দিগ্বিজয়ী রোমানদের অভিযান ইউরোপের ইতিহাসে এনেছিল নতুন গতি। যোগাযোগ ও সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রয়োজনে তারা তৈরি করেছিল সড়কপথ। বিস্ময়কর হলেও সত্যি রোমানদের তৈরি করা এ সড়কের অনেকগুলোই এখনো সচল। যুক্তরাজ্যে নির্মিত এমন কয়েকটি প্রাচীন রোমান সড়ক নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
এরমাইন স্ট্রিট
লন্ডনকে ইয়র্কের সঙ্গে যুক্ত করেছে এরমাইন স্ট্রিট। হাম্বার নদীর সমান্তরালে নির্মিত ৩১১ কিলোমিটারের এই সড়কটি ইংল্যান্ডের প্রাচীন রোমান সড়কগুলোর একটি। প্রাচীন হলেও এখনো এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। শুরুতে রোমানরা এটি ব্যবহার করে, পরে এই সড়ক ব্রিটেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হয়ে ওঠে। প্রাচীনকালে এটিকে অবশ্য এরমাইন স্ট্রিট নামে ডাকা হতো না। রোমান যাত্রার গল্প বলতে গেলে শুরু করতে হয় বিশপগেট দিয়ে। এই গেট সর্বপ্রথম তৈরি হয় রোমান যুগে। লন্ডনের যতগুলো সুরক্ষা দেয়াল রয়েছে তার মধ্যে বিশপগেট একটি। এরমাইন স্ট্রিট পার হয়েছে এই গেটের মধ্য দিয়ে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, প্রাচীনকালের প্রতীক এই সড়কটি। তখন বিশপগেট নামেই একে ডাকা হতো। এই সড়কের কাছাকাছি অবস্থান করা ইংরেজরা এই নাম দিয়েছে। অনেকে একে ‘আরনিংগা স্ট্রেইট’ ও ‘এরমিং স্ট্রিট’ বলেও ডাকে। পূর্ব লন্ডনে শোরডিচ ও স্টক নিউইংটনসহ এরমাইন স্ট্রিটও বর্তমানে বেশ সুপরিচিত।
রাজধানী থেকে কিছুটা উত্তর দিকে সরে আসায়, এরমাইন স্ট্রিটের বর্তমান ঠিকানা হচ্ছে এ-১০ ও এ-১ সেকশনের মধ্যে। এই সড়কটি আবার গুরুত্বপূর্ণ রোমান সড়ক রয়স্টন, গডম্যানচেস্টার ও লিংকনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। ভ্রমণপ্রিয়দের যদি স্বপ্ন থাকে লিংকনের ক্যাথেড্রাল ঘুরে আসার, তবে এর সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহাসিক আরও বিভিন্ন জায়গা যেমন রোমান নর্থ গেটের নিউপোর্ট আর্ক, লিংকন ক্যাসেল, মধ্যযুগীয় বিশপ’স প্যালেস দেখে আসতে পারেন।
ফস ওয়ে
যদি আপনি লম্বা সময় নিয়ে ড্রাইভিং-এ যেতে চান, আবার একইসঙ্গে ইতিহাসেও অল্প বিস্তর আগ্রহ থাকে, তবে প্রাচীন রোমান রোড ফস ওয়ে হয়ে উঠতে পারে আদর্শ। প্রাচীন যত সড়কের নাম বলা হোক না কেন, তার মধ্যে ফস ওয়ের নাম উল্লেখ থাকে। দক্ষিণ-পশ্চিমের এক্সটার থেকে উত্তর-পূর্বের লিংকন পর্যন্ত এই সড়ক বিস্তৃত। প্রথম ও দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দে এই সড়ক তৈরি করা হয়েছিল। ফস (Fosse) শব্দটি এসেছে ল্যাতিন শব্দ ফোসা (Fossa) (অর্থ : খন্দ) থেকে। দক্ষিণ-পশ্চিমের এক্সটার ও উত্তর-পূর্বের লিংকনের সঙ্গে এই সড়ক যুক্ত। ডিভনের এক্সটারকেই মূলত ফস ওয়ের শুরু বলা যায়। এক্সটার থেকে যাত্রা শুরু করে এক্সটার ক্যাথেড্রাল, শহরের মধ্যযুগীয় মাটির নিচের সড়ক, দুই হাজার বছরের পুরনো সিটি ওয়াল ট্রেইল দেখে আসা যায়।
৪৬ খ্রিস্টাব্দে ডামননি নদীর তীরে রোমান সৈন্যদের বেশ বড় আবাস গড়ে উঠেছিল। ধীরে ধীরে শহরজুড়ে রোমানদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে কাজের পরিধিও বাড়তে থাকে। এই ফস ওয়ে তখন দুই ভাগে ভাগ ছিল। একদিকের সড়ক গিয়ে মিলত এক্সটারে এবং অন্যটি যেত বাথে। উত্তর-পূর্ব সড়ক সোজা হনিটন থেকে হ্যাম হিল পর্যন্ত যেত। আর পশ্চিমের সড়ক এক্সমিন্সটার হয়ে হনিটন থেকে হ্যাম হিলে গিয়ে মিশত। বাথেও দেখার মতো ঐতিহাসিক অনেক স্থান আছে।
৪৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেনে রোমান আক্রমণের পরে প্রথম কয়েক দশক ধরে, ফস ওয়েকে লৌহযুগে ব্রিটেনে রোমান শাসনের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। বলা হয়, এই সড়কে গর্ত খোঁড়া হতো সুরক্ষিত থাকার জন্য। পরে তার ওপর দিয়েই তৈরি করা হয় সড়ক। এই সুরক্ষা সড়ক অনেকটুকু জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছিল। সাইরেনসিস্টারের অ্যাকমেন স্ট্রিট ও এরমিন ওয়েতে গিয়ে মিলেছে এই সড়ক। পার করেছে লেইসেস্টারের দক্ষিণের ওয়াটলিং স্ট্রিট, পরে আবারও গিয়ে মিলেছে লিংকনের এরমাইন স্ট্রিটে। বর্তমানে এই সড়কে বেশ কয়েকটি সেকশন করা হয়েছে। আধুনিক অনেকগুলো সড়ক ও লেন পার হয়েছে এই ফস ওয়ের মধ্য দিয়ে।
ওয়াটলিং স্ট্রিট
ইংল্যান্ডের অন্যতম প্রাচীন একটি সড়কের নাম ওয়াটলিং স্ট্রিট। ক্যানটারবেরি ও সেন্ট আলবানস শহরে প্রাচীন ব্রিটিশরা প্রথম এই সড়ক ব্যবহার করে। রোমানরা এটিকে পরে ব্রিটেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হিসেবে গড়ে তুলে আরও প্রসারিত করে। শুরুতে এই সড়কের নাম ছিল ইন্টার থ্রি। এটি বিস্তৃত ছিল লন্ডন থেকে ডোভার পর্যন্ত। ৯ম শতকে, ইংল্যান্ডের অ্যাংলো-স্যাক্সন ও ড্যানিশদের মধ্যে সীমানা রেখা হিসেবে ব্যবহার করা হতো ওয়াটলিং স্ট্রিটকে। প্রাচীন লন্ডন ব্রিজ এই সড়কের অন্তর্গত ছিল। ইভান মারগারির লেখা ‘রোমান রোডস ইন ব্রিটেন’ এ (১৯৭৩ সালের ৩য় এডিশন) এই সড়কের কথা উল্লেখ আছে। ১ নম্বর থেকে সংখ্যায় বিভক্ত করে (যেমন-সেকশন ওয়ান-এ, সেকশন ওয়ান-বি ইত্যাদি) এ থেকে এইচ পর্যন্ত কয়েকটি সেকশনে ভাগ করা হয়েছে এই সড়ক। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২১৪ মাইল। ইন্টার টু এর শেষ সেকশন থেকে হাড্রিয়ানের ওয়াল থেকে শুরু করে ভিরোসোনিয়াম, পাস্ট লেটোসিটাম, মানডুয়েসিডাম, ভেনোনিস, ল্যাকটোটোরাম, স্টোনি স্ট্র্যাটফোর্ড অ্যান্ড ম্যাগিওভিনিয়াম, ডিউরোচোব্রিভিস, ভেরুলামিয়াম এবং লন্ডন থেকে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব রিচবোরো পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ছিল। ইন্টার টু এর অন্য একটি সেকশন যুক্ত ছিল রক্সটার থেকে চেস্টার পর্যন্ত। বর্তমানে এই সড়কগুলো গাড়ি চলাচলের জন্য এখনও নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। লন্ডন থেকে ডোভার পর্যন্ত সড়ক পরিচিত এ টু নামে, লন্ডন ও শ্রেউসবারির মধ্য দিয়ে যাওয়া সড়ক পরিচিত এ ফাইভ নামে (বর্তমানে এটি হোলিহেড পর্যন্ত বিস্তৃত)। মিল্টন কিনেস শহরের ভেতর দিয়ে যাওয়া এ ফাইভ সড়কটি আবার ভাগ হয়েছে কয়েক ভাগে।
ওয়াটলিং সড়ক পরিচিত রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের কারণে। ব্রিটিশ ইতিহাসে এই যুদ্ধের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এ যুদ্ধে বৌদিকা, কুইন অব দ্য আইসনি’র (রোমান শহর কলচেস্টার ধ্বংস হয়েছিল এই নারীর হাতে) নেতৃত্বে ব্রিটিশ উপজাতিদের মধ্যে লড়াই হয়েছিল।
৪৩ খ্রিস্টাব্দে এই সড়কের বিস্তৃতকরণ শুরু হয়। লন্ডনের এই অংশটুকু নতুন করে উদ্ভাবন করেন ক্রিস্টোফার রেন। ১৬৭১-৭৩ সাল পর্যন্ত নতুন করে এর পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আধুনিক খননকারীদের মতে, সে সময়টি ছিল ৪৭ থেকে ৪৮ খ্রিস্টাব্দের শীতকাল। লন্ডনে সন্ধান পাওয়া ওয়াটলিং সড়কের দৈর্ঘ্য ছিল ২৫-২৯ ফুট। টেমস নদীর ওপর দিয়ে সরাসরি চলে গিয়েছে এই সড়ক। অতীতে ওয়াটলিং স্ট্রিট ঐতিহাসিক অনেক স্থানের প্রশাসনিক কর্মস্থল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এদের মধ্যে অনেকগুলো এখনো টিকে আছে।
এরমিন ওয়ে
ব্রিটেনে রোমান যত সড়কের নাম উচ্চারিত হয় তার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় এরমিন ওয়ের নাম। এরমাইন স্ট্রিটের সঙ্গে মিল থাকায় এই নাম উচ্চারণের কারণ বেশি। যদিও দুটো সড়ক এক নয়। এটি সিলচেস্টারের ক্যালিভা অ্যাট্রেবেটাম থেকে গ্লিভামের গ্লুচেস্টার পর্যন্ত বিস্তৃত। মূলত এই দুই শহরকেই এক করেছে এরমিন ওয়ে। নর্থ হ্যাম্পশায়ারের খুব ছোট্ট একটি জায়গার নাম সিলচেস্টার। প্রধান সব সড়কের সঙ্গে এই এলাকার যোগাযোগ বন্ধ। অথচ রোমানদের জন্য এই সড়ক বেশ জরুরি ছিল। লন্ডন থেকে পশ্চিমে এসে পরে মিশেছে দক্ষিণের উইনচেস্টারে। ওল্ড স্যারাম (স্যালিসবারি) সড়কটি দক্ষিণ পশ্চিমে আর এরমিন ওয়ে গিয়েছে নিউবারির দিকে। রোমান এই সড়কের নির্দিষ্ট করে পরিমাপ জানা নেই। এখান থেকে পাম্বার রোড, সোক রোড আর রেড লেন একদম কাছে। এরমিন ওয়ে’র দৈর্ঘ্য ৫৮২ মিটার লম্বা। গ্রেট ব্রিটেনকে এই সড়কটি দিয়েছে অন্যতম পরিচয়।
রোমানরা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে মাটির জিনিস বানাত। রোমান সাম্রাজ্যের উত্তর অংশে প্রচুর গম ও শস্যদানা ফলতো। যার কারণে পরে ইউরোপে এই এলাকা রুটির ঝুড়ি নামে পরিচিত ছিল। এই সড়ক দিয়েই যাতায়াত ছিল রোমানদের। গ্লুচেস্টার থেকে উল ও লোহা নিয়েও ব্যবসার কাজ করার জন্য ব্যবহার করা হতো এরমিন ওয়ে।
রোমের গোড়াপত্তন
যুদ্ধ, ব্যবসা, আত্মরক্ষা সবকিছু মিলিয়ে রোমান প্রাচীন সড়কগুলো নানা কারণে বিখ্যাত। পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল রোম। ইউরোপের প্রায় পুরোটাই তাদের দখল ও শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পৃথিবীর শাসনকেন্দ্র থেকে আধুনিক ইতালির রাজধানীতে পরিণত হওয়া রোম সাক্ষী অসংখ্য ইতিহাসের। রোমের কথা যেখানে বলা হচ্ছে, আলাদা করে সেখানে রোমান সাম্রাজ্যের কথা না বললেও বোধহয় চলে। রোমান সাম্রাজ্যের পতন বহু আগে হলেও তাদের রেখে যাওয়া বর্ষপঞ্জিকা কিন্তু আমরা এখনো ব্যবহার করি। কিছুটা পরিবর্তন হলেও মূল নিয়ম সেই রোমানদের সময়েই তৈরি। বহু আগের তৈরি রোমান স্থাপত্যগুলোর ইতিহাস আজও মানুষকে অবাক করে।
রোমের গোড়াপত্তনের ব্যাপারে ঐতিহাসিক তথ্যের চেয়ে প্রাচীন গল্পের সংখ্যাই বেশি। তবে সবচেয়ে প্রচলিত হচ্ছে রোমিউলাসের গল্প। বলা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ৭৫৩ সালে রোমিউলাসের হাত ধরে প্রথম রোমের গোড়াপত্তন হয়। রোমিউলাস ও তার ভাই রেমাসের মা ছিল সিলভিয়া আর তাদের বাবা ছিল যুদ্ধ দেবতা ‘মার্স’ কিংবা হারকিউলিস। তবে বাবা যিনিই হোক না কেন, ভবিষ্যদ্বাণী ছিল দুই ভাই বড় হয়ে স্থানীয় এক রাজাকে পরাজিত করবে। এ কারণে দুই ভাইকে ছোটবেলায় টাইবার নদীর তীরে ফেলে যাওয়া হয়। এরপর এক নেকড়ের কাছে বড় হয় তারা, অনেকটা গল্পের মোগলির মতো। বড় হয়ে তারা দুই ভাই ঠিকই সেই রাজাকে পরাজিত করে আর সিদ্ধান্ত নেয় টাইবার নদীর তীরে একটি শহর গড়ে তোলার। কিন্তু দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝামেলা বাধে আর তখন রোমিউলাস তার ভাই রেমাসকে হত্যা করে নিজের নামে গোড়াপত্তন করে রোমের।
অন্য আরেক প্রাচীন গল্পে রোমিউলাসকে বলা হয়েছে ট্রয়ের যুদ্ধের সময় পালিয়ে আসা এক ট্রোজান রাজপুত্রের বংশধর হিসেবে। ট্রয় থেকে পালিয়ে এসে সেই রাজপুত্র ইতালিতে আসে আর তারই বংশধর পরে রোমের গোড়াপত্তন করে। ঐতিহাসিকভাবে এসব গল্পের কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু রোমান ঐতিহাসিকরা দীর্ঘদিন ধরে রোমিউলাসকেই রোমের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এসেছেন। তবে খ্রিস্টপূর্ব ৭৫৩ সালে রোমের গোড়াপত্তনের ব্যাপারে মতপার্থক্য জানিয়েছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। রোমের বিভিন্ন স্থানে তারা খ্রিস্টপূর্ব ৭৫৩ সালের আগে মানুষ বসবাসের প্রমাণ পেয়েছেন। তবে সেগুলো রোমের গোড়াপত্তনের আগে থেকে থাকা স্থানীয় ছোট গ্রামেরও হতে পারে বলে অনেকে বলেছেন। কিন্তু ঠিক কবে, কীভাবে, কে রোমের গোড়াপত্তন করল সেটির কথা হয়তো কখনোই জানা সম্ভব হবে না। সে তথ্য অবশ্য জানা না গেলেও রোমানদের তৈরি করা সড়ক, ঐতিহাসিক স্থানগুলো স্মৃতি বহন করে আছে।
