দক্ষিণখানে মসজিদের সেপটিক ট্যাংকে লাশ

প্রেমিকার স্বামীকে ছয় টুকরো করে ইমাম

আপডেট : ২৬ মে ২০২১, ০২:০০ এএম

রাজধানীর দক্ষিণখান ‘সরদারবাড়ি জামে মসজিদ’-এর সেপটিক ট্যাংক থেকে আজহার (৩০) নামে এক যুবকের ছয় টুকরো লাশ উদ্ধার করেছেন র‌্যাব সদস্যরা। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এগুলো উদ্ধার করা হয়। আজহার হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে প্রথমে ওই মসজিদের ইমাম মো. আব্দুর রহমানকে (৫৪) গ্রেপ্তার এবং তিনটি চাকু উদ্ধার করা হয়। পরে আজহারের দেওয়া স্বীকারোক্তিতে তার স্ত্রী আসমা আক্তারকে (২২)  রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। নিহত আজহারের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে। তিনি নিপা গার্মেন্টস নামে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন।

র‌্যাব বলছে, আজহারের চার বছর বয়সের ছেলেকে আরবি পড়াতেন আব্দুর রহমান। এ সুবাদে আজহারের বাড়িতে আসা-যাওয়া ছিল তার। এক পর্যায়ে আজহারের স্ত্রীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি টের পেয়ে আজহার স্ত্রীকে গ্রামের বাড়ি রেখে আসেন। পরে আসমার পরিকল্পনায় আজহারকে গত ১৯ মে রাতে আব্দুর রহমান মসজিদের উপর তলায় থাকার ঘরে ডেকে নেন। সেখানে তিনি আজহারকে ধারালো চাকু দিয়ে খুন করে লাশ গুম করার জন্য সেপটিক ট্যাংকে ফেলেন।

গতকাল রাতে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (এএসপি) ইমরান খান দেশ রূপান্তরকে জানান, আজহারের স্ত্রী আসমার এর আগেও দুবার বিয়ে হয়। সম্প্রতি তিনি মসজিদের ইমাম আব্দুর রহমানের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এই সম্পর্ক বুঝতে পেরে আজহার স্ত্রীকে গ্রামের বাড়ি রেখে আসেন। তখন আজহারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন আব্দুর রহমান ও আসমা। আজহার ঈদের পর ঢাকায় আসতে না চাইলেও স্ত্রী তাকে জোর করে পাঠান। আজহারকে খুন করতে আব্দুর রহমানকে লোক ভাড়া করতে বলেন আসমা। কিন্তু আব্দুর রহমান বলেন কোনো সাক্ষী রাখা যাবে না। এজন্য আব্দুর রহমান নিজেই হত্যার পরিকল্পনা করেন। ঘটনার রাতে এশার নামাজের পর আজহারকে ডেকে আনেন আব্দুর রহমান। নিজের রুমেই আজহারকে হত্যা করেন তিনি।  

সেপটিক ট্যাংক থেকে লাশ উদ্ধারকারী স্যানিটারি মিস্ত্রি আব্দুল আজিজ জানান, সেপটিক ট্যাংকটির ঢাকনা সিমেন্ট দিয়ে স্থায়ীভাবে আটকানো ছিল। গতকাল সকাল থেকে তিনজন মিলে এটি খোলার পর ঢাকনা তুলতেই প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। পরে সেপটিক ট্যাংকের পানি নিষ্কাশন করতেই লাশের খণ্ডিত অংশ ভাসতে দেখা যায়। একে একে লাশের ৬টি টুকরা পানি থেকে তোলা হয়। দুই হাত, দুই পা, মাথা ও শরীর বিচ্ছিন্ন ছিল। লাশের টুকরাগুলো ফুলে সাদা হয়ে গিয়েছিল।

স্থানীয়রা জানান, ইমাম আব্দুর রহমান ৩৩ বছর ধরে ওই মসজিদে ইমামতি করছেন। মসজিদের দ্বিতীয় তলায় তার থাকার কক্ষে ঝাড়ফুঁক ও তেল পড়া দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন বয়সের নারীদের নিয়ে যেতেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ থাকলেও প্রভাবশালী মসজিদ কমিটির ভয়ে কেউ মুখ খুলত না।

এর আগে গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. আব্দুল মোত্তাকিম বলেন, গত সোমবার রাত ৯টার দিকে র‌্যাব-১ এর গোয়েন্দা দল গোপন সূত্রে জানতে পারে যে, সরদার বাড়ি জামে মসজিদের সিঁড়িতে রক্তের দাগ এবং সেপটিক ট্যাংক থেকে তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা দল ছায়া তদন্ত শুরু করলে এলাকাবাসীর কাছে জানতে পারে যে, নিহত আজহার গত ১৯ মে থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তাকে খুঁজে বের করতে দ্রুততার সঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়। গোয়েন্দা তৎপরতায় এবং গোপন সূত্রের ভিত্তিতে আজহারকে হত্যাকারী মাওলানা মো. আব্দুর রহমানকে রাজধানীর দক্ষিণখান থানা এলাকার মাদ্রাসাতুর রহমান আল আরাবিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ৩টি চাকু উদ্ধার করা হয়। পরে আব্দুর রহমানের দেওয়া তথ্যমতে গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সরদার বাড়ি জামে মসজিদের সেপটিক ট্যাংক থেকে আজহারের খন্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়।

তিনি আরও বলেন, আব্দুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি সরদারবাড়ি জামে মসজিদে ৩৩ বছর ইমামতি করে আসছেন। আজহারের ছেলে মো. আরিয়ান (৪) ওই মসজিদের মক্তবে পড়াশোনা করত। আজহার নিজেও আব্দুর রহমানের কাছে কোরআন শিক্ষাগ্রহণ করতেন। এই সুবাদে আব্দুর রহমান আজহারের বাসায় প্রায়ই যাওয়া আসা করতেন। যাতায়াতের কারণে আব্দুর রহমানের সঙ্গে ভিকটিমের পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গত ১৯ মে আব্দুর রহমানের সঙ্গে নিহত আজহারের কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে আব্দুর রহমান ক্ষিপ্ত হয়ে আজহারের গলার ডানপাশে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলে আজহার ঘটনাস্থলে মারা যান। পরে এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য হত্যাকারী আজহারের লাশ টুকরো টুকরো করে সরদার বাড়ি জামে মসজিদের সেপটিক ট্যাংকে লুকিয়ে রাখেন। গ্রেপ্তার আব্দুর রহমান হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। মসজিদে ছুরি কোথা থেকে এলো জানতে চাইলে র‌্যাব কর্মকর্তা মোত্তাকিম বলেন, আব্দুর রহমান দাবি করেছেন যে, তিনি কোরবানির পশু জবাইয়ের জন্য ছুরি কক্ষে রাখতেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত