ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটে যা কখনই কাম্য নয়, কাল শুক্রবার মিরপুরে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে সেই কা- করলেন সাকিব আল হাসান। আম্পায়ার ইমরান পারভেজের একটি সিদ্ধান্ত মনঃপূত না হওয়ায় লাথি মেরে ফেলে দিলেন স্টাম্প। তর্কও করলেন কিছুক্ষণ। পরে আবাহনীর ইনিংসের ৫.৫ ওভারে বৃষ্টির জন্য আম্পায়াররা পিচ ঢেকে দিতে বললে দ্বিতীয় দফা মেজাজ হারান সাকিব। এবার তেড়ে এসে ননস্ট্রাইক এন্ডের তিন স্টাম্প তুলে আছড়ে ফেলেন পিচে। এরপর মাঠ ছেড়ে যাওয়ার সময় আবাহনী কোচ খালেদ মাহমুদ সুজনের সঙ্গেও তর্কে জড়ান। ক্রিকেটের চিরায়ত নিয়ম যাই হোক, আম্পায়ারের সিদ্ধান্তই শেষ কথা। কিন্তু সাকিব তা মানলেন কই। নিয়ম ভুলে গিয়ে অপ্রত্যাশিত আচরণ দেখালেন বিতর্কিত কা- করে। অবশ্য খেলা বন্ধের সময়ই নিজের ফেইসবুক পোস্টে এমন আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। দিন শেষে তার মোহামেডান বৃষ্টি আইনে ৩১ রানে হারিয়েছেও আবাহনীকে।
সাকিবের মেজাজ হারানোর শুরু ৪.৫ ওভারে। সেই ওভারে আবাহনী অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের কাছে এক ছক্কা ও চারে ১০ রান দিয়ে ফেলেছেন। শেষ বলে সেই মুশফিককেই নিজের বলে পরাস্ত করেন। দেখা যায় বল সোজা মিডলস্টাম্প বরাবর মুশফিকের প্যাডে আঘাত করে। কিন্তু আউটের আবেদন করে সফল হননি সাকিব। আম্পায়ার ইমরান পারভেজ মাথা নাড়তেই বসা থেকে উঠে স্টাম্পে লাথি মারেন তিনি। পরে আম্পায়ারের সঙ্গে আউটের জন্য তর্কও করেন। ওই ওভার পর শুভাগত হোমকে বোলিংয়ে টানেন। ওই সময় শুরু হয় ঝিরঝির বৃষ্টি। ৫ বল যেতে তা আরাও বাড়ে। এমন সময় মাঠকর্মীদের পিচ ঢাকার জন্য কাভার আনতে বলেন আম্পায়াররা। কিন্তু মিডঅফে দাঁড়ানো সাকিব দূর থেকেই তর্ক করতে করতে আম্পায়ারের সামনে আসেন। স্টাম্প তিনটি ধরে সজোরে আছাড় মারেন। আরও কিছু বলেই আম্পায়ারের হাতে স্টাম্প ধরিয়ে দিচ্ছিলেন। এরপর মাঠ ছাড়তে ছাড়তে আবাহনী ড্রেসিংরুমের দিকে বাজে ভঙ্গি করে দেখান। এ সময় বেরিয়ে আসেন কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন। ওদিকে সাকিব ও এদিকে সুজন কিছু বলতে বলতে এগোচ্ছিলেন। কিন্তু দুই দলের বাকি খেলোয়াড়-স্টাফরা দুজনকেই থামান।
দ্বিতীয়বার সাকিবের নিজের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণ ১ বল। ওই ১ বল হলে বৃষ্টি আইনের জয়-পরাজয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ৬ ওভার হয়ে যেত। এরপর খেলা না হলে বৃষ্টি আইনে জিতত মোহামেডান। কারণ ৫.৫ ওভারে ৩১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল আবাহনী। তখন জয়ের জন্য বৃষ্টি আইনে তাদের দরকার ছিল ৪৭ রান। কিন্তু ৬ ওভার খেলা না হলে এবং ম্যাচ প- হলে দুই দল ১ পয়েন্ট করে পেত। সাকিব তাই মেজাজ হারালেন। অবশ্য বৃষ্টি থামার পর ম্যাচ প- হওয়ার অবস্থা তৈরি হয়নি। উল্টো আবাহনীর সামনে এমন টার্গেট এলো যে ম্যাচ জেতা তখন দলটির জন্য অসম্ভব। ৯ ওভারে ৭৬ রান করতে হতো মুশফিকদের। যেখানে ইনিংসের প্রথম ওভারে ২ উইকেট হারানোর পর ৫.৫ ওভারেই ৩১ রানে ৩ উইকেটে ধুঁকছিল আবাহনী। শেষ পর্যন্ত আরও ৩ উইকেট হারিয়ে ৪৪ রান করতে পেরেছে তারা। এর আগে মোহামেডান সাকিব আল হাসানের ২৬ বলে ৩৭ রানের সুবাদে কোনো রকমে এগোচ্ছিল। শেষদিকে মাহমুদুল হাসান ২২ বলে অপরাজিত ৩০ ও আবু হায়দার রনি ৭ বলে ১২ করে দলকে দেড়শোর কাছে (৬ উইকেটে ১৪৫) পৌঁছে দেন।
এ নিয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে চতুর্থবারের চেষ্টায় আবাহনীকে হারাল মোহামেডান। এই জয়ে ৭ ম্যাচে ৮ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার চারে উঠেছে দলটি। আবাহনী ৭ ম্যাচে দুই হারে ১০ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয়।
সাকিব ক্রিকেটীয় সৌন্দর্য নষ্ট করেছেন, নিয়ম ভেঙেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার কা-ে আবাহনী-মোহামেডানের হারিয়ে যাওয়া উত্তাপ যেন ফিরল কাল। ফুটবল মাঠে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর সোনালি সময়ের ঝাঁঝালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবার দেখা গেল। সেই তর্ক-বিতর্ক, তেড়েফুঁড়ে একে অন্যের দিকে যাওয়া, ক্ষণিকের জন্য সব ফেরালেন মাঠের কুশীলবরা। এমন দিনে দর্শক থাকলে উত্তেজনা জমত বেশ। তবুও খেলোয়াড়দের মেজাজ হারিয়ে বিতর্কিত কাজ করা কখনই কাম্য নয়।
ক্ষমা চাইলেন সাকিব
নিকট অতীতে নিয়মিত বিতর্কের খবর তৈরি করা সাকিব কাল আবারও সেই অবস্থানে। দু’দিন আগেই ডিপিএলের বায়ো বাবল ভাঙার অভিযোগ মেনে নিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। কাল আবারও ক্ষমা চাইলেন মাঠে বিতর্কিত কা- করে। আবাহনীর বিপক্ষে বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ থাকার সময়ই মোহামেডান অধিনায়ক ফেইসবুকে ক্ষমা চেয়ে লিখেছেন, ‘প্রিয় ভক্ত ও অনুসারীরা, নিজের মেজাজ হারানোর জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। সেই সঙ্গে ম্যাচের আবহ নষ্ট করার জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। বিশেষ করে যারা বাড়িতে বসে খেলা দেখছেন। আমার মতো একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের কাছে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু মাঝে মাঝে দুর্ভাগ্যবশত এ রকম হয়ে যায়। এই মানবিক ভুলের কারণে আমি দল, ম্যানেজমেন্ট ও টুর্নামেন্ট কমিটির কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আশা করছি ভবিষ্যতে আর এমনটা হবে না। ধন্যবাদ, সবার জন্য ভালোবাসা।’
ম্যাচ রেফারির রিপোর্টের অপেক্ষায় সিসিডিএম
এদিকে ওই আচরণের জন্য সাকিব আল হাসানের কী শাস্তি হবে তা নির্ভর করছে ম্যাচ রেফারির রিপোর্টের ওপর। গতকালই বিসিবিকে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা রেফারি মোরশেদুল আলমের। তার রিপোর্টের অপেক্ষাতেই আছে টুর্নামেন্ট কমিটি (সিসিডিএম)। সিসিডিএম চেয়ারম্যান কাজী ইনাম জানান ‘দেখেন, খেলার মাঠে অনেক কিছুই হয়। আজকে অনেক ঘটনা ঘটেছে। লাইভ সম্প্রচারের ফলে আপনারা সবাই তা দেখেছেন। এটা অপ্রত্যাশিত, ক্রিকেটারদের অবশ্যই আবেগ ধরে রাখা উচিত। এখন যেকোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচের মতো আমরা ম্যাচ রেফারির রিপোর্ট দেখব। নিয়ম কিন্তু আছে। নিয়ম ভাঙলে রিপোর্ট অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।’
তবে তৎক্ষণাৎ ক্ষমা চেয়ে নেওয়ায় বড় শাস্তি থেকে বেঁচে যেতে পারেন সাকিব। আবার বৃষ্টির সময় আবাহনীর ড্রেসিংরুমে গিয়ে খালেদ মাহমুদ সুজনের কাছেও নিজের ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন মোহামেডান অধিনায়ক।
