রেড ভলান্টিয়ার

আপডেট : ০২ জুন ২০২১, ১২:২৩ এএম

কখনো কখনো মনে হয় যে, চমৎকার এক সিনেমা দেখছি। আবার মনে হচ্ছে, অসম্ভব ভালো এক উপন্যাসের পাতা ওল্টাচ্ছি। নাম ধাম না বললে মনে হতো, এ যেন বিপ্লব পরবর্তী চীন বা রাশিয়ার কোনো এক অজানা জনপদ। যেখানে সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে বুঁদ হওয়া একদল অসম সাহসী তরুণ-তরুণী রাতবিরেতে ঝড়-ঝঞ্ঝা, শীত-গরমের তোয়াক্কা না করে ছুটে বেড়াচ্ছে মানুষের পাশে থাকার তাগিদে ।

অদ্ভুত এক হতাশা, নৈরাশ্যের মধ্যে নতুন প্রজন্মের এই জেগে ওঠা নিঃসন্দেহে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ঘটনা। করোনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক ডামাডোলের অন্ধকারে কনে দেখা আলোর মতো এক পরিবেশের জন্ম হয়েছে এখন এই পশ্চিমবঙ্গে। যখনই কোথাও বিপদ, অসহায় মানুষের পাশে নীরবে পৌঁছে যাচ্ছে অজস্র তরুণ। সারা রাজ্যে সরকারের ভরসায় না থেকে মানুষের ভরসা এখন তাদের ওপর।

কেতাবি নাম রেড ভলান্টিয়ার। অন্তত এই সময়ে তাদের বাদ দিয়ে কোনো আখ্যান সম্পূর্ণ হবে না। পশ্চিমবঙ্গের ভোটের শেষ দিকেই বোঝা গিয়েছিল যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়তে চলেছে এ বঙ্গে। তখন চরম রাজনৈতিক আবহে কেউ সতর্ক না হলেও বামপন্থি যুব-ছাত্রদের বড় অংশ নীরবে সংগঠিত হচ্ছিল আসন্ন বিপদ মোকাবিলায়। ছোট ছোট দল। প্রাথমিকভাবে নানা জেলায় জেলায় খুঁজতে থাকা, পরীক্ষা করা কভিভ আক্রান্ত লোকজন। কার পজিটিভ? প্রথমদিকে সবচেয়ে সমস্যা ছিল অক্সিজেনের। শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে থাকা পেশেন্টের পরিবারের পক্ষে কঠিনতম কাজ ছিল অক্সিজেন সিলিন্ডার জোগাড় করা। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও হসপিটালে ভর্তি করা ছিল প্রায় অসম্ভব। একে তো সরকারি স্বাস্থ্য কাঠামো চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট কম। বেসরকারি হসপিটালে সিট থাকলেও তা এত টাকার, যা দেওয়ার ক্ষমতা গরিব এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারের নেই।

এই অবস্থায় মুশকিল আসান ওই রেড ভলান্টিয়ার। ফেইসবুকে তাদের নম্বর দেওয়া ছিল। তাই দেখে পেশেন্টের বাড়ির লোকজন ফোন করা মাত্র প্রায় বিদ্যুতের গতিতে সেখানে হাজির লাল স্বেচ্ছাসেবীর দল।

ধীরে ধীরে ভলান্টিয়ারের সংখ্যা বাড়তে লাগল। এখন সংখ্যাটা প্রায় এক লাখের কাছাকাছি। গড় বয়স ১৮-৪০ এর মধ্যে। ছেলেমেয়ে সবাই এক অঘোষিত প্রতিযোগিতায় নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছে। কে কীভাবে সব বাধা অতিক্রম করে মানুষের বিপদে ছুটে যাবে সবার আগে।

২ মে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফলে মমতা ব্যানার্জি তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এলেন। আসনসংখ্যার দিক দিয়ে দেখতে গেলে স্বাধীনতার পরে এই প্রথম রাজ্যে মূলধারার বামেরা পুরোপুরি মুছে গেল। বাম, কংগ্রেস, দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘুদের নতুন দল আইএসএফের জোট সংযুক্ত মোর্চা মোটে একটা সিট পেল। ভাঙ্গড় বিধানসভায় জিতলেন আইএসএফ-এর তরুণ প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকী।

বামেদের রাজনীতি নিয়ে নিন্দে মন্দের ঝড় উঠল কাগজে, টিভিতে ও সোশ্যাল মিডিয়ায়। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের আঁচ পোহাতে হলো সিপিএমের যুব ছাত্র সংগঠনের অধিকাংশ সদস্য সমর্থকদের, যারাই রেড ভলান্টিয়ারের মূল চালিকাশক্তি।

কোথাও কোথাও ব্যক্তি আক্রমণ করা হলো রাতবিরেতে বিপদের মধ্যে ছুটে যাওয়া স্বেচ্ছাসেবীদের। অনেক রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরাও ইতিহাসের সাল তারিখ ঘেঁটে জানিয়ে দিলেন ১৯৪৩ এর মন্বন্তরে এ রকম রিলিফ কাজে ঝাঁপিয়ে ছিল তখনকার কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী-সমর্থকরা।

কিন্তু তারা এও বললেন যে, এখন এই ২০২১-এ ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ সম্ভব নয়। এ ধরনের সংস্কারমুখী কাজ আর যা হোক বৈপ্লবিক কোনো কর্মসূচি হতেই পারে না।

কেউ কেউ এও বললেন যে, এসব কাজ করবে এনজিও। রামকৃষ্ণ মিশন, ইসকন কিংবা ভারত সেবাশ্রম সংঘ। বাম রাজনীতির সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই। এসব করে মানুষের ভেতরকার বিপ্লবী চেতনা ধ্বংস করা হচ্ছে। আল্ট্রা লেফটরা অনেকেই নিদান দিল যে, এই হচ্ছে সংশোধনবাদী রাজনীতি।

ভয় হয় যে, এই রাজনৈতিক চাপানউতোরে যেন তরুণদের এই অসাধারণ সাহস, নিষ্ঠা, ত্যাগ ও হার না মানা লড়াইয়ের মানসিকতা আড়ালে চলে না যায়।

ভুলে গেলে চলবে না, এই আমাদের মতো মধ্যবিত্ত ভদ্দরলোকেরা কিন্তু কথায় কথায় দূর দূর করি আজকের তরুণদের। স্বার্থপর, অসামাজিক আত্মসর্বস্ব বলে উঠতে বসতে গাল দিই। আমাদের সময় এই করেছি, সেই করেছি বলে নিয়ত নিজেদের ঢাক পেটাই তাদের কাছে এই তরুণদের কাজ এক অর্থে দেখিয়ে দেওয়া। গজদন্ত মিনারে বসে উপদেশ বিতরণও সময়-সময় বেশ অশ্লীল।

একটা কথা বলে নেওয়া উচিত। রেড ভলান্টিয়ারের পাশাপাশি আরও অনেক সংগঠন এই মুহূর্তে সারা রাজ্যজুড়ে মানুষের বিপদে নিঃস্বার্থভাবে রাতদিন পাশে আছেন। শুধু অক্সিজেন বা অক্সিমিটার জোগাড় নয়, কমিউনিটি রান্নাঘর সব বিষয়ে সক্রিয় অন্যান্য অনেক সংস্থাও। বীরভূম জেলায় বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চ বা দক্ষিণ ও উত্তর চব্বিশ পরগনার কভিড ওয়ারিয়ার, কভিড যোদ্ধারা একইরকম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে জনগণের সংকটে।

তবু রেড ভলান্টিয়ারকে একটু এগিয়ে রাখব এ জন্য নয় যে, তারা অনেক সংগঠিত বা সংখ্যায় বেশি বলে। এগিয়ে রাখব তাদের কাজে স্পষ্ট এক রাজনৈতিক মতাদর্শ আছে তাই। অন্য সংগঠন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাসক দলের বা প্রশাসনের সাহায্য পাচ্ছে। একটা অ্যাম্বুলেন্স, কিছু স্বাস্থ্য সরঞ্জাম পাওয়াও কিন্তু অনুদান। রেড ভলান্টিয়ারের যা কিছু সাহায্য তা পুরোটাই এসেছে আক্ষরিক অর্থেই জনসাধারণের কাছে চেয়েচিন্তে। এই স্বেচ্ছাসেবীদের বড় কৃতিত্ব তারা দলমত নির্বিশেষে মানুষের মনে ভরসা জোগাতে পেরেছেন। অনেক উদাহরণ আছে যে সম্পূর্ণ বাম বিরোধীরাও বিপদে পড়ে সাহায্য চেয়েছেন লাল স্বেচ্ছাসেবীদের কাছে। এখন আড়ালে-আবডালে অনেক নিন্দুকেরাও স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, রেড ভলান্টিয়ার না থাকলে পশ্চিমবঙ্গের কভিড পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর চেহারা নিত।

কভিড শব্দটাই যেখানে আতঙ্কের, যা হলে প্রিয়জনও অনেক সময় পালাতে পারলে বেঁচে যান, সেখানে অকুতোভয় ওই তরুণরা অক্লেশে যেভাবে আক্রান্তদের পাশে ডাকামাত্র ছুটে যাচ্ছেন তাতে তাদের কুর্নিশ করা ছাড়া উপায় নেই। হসপিটালে ভর্তি থেকে মারা যাওয়ার পর শেষ কাজটুকু করা সত্যি নীরবে করে চলেছেন পাশের ঘরের সাধারণ ছেলেমেয়েরা। যাদের দিকে হয়তো এই সেদিনও রাজনীতি করে বলে নিজের ছেলেমেয়েদের মিশতে বারণ করেছিলাম। যে মানুষ ভোটে বামেদের মুছে যাওয়া নিয়ে কিছুক্ষণ আগেই ফেইসবুকে মজা করেছিলেন, রাতে আচমকাই শ্বাসকষ্ট ওঠায় রেড ভলান্টিয়ার এসে দ্রুত হসপিটালে ভর্তি করে সে যাত্রায় তার প্রাণ বাঁচায়। এখন তিনিও ভিন্নমতের হয়েও ভলান্টিয়ার কাজের সমর্থক। অদ্ভুত কত ঘটনা। সত্যিই যা নিয়ে লিখে ফেলা যায় এক মহতী উপন্যাস। আমরা শুধু রেড ভলান্টিয়ার নামটুকুই জানি। তার পেছনে প্রাণ বিপন্ন করে দিনরাত খেটে চলেছেন যে তরুণেরা তাদের চিনিও না।

শুধু কি আর শহরে! খনি অঞ্চল থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, রেড ভলান্টিয়ার মানেই ঝলমলে রোদ্দুর। প্রজাপতির মতো বর্ণময় সব তরুণ-তরুণী। গরিবস্য গরিব থেকে মধ্যবিত্ত, উচ্চবর্গের হিন্দু, আদিবাসী, দলিত, সংখ্যালঘু আইডেনটিটি পলিটিকস বেড়া ডিঙিয়ে নতুন এক শ্রেণিরাজনীতি জন্ম নিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম-শহরে। হতে পারে অচলায়তন ভেঙে বহুদিন পরে নতুন এক বামপন্থার সূচনা ঘটছে অজানা অখ্যাত এইসব তরুণদের হাত ধরে।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত