স্বাধীনতার পাঁচ দশকে বাংলাদেশের সমাজে যেসব অগ্রগতি খোলা চোখেই দেখা যায় তার অন্যতম শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে নারীর উন্নতি। উচ্চশিক্ষায় নারীর সাফল্য এবং উচ্চতর পেশাজীবী হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর সাফল্যও এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখন দেশের ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখই নারী। তবে, এত সাফল্য সত্ত্বেও নারীর এগিয়ে চলার পথ যে মসৃণ নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা নীতি-কৌশল আর নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে বারবারই তা দৃষ্টিকটুভাবে সামনে আসে। অথচ যে দেশে অনেক প্রতিকূলতা, অনিরাপত্তা, যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মারাত্মক সহিংসতার মধ্যেও নারীরা ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক কোনো নীতি-বিধি গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বারবার সে-রকমই ঘটছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী কর্মকর্তা না রেখে বিকল্প ব্যবস্থা করার জন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ সম্ভবত এরকম সর্বশেষ দৃষ্টান্ত। নারীদের জানাজায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে ধর্মীয় বিধিনিষেধের কথা উল্লেখ করে কমিটি এমন সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া রাতের পরিবর্তে দিনে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে শতাধিক উপজেলা ও থানায় প্রধান নির্বাহী পদে নারী কর্মকর্তা কাজ করছেন। এসব উপজেলা বা থানায় কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধা মারা গেলে নিয়মমাফিক সেখানকার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। তবে, এসময় জানাজায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন নারী কর্মকর্তারা। আর এই স্বাভাবিক বিষয়টিকেই অস্বাভাবিক হিসেবে উল্লেখ করে এই উদ্ভট সুপারিশ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একজন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব যথার্থই বলেছেন যে নারী ইউএনওদের গার্ড অব অনারে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়, কারণ গার্ড অব অনার এবং জানাজা দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। উপরন্তু উল্লেখ করা যায় যে, ধর্মীয় বিধান অনুসারেও জানাজা ‘ফরজ’ বা অবশ্য পালনীয় কোনো বিষয় নয়। জানাজা হলো ‘ফরজে কেফায়া’। অর্থাৎ এই বিধান সমাজের কেউই আদায় না করলে সবাই গুনাহগার হয়, কিন্তু একজনও যদি তা আদায় করেন তবে সবাই দায়িত্বমুক্ত হয়। খেয়াল করা দরকার, যে ব্যক্তির জানাজা আদায় করা হচ্ছে তার পরিবারের নারী সদস্যরাও জানাজায় অংশ নেন না, কেননা জানাজা আদায়ের বিধান নারীর জন্য প্রযোজ্যই নয়। তাহলে সেখানে কর্তব্যরত নারী ইউএনও জানাজা না পড়তে পারায় সেটা ‘দৃষ্টিকটু’ বা ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ হবে কেন?
শিক্ষা-সংস্কৃতিতে পশ্চাৎপদ সমাজে নারীর অগ্রযাত্রা ও ক্ষমতায়নে বাধাদানের অপচেষ্টা এক দুরারোগ্য ব্যাধি বটে। কিন্তু এই ব্যাধি যখন জাতীয় সংসদ কিংবা জনপ্রশাসনের ঘাড়ে চেপে বসে সেটা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া প্রয়োজন। কিছুদিন আগেই জনপ্রশাসনের পদায়ন নীতিমালার খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছিল যে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নারী হলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড পুরুষ হতে হবে এবং এসিল্যান্ড পদে নারী কর্মকর্তা পদায়নের ক্ষেত্রে যে উপজেলায় পুরুষ ইউএনও রয়েছে সেই উপজেলাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এই সুপারিশ করা হয়েছিল দুর্গম উপজেলায় পদায়নের ক্ষেত্রে। কিন্তু খেয়াল করা দরকার যে, দুর্গম উপজেলা ‘দুর্গম্যতার’ বিবেচনাতেই বিশেষ। সেজন্য সারা দেশে সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। আরেক ঘটনায় কিছুদিন আগে সব পরীক্ষায় পাস করার পরও একজন নারীর কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়া আটকে যায় উচ্চ আদালতের রায়ে। আদালত নারীর কাজী হওয়ার আবেদনটি খারিজ করার রায়ে যে দুটি যুক্তি উপস্থাপন করেছিল তার একটি ছিল রাত-বিরেতে বা বর্ষাকালে দুর্গম স্থানে পৌঁছাতে পারা না পারার কথা; অন্যটি ছিল মাসিককালে বিয়ে পড়াতে নারীর ‘মসজিদে’ প্রবেশ করতে না পারা। অথচ সবাই জানেন যে, নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব বিয়ে পড়ানো নয়, বিয়ে নিবন্ধন করা এবং সেটা তদারকি করা। তাই নারীর কাজী হতে না পারার কোনো যুক্তিই ধোপে টেকে না।
এভাবে বারবার নানা খোঁড়া যুক্তি হাজির করে জনপরিসর ও জনপ্রশাসন থেকে নারীদের পিছু হটানোর নানা উদ্ভট আবদার করা হচ্ছে। মনে রাখা দরকার মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯ (১) অনুচ্ছেদে ‘সরকারি নিয়োগ লাভে সমতা’ শিরোনামে (২) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে : কেবল ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, নারী পুরুষভেদে ... কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হবে না, কিংবা সেক্ষেত্রে তার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না। সরকার যেখানে সবক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য কমিয়ে আনায় কাজ করছে, সেখানে রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে নারী-পুরুষ বৈষম্য করা হলে তার সামাজিক অভিঘাত হবে অনেক বেশি। তাই নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি যাতে কোনোভাবেই নারীর অগ্রগতিতে বাধা হয়ে নারীকে পিছু না হটায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
