প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। টাকার অঙ্কে বিদায়ী অর্থবছরের চেয়ে যা ৫ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা বেশি। তবে আসন্ন অর্থবছরের প্রাক্কলিত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বরাদ্দ আগের চেয়ে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে গেছে। এছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে সংকটে পড়া শিক্ষা খাত পুনরুদ্ধারে বড় কোনো উদ্যোগও নেই। সব মিলিয়ে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত শিক্ষা বাজেট গতানুগতিক বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের মোট বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের মোট বাজেটের চেয়ে ৩৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা বেশি। বাজেটের আকার বাড়ায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর বরাদ্দও বেড়েছে।
উন্নয়নের চেয়ে অনুন্নয়ন বাজেটে জোর
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৬ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরে ২৪ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন বাজেটে এই মন্ত্রণালয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বেশি পাবে। তবে বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাড়ানো অর্থ সমুদয় চলে যাবে অনুন্নয়ন খাত বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে। এমনকি চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রাথমিক শিক্ষায় উন্নয়ন বরাদ্দ কমে গেছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। কারণ নতুন বাজেটে প্রাথমিক শিক্ষার অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। চলতি বছরে যা ১৫ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ৮ হাজার ২২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে যা ৯ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা।
তবে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বরাদ্দে এতটা তফাৎ দেখা যায়নি। নতুন বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার জন্য ৩৬ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরে ছিল ৩৩ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের উন্নয়ন বাজেট ১১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। একইভাবে অনুন্নয়ন বাজেট ২১ হাজার ২৫২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। এছাড়া কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য ৯ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, বর্তমান অর্থবছরে যার পরিমাণ ৮ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। এই খাতে এবার উন্নয়ন বরাদ্দ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় বেসরকারি সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক কেএম এনামুল হক গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই বাজেটকে এককথায় গতানুগতিকের বাইরে কিছু বলা যায় না। দৃশ্যমান পার্থক্য শুধু টাকার অঙ্ক বেড়েছে। বরাবরের মতো বেতন ভাতার খরচ বাড়ানো হয়েছে। উন্নয়ন বঞ্চিতই থাকছে।’
জিডিপি অনুপাতে বরাদ্দ কমল শিক্ষায় : দেশের শিক্ষা পদ্ধতির দুর্বলতা ও করোনা পরিস্থিতিতে ক্ষতি বিবেচনায় শিক্ষাবিদরা অনেক দিন ধরেই জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ এবং জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে দেখা যাচ্ছে, মোট জাতীয় বাজেটের ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে শিক্ষা খাত। চলতি অর্থবছরে যার পরিমাণ ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪০ কোটি টাকা। এই হিসেবে জিডিপির তুলনায় শিক্ষা খাতে প্রস্তাবিত বরাদ্দ মাত্র ২ দশমিক ০৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে যা ছিল ২ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ টাকার অঙ্কে শিক্ষায় সামান্য বরাদ্দ বাড়লেও তা প্রাক্কলিত জিডিপির তুলনায় শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে গেছে।
টানা ১৪ মাসের বেশি সময় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। এসময় শিক্ষাব্যবস্থা এগিয়ে নিতে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিলেও সেগুলো তেমন একটা কাজে আসেনি। বিশেষ করে গ্রামের শিক্ষার্থীরা ভয়াবহ ক্ষতির মুখে রয়েছে। শিক্ষার্থী ঝরে যাওয়াসহ বাল্যবিয়ের হার কয়েকগুণ বেড়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে গতকাল অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় শিক্ষা খাতের ক্ষতির চেয়ে সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গই বেশি উঠেছে। তিনি বলেন, করোনাকালে শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অনলাইনে ২৯ লাখ ৯ হাজার ৮৪৪টি ক্লাসের আয়োজন করা হয়। মোট ২০ হাজার ৪৯৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫ হাজার ৬৭৬টি এবং ৪ হাজার ২৩৮টি কলেজের মধ্যে ৭০০টিতে অনলাইনে ক্লাস চালু করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনলাইনে মোট ৪ লাখ ৯৭ হাজার ২০০টি ক্লাসের আয়োজন করা হয়। এসব ক্লাসে ২ কোটি ৭৬ লাখ ৯১ হাজার ৪০৭ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছেন। বিদ্যালয় পর্যায়ে আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন কেনার জন্য ৪১ হাজার ৫০১ শিক্ষার্থীকে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হয়েছে।
তবে শিক্ষার দুরবস্থা পুনরুদ্ধারে অর্থমন্ত্রী আশার বাণী শোনাতে পারেননি বলে মনে করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের কর্মকর্তা কেএম এনামুল হক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনায় শিক্ষা খাতে ব্যাপক লার্নিং লস হয়েছে, সেটা উদ্ধারের ব্যবস্থা কোথায়? এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিক্ষার্থীদের জন্য আইসিটি উন্নয়ন দরকার। সেটিও বাজেটে অনুপস্থিত।’
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি শামসুদ্দিন মাসুদও প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ নিয়ে সন্তুষ্ট নন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘করোনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষতির শিকার হয়েছে। তাদের জন্য সরাসরি ঘোষণা থাকা উচিত ছিল।’
প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা পাবে ব্যাগ, জামা ও জুতা : সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাগ, জামা ও জুতা কিনতে নতুন অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের স্কুলে গমনের আনন্দ আরও জোরালো করতে প্রতি শিক্ষার্থীকে বছরের শুরুতে কিট অ্যালাউন্স (ড্রেস, জুতা ও ব্যাগ) বাবদ প্রাথমিকভাবে এক হাজার কোটি টাকা এবং উপবৃত্তির মাসিক হার ১০০ টাকার পরিবর্তে ১৫০ টাকা করে দেওয়ার নির্দেশনা প্রদান করেন। এজন্য বর্তমান অর্থবছরে ৩,৭১২ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছি আমরা, যার মধ্যে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা কিট অ্যালাউন্স (জুতা, জামা ও ব্যাগ কেনার অর্থ) বাবদ ব্যয় করা হবে।’
বেসরকারি শিক্ষায় ১৫ শতাংশ কর : নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে গতকালই এর প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নসহ বেশকিছু সংগঠন। অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল তার বাজেট প্রস্তাবে বলেন, ‘প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রযোজ্য সাধারণ করহার হ্রাস করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা কেবল তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত বেসরকারি কলেজ থেকে উদ্ভূত আয়ের ১৫ শতাংশ হারে কর নির্ধারণ করা হয়েছিল। সংসদে আমি এ করহার অর্থ আইনের মাধ্যমে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।’
