বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম নগরের জনজীবন ও ব্যবসায়ী কর্মকা-ে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। দীর্ঘদিনের এ সমস্যা নিরসনে একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি)। এর মধ্যে বহদ্দারহাট বাড়ইপাড়া হতে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় ২০১৪ সালে। ৩২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে তিন গুণ। দুবার বাড়ানো হয়েছে মেয়াদকাল। তারপরও কাজই শুরু হয়নি। এবার আরও ১১৮ কোটি চেয়ে ২০২৪ সাল নাগাদ মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে সিসিসি। এর ফলে তিন বছরমেয়াদি প্রকল্প মেয়াদ বেড়ে দাঁড়াবে ১০ বছরে আর ব্যয় বাড়াবে ১ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকায়। এ হিসাবে প্রকল্পের ব্যয় বাড়তি সাত বছরে ১ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। তবে খালের খনন শুরু না হওয়া ও নতুন সংশোধিত প্রস্তাবে বিভিন্ন মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। গতকাল সোমবার এ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এ প্রশ্ন উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে সিসিসি মেয়র রেজাউল করীম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প নেওয়ার আগে ভালোভাবে সার্ভে করা হয়েছিল কি না বলা যাচ্ছে না। তারপরও প্রকল্পের আওতায় খাল খননের জন্য জমি অধিগ্রহণ শুরু হলে পাঁচটি মামলা হয়। এ মামলাগুলোর মধ্যে একটি এখনো চলছে। তবে জেলা প্রশাসককে জমি অধিগ্রহণ বাবদ ৯১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অর্থও পরিশোধ করা হয়েছে। আশা করি ওই মামলাটিও শিগগিরই নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। তিনি বলেন, আগে কাজের গতি না থাকলেও এখন গতি আসবে। বর্ধিত মেয়াদ ২০২৪ সাল নাগাদ এর কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
২০২০ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মোট বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৯১৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ। মূলত জমি অধিগ্রহণের কাজে এ টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু মূল খাল খননের কাজ সম্পন্ন করতে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময় চেয়েছে সিসিসি।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৪ সালের জুনে ২ দশমিক ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৬৫ ফুট প্রস্থ খাল খননের সংস্থান এবং খালের উভয় পাশে ২০ ফুট প্রস্থের রাস্তা নির্মাণকল্পে এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু বিভিন্ন অজুহাতে অদ্যাবধি খাল খনন শুরু হয়নি। নতুন করে প্রকল্প সংশোধনের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে বিভিন্ন খাতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দে প্রস্তাব করা হয়েছে। পিইসি সভায় এসব বাড়তি বাজের গতি ও বাড়তি ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব ব্যয় বৃদ্ধির আগে কোনো সার্ভে করা হয় কি না তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। সভায় বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক নগরী। ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম শহরে মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করে। ওই মাস্টার প্ল্যানের প্রধান বিষয় ছিল ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ। মাস্টার প্ল্যানে প্রস্তাব ছিল দ্রুত বৃষ্টির পানি অপসারণের জন্য বর্তমানে অবস্থিত খালগুলোর পুনর্বাসন এবং কিছু নতুন খাল খনন করা। এছাড়াও পানি ধরে রাখার জন্য কিছু পুকুর খনন করা।
মাস্টার প্ল্যানের সুপারিশের আলোকে ২০১৪ সালের জুলাইয়ে ৩২৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০১৭ সালে জুন নাগাদ বাস্তবায়ন শেষ হবে বলে ধরে নেওয়া হয়। পরে প্রকল্পটি জুন ২০২০ সাল নাগাদ মেয়াদ বাড়ানো হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। প্রথম সংশোধনের কাজে গতি না আসায় জুন ২০২১ পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি পায়। বর্তমান বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের পরিমাণ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
সিসিসির পক্ষ থেকে প্রকল্প ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির বেশ কয়েকটি কারণ দেখানো হয়েছে। পিইসি সভায় বলা হয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণ বিলম্ব প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির বড় কারণ। প্রকল্পটি ৯০ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে ভূমি অধিগ্রহণ খাতে। এটি চূড়ান্ত না হওয়ায় প্রকল্পটি যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা যায়নি।
এছাড়া বেশ কয়েকটি খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাবের সার্বিক বিষয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ করা হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে সভায় জানা যেতে পারে প্রকল্পের প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে ৫৮০০ মিটার রাস্তা নির্মাণের জন্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। কিন্তু রেইট শিডিউল পরিবর্তন হওয়ায় রাস্তা নির্মাণের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ২৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ২৯০০ মিটার ট্রেন নির্মাণের জন্য ৯ কোটি টাকা নির্ধারিত ছিল। ড্রেনের পরিমাণ ৫৫০০ মিটার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ২৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যা অত্যধিক মর্মে প্রতীয়মান হয়। রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের একক ব্যয় কেন এত বেশি তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধিত প্রকল্পে আটটি ব্রিজ ও একটি কালভার্ট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের নির্ধারিত স্থান এবং ড্রয়িং ডিজাইন আরডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়নি। এছাড়া ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি এবং প্রতিটি ব্রিজ নির্মাণের একক ব্যয় আরডিপিপিতে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করে পরিকল্পনা কমিশন।
সংশোধিত ডিপিপিতে ৫৫০০ মিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের জন্য ৩৬ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল। বর্তমানে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা । অর্থাৎ ৫৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অত্যধিক বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের একক ব্যয়, ডিজাইন ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা ও ভিত্তি নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যয় হ্রাস করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে ৫৪০০ মিটার ফুটপাত নির্মাণের জন্য ৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল। দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপিতে ৫৫০০ মিটার ফুটপাত নির্মাণের জন্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ফুটপাত নির্মাণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ১০০ মিটার। এ ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ২৮৪৮৮১ ঘনমিটার মাটি কাটাবাবদ ৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং ২৬১০০ ঘনমিটার বালি ভরাটবাবদ ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ব্যয় কিসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে তা জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্প সংশোধনের কারণে উল্লেখ করা হয়েছে পরামর্শক কর্র্তৃক সার্ভে সম্পন্ন করে সে ডিজাইন মোতাবেক রাস্তা, ড্রেন ও রিটেইনিং ওয়ালের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু পরামর্শক কর্র্তৃক সম্পাদিত সার্ভে, ড্রয়িং, ডিজাইন আরডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ন উইংয়ের যুগ্ম প্রধান মো. সেলিম বলেন, পিইসি সভা থেকে প্রকল্পের বেশ কয়েকটি খাতে ব্যয় কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটি সংশোধনের পর নতুন ডিপিপি পাঠালে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৯৫ সালের চট্টগ্রামে ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের সুপারিশক্রমে ড্রেনেজ এরিয়া ৭ এর ২২৬৪ হেক্টর এরিয়া পানি নিষ্কাশন তথা জলাবদ্ধতা নিরসনের স্বার্থে নগরীর বহদ্দারহাট বাড়ইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খননের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কেননা বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, খাজারোড ও চাক্তাইসংলগ্ন নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকায় স্থিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষাকল্পে বর্ণিত খাল খনন অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া খালের দুপাশে প্রস্তাবিত সড়ক নির্মাণের কারণে নতুন যোগাযোগব্যবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের ব্যবসা ও আবাসনের প্রসার, এছাড়া খালের দুপাশে সড়ক পার্শ্বের ফুটপাত নির্মাণের ফলে মানুষের নতুন বিনোদন সুবিধা বাড়বে বলে মনে করা হয়েছিল।
