‘প্রেমিকা’ নিয়ে বিরোধে আবুল কালামকে হত্যা

আপডেট : ০৯ জুন ২০২১, ১২:৪৭ এএম

রাজধানীর দুয়ারিপাড়ায় একটি ওয়ার্কশপে কাজ করতেন আবুল কালাম (২৩)। বন্ধু একই এলাকার শামীম মৃধা। শামীমের প্রেমিকার (গার্লফ্রেন্ড) সঙ্গে পরিচয়ের পর সখ্য গড়ে ওঠে দুজনের। বন্ধুর সঙ্গে প্রেমিকার এ সখ্য মেনে নিতে পারেনি শামীম। এ নিয়ে বিরোধের জের ধরে আবুল কালামকে হত্যার পরিকল্পনা করে শামীম। এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় চারজন।

২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল রাতে রাজধানীর রূপনগর দুয়ারিপাড়ার বাসা থেকে আবুল কালামকে বোটানিক্যাল গার্ডেনে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। পরে লাশ বস্তায় ভরে দুয়ারিপাড়ায় শামীমের ভাড়া বাসায় এনে মেঝের মাটি খুঁড়ে চাপা দেয়। ঘটনার কয়েক দিন পর বাসায় সবকিছু রেখে গ্রামে চলে যায় শামীম। ছয় মাস পর লাশ উদ্ধার এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত শামীম ও স্বাধীন মীরকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। তবে জড়িত বাকিরা অধরাই থেকে যায়। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার শামীম মৃধা উচ্চ আদালতে জালিয়াতির মাধ্যমে বয়স কম দেখিয়ে জামিন নিয়ে পালিয়ে গেছে।

ডিবি অন্য আসামিদের প্রকৃত নাম-ঠিকানা উদঘাটন করতে না পেরে আদালতে দুজনের নামে অভিযোগপত্র দাখিল করে। বাদী নারাজি দিলে মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তের মাত্র তিন মাসের মাথায় এ হত্যার রহস্য উদঘাটন করে সংস্থাটি। ঘটনার চার বছর পর হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলো সুমন কুমার (২৭) ও আকবর (২৪)। তারা ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।

তবে আবুল কালামের স্বজনদের অভিযোগ, চার বছর ধরে সুমন ও আকবর প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করেনি। এরই মধ্যে তারা মিরপুর এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এ দুজনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের অন্য সহযোগীরা মামলার বাদী নিহতের ভাই আবুল বাশার মিজিকে হুমকিধমকি দিচ্ছে।

আবুল বাশার মিজি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের খুনিরা এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। গ্রেপ্তার শামীম জাল জন্মসনদে ২০১৮ সালে বয়স ১৬ দেখিয়ে উচ্চ আদালত থেকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন নিয়ে পালিয়ে গেছে। এর কিছুদিন পরই বয়স যাচাইয়ের মেডিকেল রিপোর্টে দেখা গেছে, শামীমের বয়স ২০১৮ সালে ২১ বছর। পিবিআই যাদের গ্রেপ্তার করেছে তারাও এলাকাতেই ছিল।’

তিনি বলেন, ‘আকবর ও সুমনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের সহযোগীরা আমাকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে। তাদের গ্রুপে ১০-২০ জন রয়েছে। পিবিআইয়ের কাস্টডিতে থাকা অবস্থায় আকবর আমাকে খুন করার হুমকি দিয়েছে। আমি পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় আছি। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডির প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত আকবরকে গত ২৮ মে রাতে রাজধানীর রূপনগর থানাধীন দুয়ারিপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার স্বীকারোক্তিতে গত ১ জুন অন্য আসামি সুমন কুমারকে একই এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা জানায়, আবুল কালামের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে কৌশলে বাসা থেকে তাকে বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে রাত ৮টার দিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে তারা। পরে লাশ বস্তায় ভরে শামীমের দুয়ারিপাড়ার ভাড়া বাসার মেঝেতে গর্ত করে চাপা দেয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) পুলিশ পরিদর্শক মো. মাহমুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শামীমের প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলত কালাম। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এছাড়া স্বাধীনের কাছে কালাম ২০ হাজার টাকা পেত। টাকা ফেরত দেওয়া নিয়েও বিরোধ চলছিল। শামীম ও স্বাধীন পরিকল্পনা করে আকবর ও সুমনকে ভাড়া করে হত্যাকাণ্ড ঘটায়।’ তিনি বলেন, ‘আকবর ও সুমন পেশাদার অপরাধী। ঘটনার পর তারা কিছুদিন গা ঢাকা দিয়েছিল। এ সময় কক্সবাজারেও অবস্থান করে। কিছুদিন পর তারা ফের এলাকায় এসে নানা অপরাধ করত।’

নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আবুল কালাম নিখোঁজ হওয়ার পর কোথাও না পেয়ে তার ভাই আবুল বাশার মিজি ২০১৭ সালের ৬ জুলাই রাজধানীর রূপনগর থানায় অপহরণ ও খুনের অভিযোগে মামলা করেন। মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, রূপনগরের ইস্টার্ন হাউজিং এলাকার বাসা থেকে ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় দুয়ারিপাড়ার উদ্দেশে রওনা হন আবুল কালাম। এরপর আর ফেরেননি। পুলিশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারস্থ হয়ে আবুল বাশার জানতে পারেন, কালামের ব্যবহৃত ফোনটি তার আট বছরের বন্ধু শামীম ব্যবহার করছে। এছাড়া শামীম ঘটনার কয়েক দিন পর বাসা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা থানায় চলে যায়।

পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, মামলাটি রূপনগর থানা পুলিশ দুই মাস তদন্ত করে। পরে তদন্তভার পায় ডিবি পল্লবী জোনাল টিম। ডিবি মামলাটি তিন বছর তদন্ত করে। তদন্তকালীন মামলার এজাহারনামীয় আসামি শামীম মৃধা ও স্বাধীন মীর গ্রেপ্তার হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তাদের দেওয়া তথ্যে হত্যাকাণ্ডের প্রায় ছয় মাস পর ২৭ অক্টোবর শামীমের বাসা থেকে আবুল কালামের লাশের কঙ্কাল উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে তার লাশ শনাক্ত করা হয়।

আসামি স্বাধীন মীর আদালতে আবুল কালাম হত্যায় নিজেকে জড়িয়ে এবং আসামি শামীম, আকবর ও সুমনের ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশ আসামি আকবর ও সুমনের প্রকৃত নাম-ঠিকানা শনাক্ত করতে না পেরে গ্রেপ্তার দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। কিন্তু বাদীর নারাজি আবেদনের পর আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত