প্রবাসীদের কোয়ারেন্টাইন ভোগান্তি

আপডেট : ০৮ জুন ২০২১, ১১:১৯ পিএম

এক-দেড় বছর আগেও কোয়ারেন্টাইন শব্দটি হয়তো অনেকেরই অজানা ছিল। কিন্তু চলমান করোনা মহামারীতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর এক অত্যাবশ্যক বিষয় হয়ে উঠেছে কোয়ারেন্টাইন। বিশেষত মহামারীকালে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাড়ি জমানো মানুষের মাধ্যমে করোনার সংক্রমণরোধে কয়েকদিনের কোয়ারেন্টাইন এখন বাধ্যতামূলক। সফরকারী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সঙ্গনিরোধ করে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে রাখার অর্থই কোয়ারেন্টাইন। পৃথিবীর বহু দেশই গত প্রায় দেড় বছর ধরে বিদেশফেরত এমনকি নিজ দেশেরই ভিন্ন শহর বা জনপদ থেকে আসা ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রেখেছে। অনেক দেশই এসব ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের ওপর জোর দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য কোয়ারেন্টাইন নামক এই সাধারণ বিষয়টিই এক বিরাট ভোগান্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে ফেরার সময় যেমন এই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, বিদেশে যাওয়ার পরও তেমনি ভোগান্তির শিকার তারা।

গত বছর দেশে মহামারী ছড়িয়ে পড়তে শুরু করার পরপরই বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শুরু। মহামারীর মধ্যে বিদেশে কাজ হারিয়ে লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক যখন দেশে ফিরতে শুরু করল তখনই তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার দাবি উঠেছিল। কিন্তু দেখা গেল প্রবাসীরা দেশে ফিরেই বিক্ষোভ করতে বাধ্য হয়েছেন কোয়ারেন্টাইনের নামে তাদের হয়রানি করা এবং তাদের সঙ্গে অমানবিক ও অসদাচরণের কারণে। এরপর বছর পেরিয়ে গেলেও এই পরিস্থিতির যে খুব একটা উন্নতি হয়নি সেটা গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনেই স্পষ্ট। এখন দেখা যাচ্ছে, অভিবাসী কর্মীরা বহু কাঠখড় পুড়িয়ে দেশ থেকে যাওয়ার পরও কোয়ারেন্টাইনের নামে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘বেশি টাকা নিয়ে রাখা হচ্ছে নিম্নমানের হোটেলে’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি সৌদি আরবে যাওয়া অভিবাসী শ্রমিকদের ভোগান্তি নিয়ে। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, কভিড প্রতিরোধক টিকা না নিয়ে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি সৌদি আরব যাচ্ছেন, তাদের কাছ থেকে কোয়ারেন্টাইনের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে বিমান। অবস্থানভেদে অতিরিক্ত টাকার পরিমাণ ১১ হাজার থেকে ২১ হাজার টাকা পর্যন্ত। অতিরিক্ত টাকা ব্যয়ের পরও প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিম্নমানের ফার্নিশড অ্যাপার্টমেন্টে রাখা হচ্ছে। এসব অ্যাপার্টমেন্টের পরিবেশ এবং খাবার মান অত্যন্ত নিম্নমানের। এমনকি ঠিকভাবে পানীয়জল সরবরাহ করা হয় না। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সোমবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠিও দিয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে ভিনদেশি একটি কোম্পানির মাধ্যমে সৌদি আরবে যাত্রীদের কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করছেন তারা। সেই চুক্তি যেহেতু বিমানের করা আর যাত্রীদের কাছ থেকে টাকাটা বিমানই নিচ্ছে ফলে বিমান এ বিষয়ে দায়িত্ব এড়াতে পারে না।  

সম্প্রতি সৌদি আরব সরকার কোয়ারেন্টাইন নিয়ে কঠোর নিয়ম চালু করে। গত ২০ মে থেকে দেশটিতে যেতে হলে কভিড টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। আর কেউ টিকা না নিয়ে সেখানে গেলে তাকে সাত দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকার বিধান চালু করে। এই নির্দেশনার ফলে বাংলাদেশি কর্মীরা কোয়ারেন্টাইন বাবদ ৬২ হাজার ৩০০ থেকে ৬৩ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে পরিশোধ করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টাইন বাবদ ৭৮ হাজার ৩১৫ টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে অভিবাসীদের। বিমানের টিকিটের মূল্যের সঙ্গেই কেটে নেওয়া হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের এই খরচ। বিশেষ করে শ্রমিকরা এই টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। কিন্তু সৌদি সরকারের নিয়ম এতই কঠোর যে, কেউ যদি করোনাভাইরাস ছড়ায় আর যদি সেই ব্যক্তি অন্য দেশের হয়, সে ক্ষেত্রে তাকে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি দেশটি থেকে বিতাড়িত করা হবে এবং তিনি আর কোনো দিন সৌদি আরবে যেতে পারবেন না।

সৌদি আরব কঠোর নিয়ম করেছে দেশকে করোনাভাইরাস মহামারী থেকে সুরক্ষা দিতেই। বাংলাদেশ সরকারেরও দায়িত্ব অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়া এবং প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষা করা। কিন্তু এই মহামারীর কালেও প্রবাসে বাংলাদেশের শ্রমবাজার রক্ষা এবং অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে সরকারের তেমন কোনো বিশেষ পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। অথচ, মহামারীর মধ্যেও বিদেশ থেকে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে তুলছে এই অভিবাসী আর প্রবাসী শ্রমিকরাই। সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারেই বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ মানুষ সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যসহ দেড়শতাধিক দেশের শ্রমবাজারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। মনে রাখা দরকার দেশের জিডিপিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান ১২ শতাংশ। সরকার চাইলে বিদেশে ফেরত যেতে চাওয়া অভিবাসীদের বিশেষ ব্যবস্থায় অগ্রাধিকারভিত্তিতে টিকাদান করতে পারে এবং করোনা পরীক্ষাসহ আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা করতে পারে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগে যে, প্রবাসীদের এমন যাত্রা আর ফিরতি যাত্রা আরেকটু সহনীয় করতে কিছু ব্যবস্থাপনা আর আর্থিক সহায়তা করার দায়িত্ব কি সরকার নিতে পারে না?   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত