দক্ষিণখানে ৬ টুকরো লাশ

আজহারের আর্থিক অনটনের সুযোগ নেন ইমাম রহমান

আপডেট : ২৯ মে ২০২১, ০৩:১১ এএম

রাজধানীর দক্ষিণখানে হত্যার শিকার পোশাককর্মী আজহারের আর্থিক সংকটের সুযোগ নিয়েছিলেন ইমাম মো. আবদুর রহমান। আজহার ও তার চার বছরের ছেলেকে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার অজুহাতে আজহারের বাড়িতে অবাধ যাতায়াত ছিল আবদুর রহমানের। আর্থিক অনটনের জন্য আজহার তার স্ত্রী আসমা আক্তারকে দামি পোশাক কিনে দিতে পারতেন না, বাসায় ভালো বাজারও করতে পারতেন না। আসমা-আজহার দম্পতির সংসারের এই অভাব-অনটনকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে আজহারের অনুপস্থিতিতে তার বাসায় মাছ, মাংস ও কাঁচাবাজার নিয়ে যেতেন ইমাম আবদুর রহমান। এছাড়া আজহারের স্ত্রী আসমাকে মাঝেমধ্যেই কিনে দিতেন দামি পোশাক। এভাবেই চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আসমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠে আবদুর রহমানের। এরই ধারাবাহিকতায় আরবি পড়ানোর নাম করে আজহারের অনুপস্থিতিতে তার বাসায় গিয়ে আসমার সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হন আবদুর রহমান। আজহার হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দক্ষিণখান সরদারবাড়ি জামে মসজিদের ইমাম আবদুর রহমান ও আজহারের স্ত্রী আসমা আক্তারকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এমনসব তথ্য পেয়েছে দক্ষিণখান থানা পুলিশ। পাঁচ দিনের রিমান্ডের দুদিন পার হয়েছে।

মামলাটির তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরো ঘটনাটি খুবই লোমহর্ষক। আসমা ও আবদুর রহমান একাধিকবার চেষ্টার পর আজহারকে হত্যায় সফল হন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন। আসমা এর আগে হত্যার উদ্দেশ্যে আবদুর রহমানের দেওয়া বিষাক্ত দ্রব্য (জামালগোটা ও টিকটিকি বাটা) কৌশলে ডালের সঙ্গে খাওয়ালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন আজহার। তাকে সে সময় চিকিৎসকের কাছেও প্রথমে নেননি স্ত্রী আসমা। পরে প্রতিবেশীদের চাপের মুখে হাসপাতালে নিলে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) বেশ কিছুদিন চিকিৎসাধীন থাকেন আজহার। সুস্থ হয়ে চলে যান গ্রামের বাড়িতে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে আজহার হত্যার জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন আসমা। আর ইমাম আবদুর রহমান সব দায় চাপাতে চাচ্ছেন আসমার ওপর।

গত ২৫ মে সকালে সরদারবাড়ি জামে মসজিদের সেপটিক ট্যাংক থেকে আজহারের (৩০) ছয় টুকরো লাশ উদ্ধার করেন র‌্যাব সদস্যরা। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে র‌্যাব প্রথমে মসজিদটির ইমাম আবদুর রহমানকে (৫৪) আটক করে। পরে তার দেওয়া তথ্যে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে নিহত আজহারের স্ত্রী আসমা আক্তারকে (২২) টঙ্গীর আবদুল্লাহপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আসমা ও আবদুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, গত ১৯ মে রাতে আজহারকে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় নিজের থাকার কক্ষে ডেকে নেন ইমাম আবদুর রহমান। পরে সেখানে ধারালো চাকু দিয়ে আজহারকে হত্যার পর লাশ ছয় টুকরো করে সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেন। আজহারের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে। তিনি নিপা গার্মেন্টস নামে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন।

আজহার হত্যার ঘটনায় হওয়া মামলায় আসমা ও আবদুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গত বুধবার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। রিমান্ডের প্রথম দুদিনেই তাদের কাছ থেকে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণখান থানার এসআই অনুজ কুমার সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজহারের আর্থিক সংকটের সুযোগ নেন ইমাম আবদুর রহমান। তাদের মধ্যে (আসমা ও আবদুর রহমান) অনৈতিক সম্পর্ক সৃষ্টি হলে একে অপরকে বিয়ে করতে চান। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ান আজহার। এজন্য তারা একাধিকবার চেষ্টা করে আজহারকে কৌশলে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে। ইমাম অনেক কুফরিও করেন। পরে তিনি নিজেই আজহারকে হত্যা করতে সক্ষম হন।’ এসআই অনুজ আরও বলেন, ‘হত্যার পর আজহারের কাছে থাকা মোবাইল ফোন পুড়িয়ে ফেলেন আবদুর রহমান। আজ (গতকাল শুক্রবার) সেই পোড়া মোবাইলের অবশিষ্ট অংশ ও সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।’

আসমা ও আবদুর রহমানকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, আজহার এক দিন ভুলে মোবাইল ফোন বাসায় রেখে গার্মেন্টসে চলে যান। পরে বাসায় এসে দেখেন যে তার ফোন থেকে ইমাম আবদুর রহমানের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছে। এতে সন্দেহ হয় তার। পরে গত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি আজহার গার্মেন্টস ছুটির আগেই বাসায় চলে আসেন। ঘরে ঢুকেই তিনি তার স্ত্রী আসমাকে আবদুর রহমানের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে দেখতে পান। তখন আজহার দুজনকেই সতর্ক করেন। আর ইমামকে বাসায় আসতে নিষেধ করেন। এরপর থেকে আসমা ও আজহারের মধ্যে মাঝেমধ্যেই ঝগড়া লাগত। আজহার হত্যার মূল পরিকল্পনায় ছিলেন আসমা। প্রথমে লোক ভাড়া করে হত্যা করতে চান। কিন্তু তাতে সফল না হওয়ায় গত রমজান মাসে তাকে একবার হত্যার চেষ্টা করেন আসমা ও আবদুর রহমান। সেবার ইমাম তার ছাত্র মেহেদীকে দিয়ে টঙ্গী থেকে জামালগোটা আনান। পরে মসজিদ থেকে চারটি টিকটিকি ধরে বেটে জামালগোটার সঙ্গে মিশিয়ে আসমাকে দেন। আসমা ১৩ রমজান রাতে ডালের সঙ্গে মিশিয়ে তা আজহারকে খাওয়ান। সেদিন রাত ১২টা থেকে আজহারের বমি ও পাতলা পায়খানা শুরু হয়। তখন আসমা হাসপাতালেও নেননি আজহারকে। এভাবেই মুমূর্ষু অবস্থায় দুদিন বাসায় অতিবাহিত হওয়ার পর প্রতিবেশীদের চাপের মুখে রাজধানীর মহাখালীর কলেরা হাসপাতালে আজহারকে নিয়ে যেতে বাধ্য হন। খবর দেওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে আজহারের ভাইদের। পরে অবস্থার আরও অবনতি হলে ভাইয়েরা এসে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে নেন আজহারকে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদে আজহার হত্যাকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত হচ্ছেন আসমা। তবে আবদুর রহমান সব দোষ আসমার ওপর চাপাতে চাচ্ছেন। তার দাবি, তিনি প্রথমে ভুল করেন। পরে উপলব্ধি হলে আসমার সঙ্গে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চান। কিন্তু এতে আসমা রাজি হননি। বিভিন্নভাবে তাকে চাপ দিতে থাকেন। যার ধারাবাহিকতায় তাকে গত ঈদে বাড়িতে যেতে দেননি আসমা। জিজ্ঞাসাবাদে ইমাম আবদুর রহমান দাবি করছেন, যখন আজহারের বাসায় আরবি পড়াতে যেতেন তখন আসমাই আগ বাড়িয়ে তার সঙ্গে বিভিন্নভাবে আকার-ইঙ্গিতে ঘনিষ্ঠ হতে চাইতেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত