রাজধানীর গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট আর পুরানা পল্টনের মাঝামাঝি মুক্তাঙ্গন পার্কটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে টিকে ছিল। গত এক দশক ধরে এ পার্কটি সভা-সমাবেশের পরিবর্তে প্রভাবশালী মহলের কার পার্কিং হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সিটি করপোরেশন ১০ থেকে ১২ বার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবশেষে তা দখলমুক্ত করেছে। তবে এবার সেখানে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নির্মাণ করা হচ্ছে একটি বিশাল আকারের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) বা ময়লা আবর্জনা রাখার ডিপো। আর এসটিএস নির্মাণের পর যে জায়গাটুকু অবশিষ্ট থাকবে সেখানে শিশুপার্কের আদলে কিছু খেলার সরঞ্জাম বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সবমিলিয়ে আশির দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী ‘মুক্তাঙ্গন’ তার আগের পরিচয় হারিয়ে নতুন রূপ নিয়ে ফিরবে। তবে নাগরিকদের কথা বলার জন্য এমন একটি উন্মুক্ত স্থান থাকা খুব জরুরি বলে মনে করছেন নগরবাসীর অনেকেই।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অনেক চেষ্টার পরে তারা মুক্তাঙ্গন পার্কটি দখলমুক্ত করেছেন। বর্তমানে সেখানে একটি এসটিএস নির্মাণের কাজ চলমান আছে। এসটিএসটি ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬০ ফুট প্রস্থের হচ্ছে। উচ্চতা হবে প্রায় ২২ ফুট। আসছে জুলাই মাসে নির্মাণকাজ শেষ হলে এসটিএসটি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের বর্জ্য স্টেশন হিসেবে ব্যবহার হবে। এছাড়া সেখানে শিশুপার্কের আদলে বাচ্চাদের খেলার কিছু সরঞ্জামও রাখা হবে। বাস্কেটবলসহ শিশুদের কিছু রাইডস বসানোর জন্য তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকার একটি কর্মপরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ডিএসসিসির নিজস্ব অর্থায়নে এসব কাজ এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।
তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুর সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত মুক্তাঙ্গন পার্ক নিয়ে অনেকেরই রয়েছে ভিন্নমত। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক টিটু দত্ত গুপ্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষের কথা বলার জন্য একটা জায়গা থাকা দরকার। অনেক দেশে মানুষ একা একাও নিজের বক্তব্য জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান পাচ্ছে। আমাদের মুক্তাঙ্গন তো এমন একটি স্থান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এখানে সভা-সমাবেশও হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ জায়গা না পেয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তায় নানা কর্মসূচি পালন করে। সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। এছাড়া এ জায়গায় দাঁড়াতে হলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হয়। যদি একটি নির্দিষ্ট জায়গা থাকে তাহলে নাগরিক তার মনের কথা বলতে পারবে।’
প্রায় একই ধরনের মত প্রকাশ করে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণ নাগরিক যেন আইন মেনে প্রতিবাদ করতে পারে এমন একটি জায়গা থাকা খুব প্রয়োজন। মুক্তাঙ্গনটি এমন একটি স্থান। এখানে অনেক গাছপালাও ছিল। আমরা সভা-সমাবেশ করতে পারতাম। আমরা নিয়মন্ত্রাতিকভাবে এ জায়গায় নিজেদের সভা-সমাবেশ করতে চাই। সরকার যদি এখানে অন্য কিছু না করে তা সিভিল সোসাইটির জন্য রেখে দেয় তা হবে সবচেয়ে ভালো কাজ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যেসব শিশুপার্ক আছে তা ভালো করে রক্ষণাবেক্ষণ করলেই চলে। নতুন করে এমন একটি স্থানে শিশুপার্ক করার খুব একটা প্রয়োজনীয়তা নেই।’
তবে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদেরও রয়েছে ভিন্নমত। তারা বলছেন, মুক্তাঙ্গনকে দখল করে একটি প্রভাবশালী মহল কারবার চালাচ্ছে। সেখানে ভাড়ায়চালিত মাইক্রোবাস মালিকদের অফিস ছিল। ঢাকা মাইক্রোবাস ও কার মালিক সমিতি নামের একটি সংগঠন তারা গড়ে তুলেছে। ডিএসসিসির বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব নেওয়ার পর একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করার পরও তা ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। ফলে এখানে করপোরেশনের একটি আধুনিক পার্ক হলে একদিকে যেমন নাগরিকরা সুবিধা পাবেন, অন্যদিকে দলখলদারদের কবল থেকেও পার্কটি রক্ষা পাবে। এছাড়া ডিএসসিসির প্রতিটি ওয়ার্ডে এসটিএস নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু স্থানীয় ওয়ার্ডের বর্জ্য রাখার জন্য কোনো স্থান পাওয়া যাচ্ছে না। এ ওয়ার্ডে সরকারি বেশ কিছু অফিস-আদালতও রয়েছে। ফলে এখানে একটি এসটিএস নির্মাণ করা খুব প্রয়োজন। সবকিছু বিবোচনা করে কর্র্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে পার্কের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিএসসিসি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এছাড়া এসটিএস নির্মাণের বিষয়ে জানতে সংস্থাটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনো কথা বলেননি।
তবে ডিএসসিসির ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এনামুল হক আবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মুক্তাঙ্গনে ময়লা রাখার জন্য এসটিএসের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এখানে একটি খেলার মাঠ ও আধুনিক পার্ক হবে।’
