বিদ্যমান নানা আইনের সংস্কার নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। সাধারণভাবে একটা কথা বারবার উচ্চারিত হয় যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের নানা আইনই এখনো বলবৎ রয়েছে, যা একটি স্বাধীন দেশে কাম্য হতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি আইনের কথা সামনে আসে। যেমন: ফৌজদারি অপরাধে দন্ডবিধির যেসব ধারায় আসামির বিচার হয় সেটি ১৮৬০ সালে তৈরি অর্থাৎ আইনটির বয়স ১৬১ বছর; সাক্ষ্য আইনটি প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো এবং ফৌজদারি অপরাধের বিচারে পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে যে ফৌজদারি কার্যবিধি, সেটিও ১২৩ বছর আগের। কিন্তু আইন ও আইন সংস্কার নিয়ে আলোচনায় যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন সেটি হলো সমস্যা আসলে কোনটি? ব্রিটিশ আমল বা ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত আইনটিই সমস্যা নাকি সেই আইনের সময়োপযোগী সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় সংযুক্তি না হওয়াটা সমস্যা?
আইন সংক্রান্ত আলোচনায় একইসঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও মামলাজট বাড়তে থাকার পেছনেই এসব আইনের সংস্কারের অভাবকে দায়ী করা হয়। এমন মত যারা সমর্থন করেন তারা বলছেন, দন্ডবিধি ও ফৌজদারি আইনের ধারণা থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মতো আরও বিশেষ আইনগুলো তৈরি হয়েছে। তবে পদ্ধতিগত আইনগুলোর সংস্কার না হওয়ার কারণে বিশেষ আইনগুলোর সুফল মিলছে ধীরলয়ে। কিন্তু জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, পদ্ধতিগত এসব আইনের অনেক ধারা যেমন সচল রয়েছে, তেমনি অনেক ধারার ব্যবহার হয় না বললেই চলে। অন্যদিকে, অনেক অপরাধের বিচারেই এখন বিশেষ বিশেষ আইন হচ্ছে এবং এর সুফলও মিলছে। তারা মনে করছেন, মূলত পুরনো আইনের কারণে মামলাজট বাড়ে না। তারা আরও বলছেন, ফৌজদারি ও দন্ডবিধিতে অনেক কিছুই বলা আছে। কিন্তু এগুলোর অপপ্রয়োগ হচ্ছে। সমস্যা আইনে নয়, বড় সমস্যা হলো বিচারিক পদ্ধতির ত্রুটিতে। এ ছাড়া আইন প্রয়োগ যারা করছেন, তাদের দুর্বলতা এবং ব্যর্থতায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একইসঙ্গে মিথ্যা মামলার ক্ষেত্রে কেবল বাদীই নয় বাদীর উকিলকেও দায় দিতে হবে এবং বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাহলে মিথ্যা মামলাও কমবে, মামলাজটও কমবে।
অবশ্য একটা বিষয়ে কারোরই দ্বিমত নেই যে, প্রচলিত দেওয়ানি, ফৌজদারি, সাক্ষ্য আইনের মতো ‘প্রসিডিউরাল ল’ বা পদ্ধতিগত আইনগুলোর কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন দরকার। কেননা বিচারের ক্ষেত্রে কত দিনের মধ্যে বিচার করবে, তদন্ত কত দিনের মধ্যে হবে, এগুলোসহ সাক্ষ্য আইনেও কিছু পরিবর্তন হলে আইনগুলো যুগোপযোগী হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ধর্ষণ মামলায় ‘অভিযোগকারিণী সাধারণভাবে দুশ্চরিত্র কি না’এ রকম একটি প্রশ্ন আইনগতভাবে তোলার সুযোগ আছে এবং এর অপব্যবহারও ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে অভিন্ন ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকারী ভারত ও পাকিস্তান আইনের এই ধারাটি বাতিল করলেও বাংলাদেশ এ বিষয়ে উদাসীন রয়েছে। একইভাবে সাক্ষ্য আইনের ক্ষেত্রে যুগোপযোগী সংস্কারের অভাবও বহুল আলোচিত। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে প্রযুক্তিগত বা সাইবার অপরাধ অনেক বাড়লেও এসব অপরাধ প্রমাণে ভিডিও, স্থিরচিত্র, অডিও কীভাবে ব্যবহার হবে, ডিজিটাল ডিভাইস কীভাবে সাক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হবে সেসব বিষয়ে সাক্ষ্য আইনে স্পষ্ট কোনো বিশ্লেষণ ও সংজ্ঞা নির্ধারণ নেই। যা ইতিমধ্যেই সংযুক্ত হওয়া উচিত ছিল।
লক্ষ্য করা দরকার বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই নতুন নতুন অনেক আইন প্রণীত হয়েছে। ২০০৯ সালের মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিকবাদী আইনত্রয়ী জাতীয় মানবাধিকার আইন, তথ্য অধিকার আইন ও ভোক্তা অধিকার আইনের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। আবার দেখা যাচ্ছে ১৯৯০ সালের মাদক আইন সংস্কার করে ২০১৮ সালে নতুন মাদক আইন প্রণয়ন হয় এবং ওই আইনে মাদক মামলার বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে করার বিধান যুক্ত হয়। কিন্তু আইনটি বলবৎ হলেও মাদক মামলার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালই গঠিত হয়নি। অর্থাৎ সমস্যা কেবল আইনের নয়, প্রশ্নটি সামগ্রিকভাবে বিচার ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। এক্ষেত্রে আইন কমিশনের ভূমিকা অগ্রগণ্য হতে পারত। আইন কমিশনের উদ্দেশ্য ও কার্যাবলির প্রথমটিই হলো নির্ধারিত আইনসমূহ পরীক্ষা ও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই করা এবং এদের সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে সংশোধন বা প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করা এবং দ্বিতীয়টি হলো বিচার পদ্ধতির আধুনিকায়নের জন্য সংস্কারের সুপারিশ করা। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো প্রতিষ্ঠার রজতজয়ন্তীতে উপনীত হয়েও আইন কমিশনের কাক্সিক্ষত ভূমিকা দৃশ্যমান হচ্ছে না। আইন ও বিচার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত আইনগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট যেসব সিদ্ধান্ত দিয়েছে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংস্কারের ক্ষেত্রে সেসব সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনাসমূহ অনুসরণ করলেই এ ধরনের সংকট আর থাকবে না।
