বর্ষা মৌসুম এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির পরিমাণ হালকা থেকে মাঝারি হলেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বজ্রপাত। দেশের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। চলতি মাসের প্রথম ৬ দিনেই মারা গেছেন ৭২ জন। গত আড়াই মাসে দেশে বজ্রপাতে ১৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আমাদের দেশে করোনা, সড়ক দুর্ঘটনার মতো বজ্রপাতে মৃত্যু বর্তমানে মহামারীর রূপ ধারণ করেছে। বিশেষত বজ্রপাত থেকে মাথা রক্ষা করাটাই সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বজ্রপাতের শিকার মানুষদের বড় অংশই কৃষক, যারা সবার মুখে অন্ন তুলে দিতে মাঠে যান। সেখানেই মরে পড়ে থাকেন। বজ্রপাতে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের করুণ মৃত্যুর পরও বিষয়টি খুব একটা দৃষ্টি কাড়তে পারছে না ঊর্ধ্বতন মহলের। দেশে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর খবর যেভাবে গণমাধ্যম বা সাধারণ মানুষের আলোচনার বিষয় হয়েছে, সে রকম গুরুত্ব পাচ্ছে না বজ্রপাতে মৃত্যু। অথচ বজ্রপাতপ্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু সেই হিসেবে প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও সচেতনতা নেই।
বজ্রপাত প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি। এটি মানুষের পরিচিত সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর একটিও বটে। সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় সমান মাত্রার স্ফুলিঙ্গ আর ভয়াবহ গর্জন বহুকাল ধরেই মানুষের পিলে চমকানোর কাজটি দায়িত্বের সঙ্গে পালন করে আসছে। ফিনল্যান্ডের বজ্রপাতবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ভাইসালার হিসেবে, বাংলাদেশে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৪০ লাখ বা তার বেশিসংখ্যক বজ্রপাত মেঘ থেকে ভূমিতে নেমে আসে। ২০১৯ সালে তা প্রায় ১০ লাখ কমে যায়। সর্বশেষ গত বছর সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখের কিছু কম। বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয় গত বছর। বিবিসির এক প্রতিবেদন মতে ২০২০ সালে ৩৮০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশে বজ্রপাতের ক্ষেত্রে একটি অস্বাভাবিক বছর ছিল ২০১৬ সাল। ওই বছর বজ্রপাতে মারা যায় প্রায় ৩৫০ জন মানুষ। এরপর বজ্রপাতে ২০১৭ সালে ৩০২ জন, ২০১৮ সালে ২৭৭ জন, ২০১৯ সালে ২৩০ জন মানুষ মারা যায়। দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর ৭০ শতাংশ ঘটনা ঘটে কৃষিকাজ করার সময়। এ ছাড়া বাড়ি ফেরার পথে সাড়ে ১৪ শতাংশ এবং গোসল করা ও মাছ ধরার সময় ১৩ শতাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
উন্নত দেশগুলোতে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমলেও বাংলাদেশে এ সংখ্যা বাড়ছে। বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী সেটি নিয়ে বাংলাদেশে বিস্তারিত কোনো গবেষণা নেই। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় এর নানা কারণ উঠে এসেছে। কোনো কোনো গবেষক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে এবং তাপমাত্রা বাড়ছে বলে দেশে বজ্রপাত বাড়ছে। তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়লে বজ্রপাতের আশঙ্কা ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। আবহাওয়াবিদরা বজ্রপাতের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দূষণকে চিহ্নিত করছেন। গাছ কেটে বহুতল ভবন নির্মাণ, গাড়ির ধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, যেখানে-সেখানে বছরভর নির্মাণকাজ চলতে থাকায় অত্যধিকমাত্রায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। সেই তুলনায় গাছ লাগানো হচ্ছে না। মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কারণে বাতাসে গরম ধূলিকণা বাড়ছে, যা বজ্রপাতের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। এদিকে বাতাসের ওপরের পরিমণ্ডলে বর্ষার আগে ও পরে মে-জুন মাস নাগাদ প্রচুর জলীয় বাষ্প থেকে যাচ্ছে। যখনই উষ্ণ বায়ু ওপর দিকে ওঠার চেষ্টা করছে, তখনই অন্যান্য বায়ু ও জলীয়কণার সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে। ফলে একেকটা জলীয়কণা ব্যাটারির মতো কাজ করছে। বাজ পড়ছে। শহরাঞ্চলে ঘরবাড়ি বেশি হলেও সেখানে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা থাকায় বজ্রাঘাতে হতাহতের ঘটনা কম। কিন্তু গ্রামে এই নিরোধক হিসেবে কাজ করত যে বড় বড় গাছ, তার সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে গ্রামাঞ্চলে বজ্রাঘাতে প্রাণহানি বেশি ঘটতে দেখা যায়। গ্রামীণ এলাকায় বজ্রপাতে মৃত্যু বেশি হচ্ছে। ফাঁকা মাঠে চাষের কাজ করতে গিয়ে মৃত্যু হচ্ছে অনেকের। এর অন্যতম কারণ কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার করা উন্নত যন্ত্রপাতি। বর্তমানে চাষের কাজে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেশি হয়। আর এসব যন্ত্রে বিদ্যুৎ আকর্ষিত হয়। সেই সঙ্গে ফাঁকা মাঠে কোনো উঁচু জায়গা না থাকায় মানুষের ওপর বজ্রপাতের ঘটনা অনেক বেশি হচ্ছে।
কংক্রিটের নিচে ঠাঁই নেওয়া এবং যেকোনো ইলেকট্রনিক বস্তু থেকে দূরে থাকাই আপাতত বজ্রপাত থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে সচেতনতা দরকার। আশপাশে যদি কোনো উঁচু গাছ থাকে সেখান থেকে দূরে থাকা। টিনের ছাদ এড়িয়ে চলা। ওপরে ছাদ আছে এমন জায়গায় চলে আসা। বজ্রপাতের সময় বিদ্যুতের খুঁটি ও টাওয়ার থেকে দূরে থাকতে হবে। তা ছাড়া জলাশয় ও পুকুর থেকে দূরে থাকাও দরকার। বন্যা এবং সাইক্লোনের মতো দুর্যোগের ক্ষেত্রে কিছু প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বজ্রপাতের বিষয়টি ভূমিকম্পের মতোই আকস্মিক। উল্লেখ্য, মেঘের নিচের অংশে সাধারণত ঋণাত্মক আয়ন আর ওপরের অংশে থাকে ধনাত্মক আয়ন। আর ভূপৃষ্ঠের থাকে ধনাত্মক আয়ন। এই ধনাত্মক আয়নের আকর্ষণই মূলত ভূপৃষ্ঠে বজ্রপাতের কারণ। এই বজ্রপাতের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া আসলেই কঠিন।
সাধারণত কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকে বজ্রপাত ও বৃষ্টি হয়। সেই কারণে এই মেঘকে বজ্রগর্ভ মেঘও বলা হয়ে থাকে। কয়েক বছর ধরে এপ্রিল-মে মাসে বাংলাদেশে এই বজ্রগর্ভ মেঘের পরিমাণ বেড়েছে। তার একটা অন্যতম কারণ যেমন বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য, তেমনই আর একটি কারণ তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া। আর এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত দূষণ। দূষণের মাত্রা যত বাড়ছে, গড় তাপমাত্রা তত বাড়ছে। ফলে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হওয়ার আদর্শ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। পরিবেশে দূষণ বেড়ে যাওয়ায় তাপমাত্রা আগের থেকে অনেক বেশি থাকছে। ফলে বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়ছে। এই বজ্রপাত সাধারণত অল্প জায়গার মধ্যে ‘ক্লাউড টু গ্রাউন্ড’ অর্থাৎ মেঘ থেকে মাটির দিকে হচ্ছে।
বজ্র বা বজ্রপাত কিন্তু নতুন কিছু নয়। এটা যখন-তখন আমাদের ওপর পড়ছে এবং মৃত্যুর কারণ ঘটাচ্ছেএটাই নতুন। বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে দেশ অনেক এগোলেও আমরা এখনো বজ্রপাতের বিরুদ্ধে আধুনিক কোনো সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারিনি। প্রতি বছর গড়ে দু-তিনশ মানুষের মৃত্যু ঘটলেও বাংলাদেশে বজ্রপাত সুরক্ষাব্যবস্থা মূলত তালগাছনির্ভর। অথচ উন্নত বিশ্বে বজ্রপাত থেকে রেহাই পেতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ করছে। এসব দেশে ‘লাইটনিং রড’ বহুল প্রচলিত একটি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে বজ্রপাতের ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
কোথায়, কখন বজ্রপাত হবেএমন পূর্বাভাস জানিয়ে দিতে উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন অ্যাপস চালু হয়েছে। বজ্রপাতের আধা ঘণ্টা আগে বজ্রপাতের স্থান, সময় জানিয়ে দেওয়ার পূর্বাভাসও অনেক দেশে কার্যকর হয়েছে। একটি মার্কিন সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে একটি যন্ত্র বসানো হয়েছে। বজ্র নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও সেই যন্ত্র ৪৫ মিনিট আগেই বাজ পড়ার খবর দেয়। সেই অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষকে সতর্ক করা যায়। সে দেশেরই অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার আধুনিক সেন্সর বসিয়ে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা কমিয়ে এনেছে। তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেটটপ বক্সের মাধ্যমে এসএমএস করে টেলিভিশনে সম্ভাব্য বজ্রপাতের খবর পাঠিয়ে থাকে।
কিন্তু আমাদের দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনাটি সামনে এলেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে তালগাছ লাগানোর কথা হয়। যদিও গত কয়েক বছরে কয়টি তালগাছ লাগানো হয়েছে, তার কয়টি জীবিত রয়েছে, সে তথ্য কেউ দিতে পারেন না। আমাদের দেশে এখনো তালগাছ লাগানোর মধ্য দিয়েই বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা ঠেকানোর প্রয়াস চালানো হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে আগাম পূর্বাভাসসহ আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ বাদ দিয়ে তালগাছ প্রযুক্তি আর কত দিন চলবে?
লেখক লেখক ও কলামনিস্ট
