মুনিয়ার মৃত্যুর প্রতিবাদ সভায় সরকার পতনের ডাক!

আপডেট : ০৬ জুন ২০২১, ০১:৫৩ এএম

তারা দাঁড়িয়েছিলেন এক তরুণীর মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে। ব্যানারে লেখা ‘নাগরিক সমাবেশ’। তবে এ ছিল মূলত ভাসানী অনুসারী পরিষদের আয়োজন। জাতীয় পর্যায়ের কয়েকটি সংগঠনের নেতাদের উপস্থিতির ঘোষণা দিয়ে হাজির করা হয় কয়েকশ মাঝারি বিএনপি নেতাসহ কয়েক ব্যক্তিকে। ওই তরুণীর মৃত্যুর ঘটনাকে পুঁজি করে তারা সরকার পতনের ডাক দেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে ভাড়া করে আনা লোকজনের ভাগের টাকা নিয়ে বিত-ার মধ্যে পণ্ড হয়ে যায় সমাবেশ। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গতকাল শনিবার দুপুরে এই সমাবেশ আয়োজন করা হয়।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, ভোট ডাকাতি করে এই ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় বসেছে। রাতের আঁধারে ব্যালট ডাকাতি করে পুলিশ এই সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। এই ভোট ডাকাতির কারণে পুলিশ ও সরকারের বিচার করব আমরা। এই স্বৈরাচার সরকার, লুটপাটের সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, দেশের মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে না। তারা ভারতের তাঁবেদারি করে, দেশের মানুষের কথা ভাবে না। তারা ইসলামের বিরোধিতা করে। এই জালিম সরকারকে রাস্তায় টেনে নামাতে হবে। সরকারের প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্যে তারা আরও বলেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে দেশের মানুষ আপনাদের এমনভাবে ঘেরাও করবে, পালাবার পথ পাবেন না।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণের প্রতিবাদ জানিয়ে তারা বলেন, ‘ভিনদেশি প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য আমার দেশের ভাইদেরকে রক্তাক্ত করা হয়েছে।’

আয়োজক সংগঠন ভাসানী অনুসারী বিভিন্ন সময় সরকারের কার্যক্রমের বিরোধিতা করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সর্বশেষ দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণের প্রতিবাদে হেফাজতের আন্দোলনকেও সমর্থন দেয় সংগঠনটি। ওই ইস্যুতে সরকারবিরোধী সমাবেশ এবং বিক্ষোভও করেছে সংগঠনটি।

গতকালের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপির অঙ্গসংগঠন মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহসভাপতি ও সূত্রাপুর থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ফরিদ উদ্দিন, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব নঈম জাহাঙ্গীর, ভাসানী অনুসারী পরিষদের মহাসচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবুল, নাগরিক ঐক্য কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোশারফ হোসেনসহ বেশিরভাগ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা।

জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের নেতৃত্বে ২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বর পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ওই দিন হাইকোর্টের সামনে পুলিশের ওপর হামলা চালায় বিএনপির সশস্ত্র কর্মীরা। তারা পুলিশের গাড়িসহ বেশকিছু গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ওই ঘটনার পর বিদেশ পালানোর সময় এয়ারপোর্ট থেকে আটক হন উলফাত।

গতকালের আয়োজনে উপস্থিত বিএনপি নেতাদের মধ্যেই সৃষ্টি হয় ক্ষোভ। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে এমন আয়োজন নিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করেন রিপন নামের এক বিএনপি নেতা। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা রাজনীতি করি। আমাদের কি সময় আছে এসব প্রোগ্রাম করার? আমাকে রাতে কল দিয়েছে তাই আসছি। তাছাড়া যে মেয়েটি মারা গেছে তাকে নিয়ে এসব করা ঠিক না, কী দরকার এসব প্রোগ্রাম করার। আমার মনে হয় আজকে যা করছে তা ঠিক করেনি।

নাগরিক সমাবেশে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্টকর্মী খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ‘একটি মিটিংয়ে’ অংশগ্রহণের কথা বলে তাদের প্রেস ক্লাবের সামনে থাকতে বলা হয়। ত্রাণ এবং অনুদান দেওয়ার কথা বলে তাদের এখানে আনা হয়। কিন্তু তারা জানেনই না কোথায় কোন ধরনের মিটিংয়ে অংশ নিতে যাচ্ছেন। সমাবেশ চলাকালে সাংবাদিকরা অংশ নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর তথ্য দিতে পারেননি।

সমাবেশে বক্তব্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহসভাপতি ও সূত্রাপুর থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘এই সরকার জালিম সরকার, এই সরকার স্বৈরাচার সরকার। টেনেহিঁচড়ে এই সরকারের পতন ঘটাতে হবে। পুলিশ দিয়ে মানুষ গুম করে, খুন করে। কিন্তু বিচার নাই। এই সরকার ভারতের তাঁবেদারি করে, নিজেদের দেশ চালানোর ক্ষমতা নেই।’

নাগরিক ঐক্য কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন বলেন, ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভিনদেশি প্রধানমন্ত্রীকে এনে চরম ভুল করেছেন। আপনারা দেখেছেন ইসলামের কথা বললে সরকারের সহ্য হয় না। ইসলামের কথা বললেই দমন করা হচ্ছে। ভারত আমাদেরকে শাসন করছে। ভারতের কারণে আমার ইসলামী ভাইদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানের সময় মেরে ফেলা হয়েছে। ধিক্কার জানাই এ দেশের শাসন ব্যবস্থাকে। একজন ভিনদেশি প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য আমার দেশের ভাইদেরকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। কারণ আপনি রাজার নীতি দিয়ে দেশ চালান। রাজনীতি শিখেন নাই।’

ডা. মামুন হাসিব ভুঁইয়া বলেন, ‘স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলতে হয়। এদেশে গণতন্ত্র নেই। এই সরকার ভোটে আসে নাই। বর্তমান সরকার অবৈধ সরকার। নির্বাচনে কারচুপি করে করে এ সরকার ক্ষমতায় আছে। আমরা এ সরকার মানি না। অবিলম্বে এ অবৈধ সরকারকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামাতে হবে।’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সঠিক দায়িত্ব পালন করে না দাবি করে তিনি বলেন, পুলিশ সরকারের তাঁবেদারি করে।

গত ২৬ এপ্রিল রাজধানীর গুলশানে নিজের ভাড়া বাসা থেকে মোসারাত জাহান মুনিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ওই রাতেই গুলশান থানায় আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলা করেন মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান। মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ। জানা গেছে, পুলিশের তদন্তের এক পর্যায়ে মুনিয়ার রহস্যজনক মৃত্যুতে উঠে আসে চট্টগ্রামের পটিয়ার সাংসদ হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের নাম। পুলিশ ঘটনার শুরু থেকেই সবদিক আমলে নিয়ে মামলাটির তদন্ত করছে।

প্রথম দিকে পুলিশের ভূমিকায় সন্তুষ্ট থাকতে দেখা গেছে মামলার বাদী নুসরাতকে। কিন্তু মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের এক পর্যায়ে হুইপপুত্র শারুন চৌধুরীর নাম উঠে এলে বেঁকে যান নুসরাত। তিনি এবার পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। বিভিন্ন মিডিয়ায় এবং সংবাদ সম্মেলনেও পুলিশের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। গোটা বিষয়ে পুলিশের তদন্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

অন্যদিকে, মুনিয়া ‘হত্যাকা-ের শিকার’ দাবি করে শারুনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করেন মুনিয়ার ভাই আশিকুর রহমান সবুজ। মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন গোষ্ঠীকে উসকানি ও অর্থায়নেরও অভিযোগ রয়েছে হুইপপুত্র শারুনের বিরুদ্ধে।

গত ২৬ মে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের ব্যানারে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনের পর টাকার ভাগবাটোয়ারা হতে দেখা যায়। সর্বশেষ শারুনের টাকায় নাগরিক সমাবেশ ডাকল ভাসানী অনুসারী পরিষদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত