অনেকদিন ধরেই চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বিএসআরএম কারখানার আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ পানির কষ্টে ভুগছে। নলকূপে পানি নেই। অনেকে গভীর নলকূপ বসাতে গিয়েও পানি পাচ্ছে না। পেলেও কিছুদিন পর দেখা যাচ্ছে, পানি শেষ। পরে জানা যায় বিএসআরএম শক্তিশালী মেশিন বসিয়ে তলদেশের পানি তুলে নিচ্ছে। এর প্রতিবাদে এতদিন সাধারণ মানুষের তরফ থেকে স্বল্প পরিসরে প্রতিবাদ বিক্ষোভও হয়েছে। তবে তাতে কান দেয়নি কারখানা কর্র্তৃপক্ষ। তবে এবার স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন যোগ দিয়েছেন সেই প্রতিবাদে। কারখানা প্রতিষ্ঠাকালের শর্ত অনুযায়ী ফেনী নদী থেকে পানি আনতে না পারলে দুই মাসের জন্য কারখানাটি বন্ধ করে রাখা হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন তিনি। একই সঙ্গে কারখানাটি স্থানান্তরের জন্যও দুই বছরের সময় বেঁধে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের এই সংসদ সদস্য।
গতকাল রবিবার উপজেলার সোনাপাহাড় ইস্পাত কারখানার গেইটে হাজারখানেক মানুষের মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বেশকটি দাবি উত্থাপন করেন সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘গত ১০ বছর ধরে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ১০ থেকে ১২টি গভীর নলকূপ স্থাপন করে বিএসআরএম তাদের মালামাল উৎপাদন করছে। এতে পার্শ্ববর্তী ৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এতে চারদিকে শুরু হয়েছে পানির হাহাকার। তারা কারও কথা শুনছে না। আজ (রবিবার) থেকে তাদের ইস্পাত কারখানায় কোনো কাঁচামাল ঢুকবে না। আগামী দুই মাস ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকবে। ফেনী নদী থেকে পাইপলাইনে পানি আনতে পারলে ফ্যাক্টরি চলবে, না হয় বন্ধ থাকবে।’
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেন, ‘বিএসআরএম কর্র্তৃপক্ষ মিরসরাইয়ের মানুষকে ধোঁকা দিয়েছে। তারা ফ্যাক্টরি নির্মাণের নামে বন বিভাগের লোকজনকে ম্যানেজ করে একরের পর একর সবুজ বন ধ্বংস করে দখল করেছে। একটি বারোমাসি ছড়া দখল করে শত শত কৃষককে বোরো আবাদ থেকে বঞ্চিত করেছে। নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে বলে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারা এখন জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে ব্যবহার করছে।’
সংসদ সদস্য এ সময় কারখানা স্থানান্তর, গভীর নলকূপ অপসারণ, সোনাপাহাড় ছড়ার দখল ছাড়া, উজাড় হওয়া বনভূমিতে ফের বনায়নসহ বেশ কয়েকটি দাবি তোলেন।
মানববন্ধনের উদ্যোক্তা স্থানীয় বারইয়ারহাট পৌরসভার মেয়র রেজাউল করিম খোকন বলেন, ‘এমপি মহোদয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রশাসনকে নিয়ে আমরা বিএসআরএমের সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য করব। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীকে দিয়ে এসব গভীর নলকূপ সিলগালা করার জন্য আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করছি।’
এদিকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের দাবিদাওয়া নিয়ে বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজুর রহমান ও জোরারগঞ্জ থানার ওসি নূর হোসেন মামুনসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠক করেন বিএসআরএম কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে। সেখানে তারা মানববন্ধনে দেওয়া এমপির দাবি ত্বরিৎগতিতে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।
এ প্রসঙ্গে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘আমরা এমপি মহোদয়ের দেওয়া বক্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসআরএম কর্র্তৃপক্ষকে জানিয়ে এসেছি। এগুলো দ্রুত বাস্তবায়নেরও তাগিদ দিয়েছি।’
তবে এমপির বক্তব্য ও দাবি প্রসঙ্গে বিএসআরএম গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) তপন সেন গুপ্ত বলেন, ‘মানববন্ধনের বিষয়ে জেনেছি। বাকি বিষয় আমাদের লোকজন জানানোর আগে আমি কোনো বক্তব্য দিতে পারব না।’
দেশের ইস্পাত খাতের মার্কেট লিডার খ্যাত বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিল (বিএসআরএম)। তারা মিরসরাই উপজেলার সোনাপাহাড় এলাকায় স্থাপন করেছে দেশের বৃহৎ দুটো বিলেট কাস্টিং প্ল্যান্ট। এখানে ব্যবহারের জন্য তারা অনুমতি ছাড়া অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন বেশ কটি গভীর নলকূপ স্থাপন করে গত ১০ বছর পানি উত্তোলন করছে। যাতে এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যদিও তারা ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করবে না বলে জানিয়েছিল। তারা ৪ কিমি দূরের ফেনী নদী থেকে পানি এনে কারখানায় ব্যবহারের কথা ছিল। এছাড়া কোম্পাটি স্থানীয় সিন্দুইর্যা টিলা থেকে উৎপত্তি হয়ে বারোমাসি সোনাপাহাড় ছড়ার প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা দখল করে কারখানার অভ্যন্তরে নিয়ে গেছে। যার দরুন এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি পাহাড়কাটা, বনভূমি উজাড়, বিষাক্ত ধোঁয়া নির্গমনসহ নানা অভিযোগেও দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ বিরাজ করছিল স্থানীয়দের মধ্যে।
