ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। দেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ, করোনাকালীন শিক্ষাব্যবস্থা, ২০২১-২২ প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়াবলি নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এই শিক্ষাবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের এহসান মাহমুদ
দেশ রূপান্তর : সারা বিশ্ব করোনা মহামারীর ভয়াবহতা দেখল। এখনো এই অবস্থা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থায় করোনার প্রভাব কেমন বলে মনে করেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : করোনা এখনো আমাদের ভয় দেখিয়ে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, জুন মাস জুড়েই করোনা আরও ভীতি জাগাবে। করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট এখন ছড়িয়ে পড়ছে। জুলাই মাসে যদি এই অবস্থার উন্নতি হয়, তবে আমরা সামনে এগোতে পারব। করোনার এই প্রভাবটি দেশের অর্থনীতিতে একভাবে পড়েছে, সমাজে আরেকভাবে পড়েছে আবার শিক্ষায় আরেকভাবে পড়েছে। এইসব মিলে আমাদের একটি দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেটি হলো বিপর্যয়। চলমান মহামারী আমাদের বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিপর্যয়টি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, এটি আমার সবচেয়ে কষ্টের জায়গা। উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু সব স্তরের শিক্ষায় একটি অচলবস্থা নেমে এসেছে। শিক্ষাজীবন শেষ করলেই যে দেশে কাজের নিশ্চয়তা মেলে না, সেখানে এভাবে স্থবিরতা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যায়ে এসে অনেক শিক্ষার্থী আটকে রয়েছে, দীর্ঘদিন পরীক্ষা হচ্ছে না। এটা সামগ্রিকভাবে আমাদের দেশের ওপরই প্রভাব পড়বে। আর পুরো বিশ^ই তো করোনায় থমকে গিয়েছে, এটাও মানতে হবে।
দেশ রূপান্তর : এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে আমাদের করণীয় কী?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমি শুরু থেকেই কয়েকটি বিষয়ের কথা বারবার বলে এসেছিলাম। প্রথমত, এটি নিয়ে একটি পরিকল্পনা বা রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। একটি রাস্তা যেমন নষ্ট হয়ে গেলে কিছু টাকা বরাদ্দ দিয়ে মেরামত করা হয়, বিষয়টি তেমন নয়। শিক্ষার বিষয়টি পদ্মা সেতুর থেকেও বড় প্রকল্প। কাজেই প্রত্যেকটি ধাপ ধরে ধরে এগোতে হবে। আমি দুঃখিত যে, এ ধরনের কোনো উদ্যোগ আমার চোখে পড়ছে না। দ্বিতীয়ত, পরিকল্পনা অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। এটিও আমি দেখতে পাচ্ছি না। আমার হিসাবে, আমাদের এবারের বাজেটের অন্তত আরও পাঁচ শতাংশ শিক্ষায় দিতে হতো। কিন্তু শতাংশ অনুযায়ী এক ভাগও বেশি দেওয়া হয়নি। এটি আমার একটি দুঃখের বিষয় যে, শিক্ষার মতো জায়গায় বিনিয়োগের কোনো ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। আমি যদি দেখতাম, সরকার ৫৬০টি মডেল মসজিদের পাশাপাশি অন্তত ৫০০টি মডেল স্কুলও দিচ্ছে, তাহলেও বুঝতে পারতাম সরকার শিক্ষাকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আমাদের দরকার ছিল শিক্ষার কোন কোন খাতে ক্ষতি হয়েছে, সেটি জরিপের মাধ্যমে খুঁজে বের করা। যেভাবে অনলাইনের মাধ্যমে টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তথ্য সংগ্রহ করে এই কাজটিও সহজে করা যেত। গ্রামপর্যায়ে শিক্ষকদের জড়িত করে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর যাচাই করে, তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জড়িত করে একটি ডাটাবেজ তৈরি করা যেত। যার মাধ্যমে কোন কোন পরিবারে ঝরেপড়া শিশু রয়েছে, বাল্যবিয়ের শিকার শিশু-কিশোরীরা রয়েছে তাদের একটি তালিকা করে প্রণোদনার আওতায় আনা যায়। এই কাজে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের রাখা যাবে না। তাতে দেখা যাবে রাজনীতিবিদরা তাদের পরিবারের সদস্য, শ^শুরবাড়ির লোকজন, মামা, খালা, চাচাদের নাম ঢুকিয়ে দেবে। এই তালিকা করে পিছিয়ে পড়া পরিবারকে মাসে একটি শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেত। তাহলে তারা শিক্ষায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে না। তৃতীয়ত, দেশে এখন ডিজিটাল বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। এটি যদি শিক্ষা ক্ষেত্রেও হয়, তবে সেটি খুব ভয়ংকর হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য না হয় একটা সময়ে কাটিয়ে ওঠা যাবে। কিন্তু শিক্ষার বৈষম্য সৃষ্টি হলে তা প্রজন্মের পরে প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
দেশ রূপান্তর : এবার ২০২১-২২ বাজেট নিয়ে বলতে চাই। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ যথেষ্ট কি না?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমাদের এই বাজেটে শিক্ষা নিয়ে পরিকল্পনাই দেখা যায় না। এমনকি স্বাস্থ্যেও যে খুব পরিকল্পনা রয়েছে, তা বলা যায় না। এরপরে আবার পনেরো শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সরকারের কী করে যেন ধারণা জন্মেছে, প্রাইভেট বিশ^বিদ্যালয়গুলো দিয়েছে সব বড়লোকেরা। এখানে পড়তে যায় সব বিত্তশালী পরিবারের সন্তানেরা। এটি খুবই ভুল ধারণা। অনেক মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত পারিবারের সন্তানরাও প্রাইভেট বিশ^বিদ্যালয়ে পড়তে যায়। পাবলিক বা সরকারি কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়গুলো তো জায়গা দিতে পারছে না। তারা যাবে কোথায়। জমি বিক্রি করেও সন্তানকে বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন অনেক অভিভাবক। পড়ালেখার প্রতি আমাদের দেশের লোকজনের টান রয়েছে। এই ভ্যাট নেওয়ায় এখন চাপটা পড়বে শিক্ষার্থীদের বেতন ফি এসব খাতে। আবার শিক্ষকদের ওপরও চাপ পড়বে। এখন বিশ^বিদ্যালয়গুলো শিক্ষক নিয়োগ দেবে কম। ফলে একজন শিক্ষককেই অনেকগুলা কোর্স পড়াতে হবে। এতে করে শিক্ষার মানটা ধরে রাখা যাবে না। শিক্ষা নিয়ে কোনো চিন্তার প্রতিফলনই দেখা গেল না বাজেটে। কেবল ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের জন্য বাজেটটি প্রস্তাব করা হলো। এই বাজেট আমাকে ব্যক্তিগতভাবে হতাশ করেছে। শিক্ষা নিয়ে একটি দূরবর্তী পরিকল্পনা করতে পারতাম আমরা। তারপরে বাজেটে বরাদ্দ দিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে এগোনো যেত। এরপরে দরকার ডিজিটাল বৈষম্য কমানো। কিন্তু কোনোটির বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। সামনে আমাদের বিশ^বিদ্যালয়গুলো খুলে দিতে পারব হয়তো। কিন্তু তার আগে শিক্ষার্থীদের টিকা সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু টিকা আমদানি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বেহাল দশা আমাদের দেখতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতায় টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বেশি উদ্যোগী দেখা যাচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতার খেসারত পুরো দেশকে দিতে হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেভাবে দৌড়ঝাঁপ করছে সেভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি শুরু থেকে করত, তবে টিকা নিয়ে দেশে এত অনিশ্চয়তা দেখা দিত না। আমাদের দেশের অন্তত দশ থেকে বারো কোটি নাগরিককে টিকা দিতে হবে। কিন্তু শুরু থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টিকার জন্য কেবল ভারত নির্ভরতা ভয়াবহভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে আরও আগে যোগাযোগ করা গেলে এই অবস্থা দেখতে হতো না। তবে শিক্ষামন্ত্রীকে বেশ উদ্যমী মানুষ মনে হয়। তিনি চেষ্টা করছেন। কিন্তু তার সাধ্য বাজেটে গিয়ে আটকা পড়ছে। আমি মনে করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যদি প্রয়োজনীয় বাজেট পাওয়া যেত, তবে ফলাফলটা পাওয়া যেত।
দেশ রূপান্তর : করোনার সময়ে আমরা দেখলাম অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম চালু হলো। এই কার্যক্রম নিয়ে নানামুখী সমালোচনা আছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : এই যে এখন অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম চলছে, এখানে সত্তর শতাংশ শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন বা পরিবারে টেলিভিশন নেই। তারা কীভাবে শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হবে! অথচ আমরা অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার কথাও বলছি। শিক্ষার সব পাঠদান অনলাইনে চালিয়ে নেওয়া সুফল আনবে না। অনলাইনে আমরা হয়তো বাংলা, ইতিহাস, ধর্মশিক্ষার মতো তুলনামূলক সহজ বিষয়গুলো চালিয়ে নিতে পারব। কিন্তু বিজ্ঞান ও গণিতের মতো তুলনামূলক জটিল বিষয়ে শ্রেণিপাঠের দিকেই নজর দিতে হবে। এইসব ক্লাসের জন্য সপ্তাহে দুদিন হলেও শ্রেণিপাঠ কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া যেত। আবার সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একই দিনে উপস্থিত করার দরকার নেই। দেখা গেল যেদিন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাস থাকবে সেদিন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাস রাখা হবে না। এভাবে উপস্থিতি কম রেখেও দরকারি শিক্ষাটুকু চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। সপ্তাহে তিন দিন বা চারদিন ছেলেমেয়েরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গেলেও যথেষ্ট হবে। এতে করে তারা পাঠদানের পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ পাবে, তাদের মানসিক অবসাদ দূর হবে। শিক্ষকরাও পাঠদানে ফিরতে পারবেন।
এই বাজেটে শিক্ষকদের জন্য আমি কোনো প্রণোদনা দিতে দেখিনি। ব্যবসায়ীদের নানা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। যত রকম প্রণোদনা রয়েছে তা কেবল ব্যবসায়ীদেরই দেওয়া হচ্ছে। আমরা কি কেবল সারা জীবন ব্যবসা করেই কাটাব? চতুর্থ বিপ্লবে কি কেবল ব্যবসা দিয়েই আমরা টিকতে পারব? আমাদের তো বিজ্ঞানী তৈরি করতে হবে। গবেষক তৈরি করতে হবে। কৃষিবিজ্ঞানী তৈরি করতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তো আমাদের বিজ্ঞানী দরকার। কিন্তু সেই উদ্যোগটি কোথায় আমাদের! যারা ভালো শিক্ষার্থী, তারা বিশ^বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে বিদেশে চলে যাচ্ছে, দেশে থাকতে তাদের নিরুৎসাহী করা হচ্ছে। এসব নিরসনে সরকারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরকার যেমন বড় বড় প্রকল্প নিয়ে থাকে, শিক্ষা নিয়ে তেমন প্রকল্প নিতে হবে। শিক্ষায় ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে সরকার পিছিয়ে পড়া পরিবার বাছাই করতে পারে। তারপরে তাদের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিবারকে একটি ভালো মানসম্পন্ন ল্যাপটপ দিতে পারে। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একটি আনন্দময় শিক্ষা কার্যকম চালিয়ে নিতে পারবে। এতে করে সে মনে করবে, সরকার যেহেতু আমাকে একটি ল্যাপটপ দিয়েছে, তাই দায়িত্বশীল হয়ে সে তার পড়ালেখা চালিয়ে নেবে। আর ছেলেমেয়েরা যে কেবল অনলাইনে টিকটক নিয়ে ব্যস্ত থাকে এটাও পুরোপুরি সত্যি নয়। পরিবার যদি একটু যতœবান হয়, তবে ইন্টারনেটের সুফল ভোগ করা কঠিন কিছু নয়। উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এই করোনার সময়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছে। অনেকের মধ্যে হতাশা দেখা যাচ্ছে। এদের নিয়ে অনলাইনে নানারকম অ্যাপ বানিয়ে শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া যেত। এতে করে তাদেরও একটা আয়ের উপায় হতো। যেহেতু করোনায় টিউশন বন্ধ রয়েছে। এতে করে কোচিং প্রবণতা থেকেও বের হয়ে আসা যেত। কিন্তু কোথাও কোনো পরিকল্পনা দেখা যায় না। সংশ্লিষ্টদের মাথায় আসলে কোনো পরিকল্পনাই নেই।
দেশ রূপান্তর : আপনার পরামর্শ কী?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমি মনে করি, এই মহামারী অবস্থা থেকে বের হতে আমাদের দুই বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে আরও উদ্যোগী হয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে, প্রাইমারি শিক্ষাকে আরও কার্যকর করতে হবে। ভালো শিক্ষার্থী পেতে হলে ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। এখন শিক্ষকরা যে বেতনভাতা পান, তাতে ভালো শিক্ষকরা এই পেশায় আসতে উৎসাহী হচ্ছেন না। এই জন্য বাজেটে শিক্ষার বরাদ্দ বাড়াতে হবে। জিডিপির চার শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ করতে হবে। জিডিপির এই দুই শতাংশ দিয়ে কেবল দিনের কাজ দিনে করা যাবে, ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করে কোনো কাজ করা যাবে না।
