চম্পার স্মৃতিতে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

আপডেট : ১১ জুন ২০২১, ১২:২৭ এএম

সংস্কৃতি অঙ্গনে আবারও দুঃসংবাদ। মারা গেছেন কলকাতার প্রখ্যাত চিত্রনির্মাতা বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে দক্ষিণ কলকাতায় নিজ বাসায় মৃত্যু হয় ৭৭ বছর বয়সী এ পরিচালকের। দীর্ঘদিন কিডনির রোগে ভুগছিলেন তিনি। ডায়ালাইসিসও চলছিল। অবশেষে জীবনযুদ্ধে পরাজিত হলেন। বেশকিছু সিনেমার জন্য বাঙালি মনে রাখবে তাকে। তার মধ্যে অন্যতম সিনেমা ‘লাল দরজা’। অস্কার মনোনীত এ মুভির প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত অভিনেত্রী গুলশান আরা চম্পা। প্রিয় পরিচালকের শেষ বিদায়ে তাকে স্মরণ করেছেন তিনি। কথা বলেছেন মাসিদ রণ

এই কদিন আগেই বুদ্ধদার সঙ্গে শেষ কথা হলো। ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি তিনি অসুস্থ। তিনি বরং আমাকে ও আমার পরিবারকে করোনার মধ্যে সাবধানে থাকতে বললেন। জানালেন, অনেক দিন দেখা হয় না। পৃথিবী করোনামুক্ত হয়ে গেলে আবার দেখা হবে। অনেক আড্ডা জমে আছে। কিন্তু আজ (গতকাল) সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনি তিনি আর নেই। আর দেখা হলো না। তার সঙ্গে আর কথা হবে এটা ভাবতেই পারছি না। করোনা আমাদের বড্ড ক্ষতি করল। কত প্রিয়জনকে হারালাম। সত্যি মনটা ভেঙে গেছে। হতে পারে তিনি ভিনদেশি মানুষ, আমি তার একটিমাত্র সিনেমাই করেছি। কিন্তু আমাদের সম্পর্ক ছিল পারিবারিক। তার ছোট মেয়ে শিউলি আর আমার মেয়ে এশা একসঙ্গে কানাডায় লেখাপড়া করেছে। তবে তার সঙ্গে পরিচয়ের শুরুর দিকে কিন্তু এমন হৃদ্যতা তৈরি হয়নি। আমার সৌভাগ্য যে বিখ্যাত অনেক পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কলকাতার পরিচালকদের মধ্যে প্রথম করি গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। এরপর সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দীপ রায়ের ‘টার্গেট’। এ মুভিটি ভারতের একটি ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়। তখন সেই উৎসবের জুরি বোর্ডে ছিলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। সেই মুভি দেখেই তিনি মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলেন আমিই হবো তার ‘লাল দরজা’র প্রধান নারী চরিত্র।

আসলে একেকজন পরিচালকের কাজের ধরন একেকরকম। এর আগে গৌতম ঘোষ ও সন্দীপ রায়ের সঙ্গে কাজ করার জন্য আমাকে অডিশন কিংবা স্ক্রিন টেস্ট দিতে হয়েছে। তবে বুদ্ধদা আমাকে এসব ছাড়াই মুভিটি করার প্রস্তাব দেন। প্রত্যেক পরিচালকই কাজের ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। কিন্তু বুদ্ধদা বোধহয় একটু বেশি খুঁতখুঁতে আর বেশি সিরিয়াস ছিলেন। তাই শুরুর দিকে তার মেজাজের সঙ্গে আমাকে খাপ খাওয়াতে একটু সমস্যা হচ্ছিল। আমরা তো হেসেখেলে শ্যুটিং করে অভ্যস্ত। কিন্তু ‘লাল দরজা’য় আমার চরিত্রটি ছিল খুবই ইনটেনস। এই মহিলার কোনো কিছুর অভাব নেই। স্বামী বড় ডাক্তার। কিন্তু মানসিক শান্তি নেই তার। স্বামী তাকে স্ত্রী হিসেবে নামেমাত্র রেখে দিয়েছে। তার সঙ্গে তার মানসিক কোনো যোগাযোগ নেই। ঠিকমতো কথা পর্যন্ত বলে না। একজন নারীর যে শুধু সংসার আর সন্তান মানুষ করা ছাড়াও নিজের জন্য কিছু কোয়ালিটি টাইম দরকার সেটা কেউ বোঝে না। মহিলাটিকে দেখলেই মনে হবে তার মনে অনেক কষ্ট। তাই শুরুর দিকে শ্যুটিং করতে গেলে তার কাছে বকা খেয়েছিলাম। তিনি বুঝিয়েছিলেন চরিত্রটি কেমন। এরপর থেকে আমি সেটে কারও সঙ্গে সেভাবে মেলামেশা বা কথাবার্তা বলতাম না। তখন দেখলাম চরিত্রটি যা ডিমান্ড করে আমি সেটাই অনায়াসে ডেলিভারি দিতে পারছি। এই মুভিতে আমার যতটা না সংলাপ ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল সাইলেন্ট অ্যাকটিং। এটি ছিল আমার জন্য একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন লার্নিং। তিনি আমাকে প্রকৃত শিল্পী হওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন। পরে চেষ্টা করেছি সেই জ্ঞান অন্য মুভিতে কাজে লাগাতে ও প্রকৃত শিল্পী হয়ে উঠতে। কতটুকু পেরেছি সেটা দর্শক বলতে পারবেন।

এসব কারণে এই মুভিটি আমার ভীষণ প্রাণের। মুভির শেষদিকে তিনি আমার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়েই ছোট বোন বানিয়ে ফেলেছিলেন। যদিও আমাকে দিদি বলে ডাকতেন। তিনি নিজ হাতে আমাকে রান্না করে খাইয়েছেন। আমিও তাকে সরষে ইলিশ রান্না করে খাইয়েছি। বাংলাদেশকে ভীষণ ভালোবাসতেন। আমার সঙ্গে বাংলাদেশ নিয়ে অনেক গল্প করতেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেককিছু জানতে চাইতেন। একবার ফোন করে বললেন, চম্পাদি, আমার দিদিরা ফরিদপুরে যাবে, তাদের একটু যতœ করবেন। যদিও পরে ওই পরিকল্পনা তারা বাতিল করেন। এমন এক মহান মেধাবী মানুষকে হারিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। যদিও তার সঙ্গে পরে আর কাজ করা হয়নি। এ নিয়ে আমার অনুযোগ ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘চম্পাদি, আপনাকে দেওয়ার মতো ম্যাচিউর রোল আমার কোনো মুভিতে ছিল না। এজন্য আপনাকে ডাকিনি। যেদিন পাব, সেদিনই আপনাকে ডাকব। কারণ আমি আমার জন্য লাকি।’ লাকি বলতেন, কারণ ‘লাল দরজা’ই অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছিল। পুরস্কার বড় কথা নয়, বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের মনোনয়নই বা কয়জন পায়! এছাড়া মুভিটি ভারত সরকারের সম্মানসূচক পদ্মভূষণ সম্মাননা পেয়েছে। এর প্রযোজক তো বিখ্যাত সংগীতকার বাপ্পী লাহিড়ি। এখনো তার মুম্বাইয়ের বাসায় সেই পুরস্কার রয়েছে। এই মুভিতে আমার স্বামীর চরিত্র করেছিলেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। তিনিও আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আরও ছিলেন আমাদের দেশের বিখ্যাত অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ। তার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত