ভারত সীমান্তঘেঁষা জেলা মেহেরপুর। যে জেলার তিন দিকেই রয়েছে সীমান্ত। সবদিক ভারতীয় কাটাতাঁরের বেড়ায় ঘেরা। কিন্তু কাটাতাঁরের ওই বেড়ার এপারে নো ম্যানস ল্যান্ডে রয়েছে অনেক ভারতীয়র জমি। তেমনি নো ম্যানস ল্যান্ডের বাংলাদেশ অংশেও রয়েছে অনেক বাংলাদেশির জমি। যেখানে মিলেমিশে কাজ করেন দু’দেশের কৃষকরা। দেশজুড়ে করোনার ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ আতঙ্কের মধ্যেও মেহেরপুরের এই সীমান্তে প্রতিদিন শত শত ভারতীয় কৃষকের অবাধে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে তাদের জমিতে ঢোকা থেমে নেই। যারা প্রতিনিয়ত সংস্পর্শে আসছেন বাংলাদেশিদের। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী এসব গ্রামই করোনার ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বিস্তারের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা সীমান্তে বিজিবির নজরদারি বৃদ্ধি করে কৃষকদের সাময়িক সময়ের জন্য কাজে যাওয়া রোধ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
সরেজমিন গিয়ে সীমান্ত অঞ্চলের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেহেরপুরের ওপারে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাপড়া, তেহট্ট, কৃষ্ণনগর ও নবীনগর গ্রাম। আর এপারে মেহেরপুরের মুজিবনগর, বুড়িপোতা, ইছাখালী, রুদ্রনগর ও কাজীপুরসহ ১২টি গ্রাম। কাঁটাতারের বেড়া লাগোয়া নো ম্যানস ল্যান্ডে ভারতীয়দের শত শত বিঘা জমি থাকায় প্রতিদিন কৃষিকাজের জন্য তাদের এপারে আসতে হয়। কাঁটাতারের প্রধান ফটকে বিএসএফ সদস্যদের কাছে নাগরিক কার্ড (আধার কার্ড) জমা দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে আসেন তারা। প্রতিদিন ভোর ৬টায় ফটক খুলে দিলে শত শত ভারতীয় নিজ জমিতে কৃষিকাজ করতে আসেন। আবার কাজ শেষে বিকেল ৫টায় তারা ফিরে যান ভারতে। নো ম্যানস ল্যান্ডে জমি আছে বাংলাদেশিদেরও। কোনো কোনো বাংলাদেশি আবার ভারতীয়দের জমি ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করছেন। মাঝখানের কাঁটাতারের বেড়া দুই দেশকে বিভক্ত করেছে ঠিকই। কিন্তু এভাবে প্রতিদিনই দুদেশের কৃষকরা মিলেমিশে সারা দিন কাজ করে ফিরে যাচ্ছেন নিজ রাষ্ট্রে। কিন্তু করোনা মহামারীর এই সময়েও মিলেমিশে এমন কাজকে ভয়ংকর হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ভারতীয়রা স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বাংলাদেশিদের সঙ্গে মিলেমিশে যেভাবে কাজ করছে, তা করোনার ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বিস্তারের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটা নিয়ে সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের মধ্যেও দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবারও জেলায় নতুন করে ১৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ১১১৭ জনের। মারা গেছেন ২৩ জন। বর্তমানে জেলায় মোট করোনা পজিটিভ রোগীর সংখ্যা ৯৮ জন। আর শুধুমাত্র গত ১৪ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত ৩৪৭ জনের নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে।
সম্প্রতি মুজিবনগর সীমান্তের ১০৫ নম্বর মেইন পিলারের কাছে গিয়ে ভারতীয়দের সঙ্গে কাজ করতে দেখা যায় জয়পুর গ্রামের কৃষক বেল্লাল হোসেনকে। তিনি এক ভারতীয়র জমি ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করছেন। পাশেই ভারতের চাপড়া থানার শাহপুর গ্রামের কৃষক রঞ্জিত সাহার জমি। একই আইলে চাষাবাদে, গল্পে মগ্ন তারা। ইছাখালী সীমান্তের বাংলাদেশি কৃষক তোফাজ্জেল আকবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফসল লাগানো থেকে ঘরে তোলা পর্যন্ত মিলেমিশে কাজ করতে হয় আমাদের। ওরা গেট পার হয়ে আসে। আবার গেট পার হয়ে চলে যায়। কাজের চাপে করোনা নিয়ে চিন্তার সময় নেই আমাদের।’
কাজীপুর সীমান্তের আরেক বাংলাদেশি কৃষক শামিউল হক বলেন, ‘শুনেছি ভারতীয় জাতের করোনাটা অনেক ভয়ংকর। কিন্তু এটা নিয়ে কেউ নিষেধ বা সতর্ক করেনি।’
গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মোবারক মোল্লা জানান, স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রশাসন বা বিজিবি কারও পক্ষ থেকেই তাদের সতর্ক করতে মাইকিং বা অন্য কোনোভাবে প্রচারণা চালানো হয়নি। তার মতে এই মুহূর্তে সীমান্ত লাগোয়া গ্রামের কৃষকদের মাঠে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা, সতর্ক থাকা কিংবা কাজে না যেতে বলা উচিত। এজন্য প্রশাসনিক উদ্যোগ জরুরি।
এ প্রসঙ্গে জেলা পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্ত ডা. অলোক কুমার দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরো দেশের গড় করোনা সংক্রমণ হার যেখানে ১০ শতাংশের নিচে সেখানে মেহেরপুরে করোনা সংক্রমণ হার ৩৮ শতাংশেরও বেশি। অথচ করোনা সতর্কীকরণে সীমান্ত গ্রামগুলোতে নেই কোনো প্রচার-প্রচারণা। সীমান্তঘেঁষা কৃষকের তালিকা করে তাদের কাজ থেকে আপাতত বিরত রাখা উচিত। কেননা তাদের মাধ্যমে দ্রুত ছড়াতে পারে ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট। এই অবস্থা চলতে থাকলে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোই বাংলাদেশের ক্ষতির বড় কারণ হবে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মেহেরপুরের সিভিল সার্জন নাসির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারতীয় ও আমাদের দেশের কৃষকদের মিলেমিশে কৃষিকাজ এখনই বন্ধ করা উচিত। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্ত গ্রামের সব স্বাস্থ্যকর্মীদের সতর্ক রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি ছাড়া কাউকে কৃষিকাজে না যেতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর চুয়াডাঙ্গা সেক্টরের পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট রোধ করতে সীমান্তে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিজিবির টহল বাড়ানো হয়েছে। রাতেও রয়েছে বিজিবির একাধিক টহল দল। কৃষকরা যেন ভারতীয়দের সঙ্গে মিশতে না পারে সে ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে।’
আর মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক মনসুর আলম খান বলেছেন, ‘মেহেরপুর সীমান্তেকরোনার বর্তমান ঊর্ধ্বগতি খুবই উদ্বেগের। এক্ষেত্রে সীমান্ত গ্রামের মানুষকে অধিক সতর্ক এবং চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপে বিজিবি ও স্বাস্থ্য বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে সব ইউএনও এবং ইউপি চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সীমান্তঘেঁষা জমির কৃষক তালিকা করে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে।’
