স্বাভাবিক পরিবেশের অপেক্ষায় মঞ্চ

আপডেট : ৩০ মে ২০২১, ০১:৪৭ এএম

করোনার কারণে পুরো বিশ্বের মানুষেরই জীবন যাপনে এসেছে পরিবর্তন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনও তার বাইরে নয়। নতুন স্বাভাবিকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে কাজ হচ্ছে নাটক, সিনেমা ও গানের। তবে একেবারেই স্থবির হয়ে পড়েছে মঞ্চ। থিয়েটার, নাচ, কনসার্ট, যাত্রাপালার মতো যে সব শাখা মঞ্চের ওপর নির্ভরশীল সেগুলো বলতে গেলে অচল হয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে মঞ্চকর্মীরা পড়েছেন আর্থিক সংকটে। কিন্তু মনের জোর আর সংস্কৃতির ওপর দায়বদ্ধতা থেকে তারা কাজ করে যাচ্ছেন নিজেদের মতো। বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চায় এগিয়ে থাকা কয়েকটি দলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তারা নাটক নিয়ে একেবারেই প্রস্তুত, শুধু স্বাভাবিক পরিবেশের অপেক্ষা।

মামুনুর রশীদ

আরণ্যক কিন্তু থেমে নেই। আমরা সরাসরি নাটকের মহড়া থেকে শুরু করে নানা ধরনের কার্যক্রম করছি। এই যেমন এখন চলছে একটি বিশেষ কর্মশালা। নাম ‘বডি মাইন্ড মিউজিক’। সংগীত অভিনেতার দেহে প্রবিষ্ট হয়ে কীভাবে অভিনয়কে প্রভাবিত করে এটি সেই বিষয়কে বিস্তারিত জানার জন্য করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মশালা অভিনেতার জন্য খুবই জরুরি। কর্মশালা পরিচালনা করছেন ফয়েজ জহির। নাট্যাঙ্গন ইতিমধ্যে তার নানা গুণের পরিচয় পেয়েছে। যাই হোক, আরণ্যক নাট্যদল আমাদের নতুন নাটক ‘ফেইসবুক’ ও পুরনো নাটক ‘রাঢ়াঙ’সহ কয়েকটি নাটক নিয়ে তৈরি। শুধু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই আমরা মঞ্চে উঠব। করোনার প্রথম ঢেউয়ের  ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আগেই দ্বিতীয় ঢেউয়ে সব সেক্টরের মতো নাট্যাঙ্গন তথা গোটা সাংস্কৃতিক অঙ্গন ক্ষতিগ্রস্ত। দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা নিম্নআয়ের শিল্পী ও কলাকুশলীরা বর্তমানে খুবই কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। শিল্পীরা হাত পাততে পারেন না বলে এমন নয় যে, তারা ভালো আছেন। গতবার শিল্পীদের সহযোগিতায় সরকার এগিয়ে এসেছিল, কিন্তু এ বছর এখন পর্যন্ত আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাইনি। মুক্তিযুদ্ধসহ দেশ ও জাতির সব ক্রান্তিকালে শিল্পীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও শিল্পীদের এই দুঃসময়ে সরকার কেন নীরব ভূমিকা পালন করছে, তা আমার মাথায় ঢুকছে না। আমরা এ বিষয়ে খুব শিগগিরই সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী এবং শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে কথা বলব।

আতাউর রহমান

আমরা কাজ করে যাচ্ছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই আমার বেশকিছু নাটক মঞ্চে আসবে। আমি তো এখন শুধু নাগরিকের হয়ে কাজ করি না। সম্প্রতি শিল্পকলা একাডেমির ‘হ্যামলেট’ নির্দেশনা দিলাম। সেটি মঞ্চস্থ হবে। নাট্যম রেপার্টরির সঙ্গে আমি আর অপি করিম করলাম ‘ডিয়ার লায়ার’। সেটিরও শো হবে। পালাকারের হয়ে এর আগে করেছি জনপ্রিয় নাটক ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’। এবার তারা ‘ইদিপাস’ করতে চেয়েছে। এর আগেও আমাদের দেশে ইদিপাস হয়েছে। আমি নিজেও করেছি, বিটিভি যখন পিটিভি ছিল। তবে এই নাটকটি এখনো সমসাময়িক মনে করেই নতুন করে মঞ্চে আনছি। কারণ আমরা আসলেই নিয়তি বলি আর প্রকৃতি বলি, এর কাছে অসহায়। আমাদের এত অগ্রগতি হয়েছে কিন্তু আমরা কি পারছি করোনার মতো ভাইরাসকে মোকাবিলা করতে? তেমনি কুষ্ঠ, কলেরা, বসন্ত, প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লু কোনোটির সঙ্গেই মানুষ ফাইট করে দ্রুত পেরে ওঠেনি। এজন্য এই যুগেও আড়াই হাজার বছর আগে লেখা ‘ইদিপাস’ সমসাময়িক।

রামেন্দু মজুমদার

সংস্কৃতি অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু জীবন তো অপেক্ষা করে না। তাই এই পরিস্থিতিতে জীবন ধারণটাই সবচেয়ে মুখ্য। ভালো থাকতে হবে। আশপাশের সবাইকে ভালো রাখতে হবে। সংস্কৃতিকর্মীদের অনেক বড় শক্তি হলো তাদের কথায় সাধারণ মানুষ অনুপ্রাণিত হয়। তাই এ সময় তাদের উচিত যার যার জায়গা থেকে মানুষকে সচেতন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের দিকে নিয়ে আসা। পারলে অসহায়দের আর্থিক সহায়তা করা। তবেই আমরা আবার নাটক, নাচ, গান, আবৃত্তিÑ যাই বলি না কেন সবই করতে পারব। আমাদের দল থিয়েটার একেবারেই যে কাজ বন্ধ করে বসে আছে তা কিন্তু না। আমরা হয়তো সরাসরি শো বা মহড়া করতে পারছি না। কিন্তু জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে আমাদের দলের নতুন নাটক নিয়ে কাজ করছি। নাটকটির নাম ‘যামিনী না যেতে’। এটি সুরেন্দ্র বর্মার একটি হিন্দি নাটকের বাংলা অনুবাদ। কলকাতার অংশুমান ভৌমিক অনুবাদ করেছেন। আমি নির্দেশনা দিচ্ছি। নাটকটিতে মাত্র ৬-৭টি চরিত্র রয়েছে। তাই আমরা মহড়ার কাজ চালিয়ে নিতে পারছি। এটি ব্রিটিশ পিরিয়ডেরও আগের সময়ের গল্প নিয়ে নির্মিত একটি নাটক। নারীর স্বাধীনতাকে যে এক দিনে খর্ব করা হয়নি সেটি তুলে ধরা হবে। আশা করি নতুন নাটকটি মঞ্চে এলে দর্শকের মনে নাড়া দেবে।

ড. ইনামুল হক

পরিস্থিতি খুবই খারাপ। দ্বিতীয় ঢেউ প্রথম ঢেউয়ের চেয়েও মারাত্মক। এই সময়ে বেঁচে থাকাটাই মুখ্য। তবে, বেঁচে থাকতে গেলে অবশ্যই মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে হবে। কাজ না থাকাতে শিল্পীদের যাপিত জীবনে এখন গ্রহণের কাল। সরকার যদি এখনই এগিয়ে না আসে তাহলে দুস্থ শিল্পী ও কলাকুশলীদের জীবনে আরও বিপর্যয় নেমে আসবে। শিল্পীরা ভালো না থাকলে দেশ কীভাবে ভালো থাকবে। তাই এই পরিস্থিতিতে আমরা সত্যি বলতে নাটকের মহড়া বা কোনো ধরনের কাজ করছি না। ইচ্ছে আছে পরিস্থিতি একটু ভালোর দিকে গেলে জুনের শেষের দিক থেকে মহড়া শুরু করার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত