না খুললে আসছে কোরবানির ঈদে বাজারে ভোজ্য তেলের সংকট সৃষ্টি হতে পারে। তখন অবস্থা আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।’

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর জন্য সবাই ব্যবসায়ীদের দুষছেন। দাম তো আমরা বাড়াই না। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন দাম দ্বিগুণের বেশি। আজ (গতকাল) আন্তর্জাতিক বাজারে টনপ্রতি সয়াবিন তেল ১ হাজার ৪৮০ ডলারে বিক্রি হয়েছে। এর সঙ্গে ১৯ টাকা আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট, সাড়ে ৭ টাকা ট্রেড ভ্যাট ও প্রায় ৪ টাকা উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট যুক্ত করতে হয়। এবার আপনিই বলুন, আমরা কী করতে পারি? তবু তো জনস্বার্থে সরকারের কথা অনুযায়ী এখন আমরা ১৪১ টাকা দরে পণ্যটি বিক্রি করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত