পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ

আপডেট : ১৫ জুন ২০২১, ১১:০৫ পিএম

সমন্বিত গ্রাহক হিসেবে থাকা পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সদস্য প্রতিষ্ঠান বাংকো সিকিউরিটিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে। প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে গত সোমবার রাতে রাজধানীর মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে ডিএসই কর্তৃপক্ষ। এর আগে বাংকো সিকিউরিটিজের সব ধরনের শেয়ার লেনদেন স্থগিত করে স্টক এক্সচেঞ্জটি।

ডিএসই কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে যে, বাংকো সিকিউরিটিজের মালিকপক্ষ বিনিয়োগকারীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ও শেয়ার আত্মসাৎ করে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দায়ের করা অভিযোগ এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ডিএসই।

এর আগে গত বছরও বিনিয়োগকারীদের শতকোটি টাকার শেয়ার ও অর্থ নিয়ে পালিয়ে যান ডিএসইর ব্রোকারেজ হাউজ ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের মালিক মো. শহিদ উল্লাহ। সে সময় ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ ও এর মালিকের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা ছাড়াও দেশ থেকে যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে জন্য পুলিশের সহযোগিতা নেয় ডিএসই। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা তাদের পাওনা অর্থ ফেরত পাননি। এর আগে শাহ মোহাম্মদ সগীর, সাদ, ডন সিকিউরিটিজসহ অন্তত ছয়টি ব্রোকারেজ হাউজ বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করে। অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় মামলা দায়ের হলেও তা নিষ্পত্তি না হওয়ায় দীর্ঘ সময়েও বিনিয়োগকারীরা তাদের পাওনা অর্থ ফেরত পাননি। এমন পরিস্থিতিতে বাংকো সিকিউরিটিজে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটল।  

বাংকো সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারীরা অভিযোগে জানিয়েছেন, গত কয়েক মাস ধরেই গ্রাহকদের পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে পারছিল না বাংকো সিকিউরিটিজ। ডিএসই ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) কাছে একাধিক অভিযোগ দিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকরা। কিন্তু স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ যথাযথ সময়ে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের একজন সাবেক অধ্যাপকেরও বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে গেছে ব্রোকারেজ হাউজটিতে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ দেশ রূপান্তরকে জানান, আমার ও আমার মেয়ের যৌথ তিনটি বিও হিসাবে মোট ২৩ লাখ টাকার শেয়ার ও অর্থ রয়েছে বাংকো সিকিউরিটিজে। এর মধ্যে নগদ রয়েছে ১১ লাখ টাকা, যা প্রতিষ্ঠানটি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর আগেও নগদ অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় বাংকো সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে ডিএসই ও এসইসির কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। সে সময় কয়েক কিস্তিতে তারা অর্থ পরিশোধ করেছিল। শুধু আমি নই, বাংকো সিকিউরিটিজের অন্যান্য গ্রাহকও একই সমস্যায় পড়েন। প্রতিষ্ঠানটির এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। এসইসি ও ডিএসই যদি যথাসময়ে ব্যবস্থা নিত, তাহলে হয়তো এমন পরিস্থিতি এড়ানো যেত।

মতিঝিল থানায় দায়ের করা সাধারণ ডায়েরিতে ডিএসই জানিয়েছে, গত ৬ মে ও ৬ জুন সিকিউরিটি আইনকানুন লঙ্ঘনের মাধ্যমে ডিএসইর লেনদেন নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয় বাংকো সিকিউরিটিজ। এমন পরিস্থিতিতে গত ৭ জুন ব্রোকারেজ হাউজটিতে বিশেষ পরিদর্শন করে সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকার ঘাটতি পান ডিএসইর কর্মকর্তারা। ঘাটতি সমন্বয় করতে বলা হলেও ব্রোকারেজ হাউজের মালিকপক্ষ ব্যর্থ হয়। স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা ওই অর্থ বাংকো সিকিউরিটিজের মালিকপক্ষ আত্মসাৎ করেছে। এ ঘটনায় পুঁজিবাজারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা আতংকিত হয়ে পড়েছে।  

এমন পরিস্থিতিতে বাংকো সিকিউরিটিজ ও এর চেয়ারম্যান আবদুল মুহিত, পরিচালক মো. শফিউল আজম, ওয়ালিউল হাসান চৌধুরী, নুরুল ঈশাণ সাদাত, এ মুনিম চৌধুরী, জামিল আহমেদ চৌধুরীসহ ব্রোকারেজ হাউজটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪০৬ ও ৪০৯ ধারায় প্রতারণামূলক বিশ^াসভঙ্গের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ এনেছে ডিএসই।  

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েক বছরে ডিএসইর সদস্য ব্রোকারেজ হাউজগুলোতে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের ঘটনা প্রতি বছরই ঘটছে। গত বছর ক্রেস্টের ঘটনার পর ব্রোকারেজ হাউজগুলোতে নিয়মিত নিরীক্ষা ও বিশেষ নজরদারি চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় এসইসি। আইনে শীর্ষ ৩০ ব্রোকারেজ হাউজে বছরে একবার ও অন্য ব্রোকারেজ হাউজগুলোতে দুই বছরে একবার বিশেষ নিরীক্ষা চালাতে পারে কমিশন। তবে দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় প্রতি মাসে একবার করে ব্রোকারেজ হাউজগুলো পরিদর্শন করার বিধান রাখা হলেও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ তা সব সময় করতে পারছে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত