নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চাই সুষ্ঠু পরিকল্পনা

আপডেট : ১৪ জুন ২০২১, ১০:৩৫ পিএম

আইকেইএ (IKEA) হলো একটি সুইডিশ কোম্পানি, যা সুইডেনের এলমহল্টে ১৯৫৮ সালে তাদের প্রথম যাত্রা শুরু করে। এই বহুজাতিক সংস্থা মানুষের জীবনযাপনের জন্য প্রায় সব প্রয়োজনীয় পণ্যই গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়। এই সেবা প্রদানের জন্য বিভিন্ন দেশে রয়েছে এদের অনেক শোরুম ও অফিস। আইকেইএ (IKEA) পণ্য সরবরাহের জন্য নানা ধরনের সাপ্লাইয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে এই ফ্যাক্টরির জন্য প্রতিদিন প্রতি ঘণ্টায় প্রয়োজন পড়ে প্রচুর এনার্জির বা জ্বালানির।

এই প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই তাদের ব্যবহার্য শক্তির শতকরা ৫১ ভাগ এই নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সংগ্রহ করছে। আগামী ২০২৫ সালের ভেতরে শতকরা ১০০ ভাগে উন্নীত করা এখন তাদের লক্ষ্য। শুধু তা-ই নয়, তারা সারা বিশ্বে তাদের সাপ্লাইয়ারদেরও এই জ্বালানি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে বদ্ধপরিকর। দুটি উপায়ে তারা এ কাজ করতে চায়। প্রথমত, ১০০ মিলিয়ন ইউরো তাদের সাপ্লাইয়ারদের দিতে চায় সোলার প্যানেলজাতীয় সৌরশক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য। যাতে করে তাদের চাহিদার শতকরা ১৫ ভাগ চাহিদা মেটানো সম্ভব বাকি ৮৫ ভাগ সাধ্যমতো চুক্তি মোতাবেক (Affordable Frame Agreement) সাপ্লাইয়ারদের দিয়ে করাতে চায়। ফলে তাদের সব সাপ্লাইয়ারকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের আওতায় আনতে তারা চেষ্টা ও পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ ওকঊঅ জলবায়ু পরিবর্তনের সীমারেখা ১.৫ ডিগ্রিতে আনতে চায়। শুধু এই প্রতিষ্ঠান না, বিশ্বের অনেক দেশ, অনেক প্রতিষ্ঠান এই খাতে আলাদা করে বাজেটে বরাদ্দ রাখছে।

‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি’ অর্থ বায়োমাস (Biomass) অর্থাৎ জ্বালানি কাঠ, ধানের তুষ, আখের ছোবড়া, বর্জ্য ইত্যাদি এবং বায়ো-ফুয়েল, বায়োগ্যাস, হাইড্রো পাওয়ার, সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, হাইড্রোজেন সেল, জিওথারমাল, জোয়ারভাটা ও ঢেউ থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি ও শক্তিকে বোঝায়। তবে সরকার কর্র্তৃক সময়-সময়, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে ঘোষিত অন্য কোনো উৎস থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি ও শক্তিকেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি বলা যাবে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক অন্যতম চালিকাশক্তি জ্বালানি। দেশে বিদ্যমান জ্বালানির চাহিদার ৭৩% ভাগ মেটাচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস। প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে ফুরিয়ে যাচ্ছে মজুদ গ্যাসের পরিমাণ। নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হওয়ার কারণে ঝুঁকি বেড়েই যাচ্ছে। ফলে বিকল্প জ্বালানির দিকে আমাদের নজর দিতে হচ্ছে। যেমন বিদ্যুতের বিকল্প হয়েছে কয়লা। জামালগঞ্জ, বড়পুকুরিয়া, দিঘিপাড়া, ফুলবাড়ী ও খালাশপুর আমাদের নতুন কয়লার খনি।

কিন্তু দেশের এই খনিজ সম্পদের পরিমাণ সীমিত থাকার কারণে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের উচিত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দৃষ্টি দেওয়া। সূর্যের আলো, পানি, বায়ু, ভূগর্ভস্থ শক্তি ইত্যাদিকে আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি বলতে বুঝে থাকি। মূলত প্রকৃতিগতভাবেই যে শক্তি তৈরি হয় এবং যা কখনো শেষ হয় না সেটাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি। পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষার্থে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্বে জ্বালানির চাহিদা ক্রমবর্ধমান। গড়ে প্রতি বছর ২.৩ ভাগ হারে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে, এর মধ্যে ৮৬.৪ ভাগ আসে জীবাশ্ম থেকে আর বাকি ১৩.৬ ভাগ আসে অ-নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। জীবাশ্ম জ্বালানির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর দুষ্প্রাপ্যতা। প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, খনিজ তেল ইত্যাদি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, কিন্তু এ ধরনের জ্বালানি তৈরি হতে সময় নেয় কয়েক কোটি বছর। জীবাশ্ম জ্বালানি ফুরিয়ে গেলেও শেষ হবে না এর প্রয়োজন, থেমে থাকবে না সভ্যতার চাকা।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশে ক্রমেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কার্যত, বাংলাদেশে জ্বালানির মূল উৎস প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল ও কয়লা। পেট্রোবাংলার শেষ জরিপে জানা গেছে, দেশে গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ২০.৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট, যার মধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে ১২.৪১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। অন্যদিকে কয়লার মজুদ রয়েছে ৩ হাজার ৩০০ মিলিয়ন টন। জ্বালানি তেলের জন্য বাংলাদেশ পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ভবিষ্যতে জ্বালানির চাহিদা পূরণের জন্য নবায়নযোগ্য উৎসের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে সৌরশক্তি থেকে উৎপন্ন বিদ্যুতের। এ ছাড়া রয়েছে পানিবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, ধানের তুষ, ইক্ষুর ছোবড়া, বর্জ্য, শিল্প প্রক্রিয়ার অব্যবহৃত তাপ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইত্যাদি। সৌরশক্তি বা সোলার পাওয়ার অর্থাৎ সূর্যরশ্মির আলো ও তাপকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এর ফটোইলেকট্রিক ইফেক্টকে কাজে লাগিয়ে ফটোভোল্টাইক কোষের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয় গত শতাব্দীতে। ১৯৮০ সালের দিকে উদ্ভাবিত এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে, সূর্যের তাপকে কনসেনট্রেটেড সোলার পাওয়ারে রূপান্তরিত করে পানিকে বাষ্প ও বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌশল এখন অনেক দেশে অনেক জনপ্রিয়। বর্তমানে সোলার প্যানেল দ্বারা গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৮০,০০০ সোলার হোম সিস্টেম বিক্রি হচ্ছে। সারা দেশে প্রায় ৩০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম বিভিন্ন এনজিওর সাহায্যে ইনস্টল করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর ঘোষণা দেন। প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের জন্য এবার ২৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। গেল অর্থবছরের (২০২০-২১) মূল বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ২৬ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা, যা পরে সংশোধনে ২৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকায় নেমে আসে। সে হিসেবে সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এবার বরাদ্দ বাড়ছে ১৫.৫ শতাংশের মতো। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় জানান, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ১৪ হাজার ১১৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে নির্মাণাধীন। ২ হাজার ৯৬১ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। পাশাপাশি ৬২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন; পরিকল্পনায় রয়েছে ১৫ হাজার ১৯ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। সরকারের ‘দূরদর্শী ও সময়োপযোগী’ পদক্ষেপের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গত ১২ বছরে ‘অভূতপূর্ব সাফল্য’ অর্জিত হয়েছে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালের তুলনায় বর্তমানে ৫ গুণ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। তিনি জানান, মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা (ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ) এখন ২৫ হাজার ২২৭ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে, যা দিয়ে দেশের মোট জনসংখ্যার ৯৯ শতাংশকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে এখন ৭২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

গত ৩ জুন ২০২১ ঘোষণা করা হলো, আসছে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট। এই বাজেটের পক্ষে ও বিপক্ষে কিছু মতামত থাকবে। এটাই হয়ে আসছে বিগত ৫০ বছর ধরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গতানুগতিক বাজেট থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। নতুন নতুন খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। যে খাতগুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক সেসব খাতে নজর দিতে হবে।

আমাদের দেশে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি হ্রাস এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে জ্বালানি সাশ্রয়, সংরক্ষণ ও দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানির অপচয় রোধকল্পে ২০১২ সালে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ গঠিত হয়। ২০১৪ সালের ২২ মে কার্যক্রম শুরু করা হয়। শুধু বাজেটে বরাদ্দ না বাড়িয়ে আমাদের দরকার পরিকল্পনার সঙ্গে মিল রেখে বাজেটের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে আগামীর পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলা। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষকে আরও গতিশীল করা, তথা দেশের কল্যাণে তাদের নিয়োজিত করা।

লেখক ব্যাংকার ও গবেষক
[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত