সিনেমার স্বীকৃতিতে উদ্বেলিত বাঁধন

আপডেট : ০৬ জুন ২০২১, ১১:৪৩ পিএম

বাংলাদেশের প্রথম কোনো সিনেমা বিশে^র অন্যতম সম্মানজনক ও প্রাচীন চলচ্চিত্র উৎসব ‘কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এ অফিশিয়ালি সিলেকশন পেয়েছে। নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ পরিচালিত দ্বিতীয় এ সিনেমার নাম ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। কানের এবারের আসরে প্রতিযোগিতা বিভাগ আঁ সার্তে রিগায় মনোনয়ন পেয়েছে ছবিটি। নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। এই পরিচালকের প্রথম ফিচার ফিল্ম ‘লাইফ ফ্রম ঢাকা’ এর আগে সিঙ্গাপুর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় পুরস্কার জয় করেছে। কানের ওয়েবসাইটে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর ঘোষণা আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছার ঢল নামে। এর আগে বাংলাদেশি কোনো সিনেমা নিয়ে এত প্রশংসামূলক আলোচনা আর হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। কারণ, অতীতে বাংলাদেশের কোনো সিনেমা এমন বড় অর্জন বয়ে আনেনি। বিশেষ করে এই সিনেমার পরিচালকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে না থাকা কিংবা নিভৃতচারী স্বভাবের জন্য তিনি ভীষণ সমাদৃত হয়েছেন। একই সঙ্গে প্রশংসায় ভাসছেন অভিনেত্রী বাঁধন। তাকে নিয়ে যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, তাদের বেশির ভাগ মানুষেরই কথা, বাঁধন তার পরিশ্রম ও ধৈর্যের মর্যাদা পেয়েছেন। আসলেই তাই। বর্তমানের এই প্রচার-প্রচারণার যুগে মানুষ কাজের চেয়ে তা প্রচার করে বেশি। অথচ বাঁধন এমন একটি সিনেমার পুরো কাজ শেষ করেছেন, অথচ কেউ কিছুই জানতে পারেনি। এমনকি সিনেমায় কাজ শেষ করেও তিনি ছিলেন একদমই নিশ্চুপ। অবশেষে তার ছবি কানের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি যেন নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়। মনে করিয়ে দেয়, কাজটা কাজের মতো করেই করে যেতে হয়। তাহলে এমনিতেই সাফল্য এসে ধরা দেয়। তাই তো বাঁধন এই প্রাপ্তির অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছেন না। নির্দ্বিধায় বললেন, ‘ইতিহাসের অংশ হওয়ার অনুভূতি কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, সত্যি আমার জানা নেই। আমি ভীষণ আনন্দিত, একই সঙ্গে গর্বিত। বাংলাদেশের নাম যে সিনেমার মাধ্যমে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাল, সেই ছবির অংশ আমিও। তবে এই আনন্দ কতখানি বা কী ধরনের, সেটা কিছুতেই কাউকে বুঝিয়ে প্রকাশ করতে পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যখন কাজটি করেছি, তখন থেকেই জানি ছবিটি ভালো হচ্ছে। আমি নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছি। পরিশ্রম কিংবা সততার কমতি ছিল না। বারবার নিজের সক্ষমতাকে নিজেই ভেঙে নতুন উদ্যমে কাজ করেছি। আমি খুব ভালো করেই জানতাম আমার পরিচালক ভীষণ মেধাবী। তিনি জানেন, আসলে কী করতে চাইছেন। এমন একটি টিমের সঙ্গে কাজ করা একধরনের স্কুলিংয়ের মতো। তারপরও কানের মতো সম্মান বয়ে আনবে, সেটি আমি তখন প্রত্যাশা করিনি।’ বাঁধন ফিরে গেলেন আগের দিনগুলোয়, ‘২০১৯ সালে যখন কাজটির সঙ্গে যুক্ত হই। আমি চরিত্রটি করতে পারব কি না, এ জন্য প্রথমে আমাকে দুই মাস অবজারভেশনে রাখা হয়। এরপর দীর্ঘ ৯ মাস রিহার্সাল করেছি। শ্যুটিংসহ মোট দেড় বছর সময় দিয়েছি। এই সময়ে অন্য কোনো কাজ করিনি। পুরো মনোযোগ ছিল এই কাজে। এটা আমার জীবনের এক ব্যতিক্রমী জার্নি ছিল। এভাবে আমি কাউকে কখনো কাজ করতে দেখিনি। পরিচালক আমাকে রেহানা মরিয়ম নূর চরিত্রটিতে মিশে যেতে সাহায্য করেছেন। ছবিটি করার সময় অনেকেই বলেছেন, বাঁধন হারিয়ে গেছেন। যারা জানতেন ছবিটি করেছি, তাদের অনেকেই বলতেন, একটা সিনেমার জন্য এত সময় দেওয়ার কী দরকার? ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের সব প্রশ্নের জবাব আমার সিনেমার এই প্রাপ্তি। আমি যদি জীবনে একটি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি, সেটা হচ্ছে এই কাজে যোগ দেওয়া। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এ রকম সুযোগ জীবনে আর না-ও আসতে পারে। সুযোগটি কাজে লাগিয়েছি। এখানে আমার যদি কিছু অবদান থাকে, সেটা আমার বিশ্বাস, আমার পরিশ্রম, আমার সময়, সঙ্গে স্যাক্রিফাইস।’

অনেক দিন পর লোকে বলবে বাঁধনের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রথম কোনো অভিনয়শিল্পী কানে আন্তর্জাতিক শিল্পীদের ছবির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেছিল। বিষয়টি ভাবতে কেমন লাগছেজানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বলব না আমার মাধ্যমে। আমি এই ছবির একটি অংশ। ছোট অংশ বা বড় অংশ বলে কিছু নেই। আমি নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছি এটা ঠিক। কিন্তু এই ছবির প্রতিটি চরিত্র ভীষণ ইমপ্যাক্টফুল। যেকোনো একটি চরিত্র বাদ দিলে ছবিটির গল্প পরিণতি পেত না। শুধু অভিনয়শিল্পীই নয়, প্রতিটি সেক্টরে সবাই সমান অংশ। শুধু পরিচালককে বলতে পারি বড় অংশজুড়েই তার অবদান।’

প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের শিক্ষক রেহানা মরিয়ম নূরকে কেন্দ্র করেই এই সিনেমার গল্প। যেখানে রেহানা একজন মা, মেয়ে, বোন ও শিক্ষক হিসেবে জটিল জীবনযাপন করেন। এর মধ্যে এক সন্ধ্যায় কলেজ থেকে বেরোনোর সময় রেহানা একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার সাক্ষী হন। এরপর থেকে তিনি এক ছাত্রীর পক্ষ হয়ে সহকর্মী এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ঘটনার প্রতিবাদ করতে শুরু করেন এবং ক্রমশ একরোখা হয়ে ওঠেন। কিন্তু একই সময়ে তার ৬ বছর বয়সী মেয়ের বিরুদ্ধে স্কুল থেকে রূঢ় আচরণের অভিযোগ করা হয়। এমন অবস্থায় অনড় রেহানা তথাকথিত নিয়মের বাইরে থেকে সেই ছাত্রী ও তার সন্তানের জন্য ন্যায়বিচারের খোঁজ করতে থাকেন।

আগামী মাসের ৬ তারিখ থেকে ফ্রান্সে শুরু হবে ঐতিহাসিক কান চলচ্চিত্র উৎসবের এবারের আসর। তবে ছবিটি কোন দিন প্রদর্শিত হবে তা এখনো জানা যায়নি। আরও কিছুদিন পর কান কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে জানাবে বলে জানালেন ছবির কো-প্রডিউসার রাজিব মহাজন। এবারের অস্কার আয়োজনও অনেকটাই স্বল্প পরিসরে হয়েছে। কান চলচ্চিত্র উৎসবও সেভাবেই হওয়ার কথা। কানের বড় আকর্ষণ হলো তাবৎ দুনিয়ার বিখ্যাত নায়িকাদের রেড কার্পেটের ঝলকানি। করোনার জন্য সেই বিরল অভিজ্ঞতা থেকে দূরে থাকতে হবে কি নাজানতে চাইলে বাঁধন বলেন, ‘না, আমার সেটা মনে হচ্ছে না। আমাদের ছবি উৎসবে প্রতিযোগিতা করবে। আর আমরা কেউ থাকব না, সেটা ভীষণ কষ্টকর হবে। এবারের কান উৎসব স্বমহিমায় হাজির হবে বলেই আমি আশাবাদী। আমিও সেখানে ছবির টিমসহ অংশ নিতে পারব আশা রাখছি।’

এদিকে, ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর পর বাঁধন কলকাতার পরিচালক সৃজিত মুখার্জির প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে খেতে আসেননি’র মুশকান জুবেরী চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সম্প্রতি পরিচালক সোশ্যাল মিডিয়ায় বাঁধনের কাজের দারুণ প্রশংসা করেছেন। এ কাজটি প্রকাশ হলেও দর্শক নতুন বাঁধনকে আবিষ্কার করবেন বলে তার বিশ্বাস।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত