বৃহস্পতিবার সকালে পরলোক গমন করেন পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। এই পরিচালকের ‘লাল দরজা’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন অভিনেত্রী গুলশান আরা চম্পা। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করলেন তিনি। অনুলিখন করেছেন সুদীপ্ত সাইদ খান।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত অনেক বড় মাপের একজন পরিচালক ছিলেন। ওনার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি, তিনি সবার থেকে আলাদা। তার কাজের স্টাইলটাও একেবারে আলাদা। প্রচণ্ড ডেপথনেস নিয়ে কাজ করতেন তিনি, খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করতেন। আমরা শিল্পী কলাকুশলী সবাই যেন গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারি -এই জিনিসটা কিন্তু ওনার কাছ থেকে আমাদের শেখা । কীভাবে একটা ভালো কাজের জন্য মনোযোগ দিতে হয় এটা তার কাছ থেকেই রপ্ত করেছি। একটা কাজের সঙ্গে কীভাবে আরও ভালোভাবে ইনভলব হওয়া যায়-এই টেকনিকটাও তার কাছ থেকেই শেখা।
‘লাল দরজায়’ আমার কিছু জটিল সিকোয়েন্স ছিল, যেগুলোতে ডায়ালগ নয় আমার চেহারা, আমার বডি ল্যাংগুয়েজ দিয়ে সব বোঝাতে হবে। শুধু ডায়ালগ বলেই আমার বক্তব্য শেষ করলাম কিন্তু আমার ভেতরে কি ঘটছে সেটা বোঝালাম না সেটা হবে না, ডায়ালগ ছাড়াও নিজের ভেতরের অনুভূতি কীভাবে বোঝাতে হবে মানে এক্সপ্রেশন দিয়ে কীভাবে বক্তব্যটা তুলে ধরা যায় সেটা ওনার কাছ থেকে শিখেছি। দাদার কাছ থেকে এমন কঠিন কঠিন কিছু বিষয় শিখেছি যেগুলো আমার আজও কাজে লাগছে।
শুরুতে কাজের ব্যাপারে ওনাকে যেমন কঠিন মানুষ হিসেবে দেখেছিলাম কিন্তু পরে আস্তে আস্তে ভীষণভাবে সহজ সরল মানুষ হয়ে গেছেন। তার ভেতরে যে একটা শিশু বাস করে, সেটার প্রমাণও পেয়েছি। তিনি আমাকে বোনের মতো দেখতেন, দিদি বলে ডাকতেন। ওনার সঙ্গে একটা পারিবারিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল।
১৯৯৭ সালে ‘লাল দরজা’য় কাজ করার পর তার সঙ্গে আর কোনো ছবি করা না হলেও সব সময় আমাদের যোগাযোগটা ছিল। বুদ্ধদেব দাদাকে নিজের অভিমানের কথাও বলেছি। আমি মাঝে মাঝেই অভিমান করে বলতাম আর তো কোনো দিন সিনেমায় ডাকলেন না। যেহেতু বোনের মতো দেখতেন তাই কলকাতায় গেলে ওনার সঙ্গে দেখা না করলে কষ্ট পেতেন। বৌদিও আমাকে অত্যন্ত স্নেহ আদর করত। তাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ প্রচুর হতো। দাদাকে আমার খুব ভালো লাগত।
করোনা শুরু হওয়ার অনেক দিন আগে দাদার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছে। এর মাঝে ফোনে কথা হয়েছে অনেক। সর্বশেষ কথা হয়েছে মাস দু-এক আগে। তখন কথা বলার সময় মনে হয়েছিল উনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো আছেন। কিন্তু বুঝতে পারিনি ভেতরে-ভেতরে তিনি এতটা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি কিডনি রোগের ডায়ালাইসিস করতে যেতেন আমি তাকে বলতাম আপনি সাবধানে যাবেন। উনিও বলতেন হ্যাঁ, আমি সাবধানেই যাচ্ছি। বেশ কয়েকবার তিনি ফোনে বলেছেন, করোনা ঠিকঠাক হয়ে গেলে আসো দিদি, অনেক দিন দেখা করি না, আসো বসে গল্প করব। কিন্তু এখন তো আর দেখা হওয়ার কোনো সুযোগ আর থাকল না।
দাদার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর থেকেই সারা দিন ধরেই আমি বিষণ্ন ছিলাম। আত্মার ভেতর একটা অতৃপ্তি রয়ে গেলে, দাদার সঙ্গে যদি আরও কথা বলতে পারতাম। পাশাপাশি ওনার স্মৃতিগুলো মনে পড়ছে, খুব খারাপ লাগছে। পুরোনো স্মৃতিগুলো মনে হবে। উনি চলে গেছেন কিন্তু স্মৃতি রেখে গেছেন। কাজগুলো রেখে গেছেন। ওনার সঙ্গে আমার কাজের অভিজ্ঞতাগুলো, তার শিক্ষণীয় বিষয়গুলো আমার কাছে থেকে যাবে আজীবন। তিনি আজীবন থেকে যাবেন আমাদের অন্তরে।
