অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে

আপডেট : ১৫ জুন ২০২১, ১১:৩৭ পিএম

নারীর বিচার না পাওয়ার মূল কারণগুলোর মধ্যে যে দিকটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক তা হলো, নারীর প্রতি বৈষম্য ও অবজ্ঞামূলক পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। দেশের নানা ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটলেও এই মানসিকতা বাংলাদেশের সমাজে এখনো ভয়ানক মাত্রায় রয়ে গেছে। সম্প্রতি অভিনেত্রী পরীমণিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়েরের পর এই বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। 

পরীমণি অভিযোগ করেন, গত ১০ জুন রাতে ঢাকার অদূরে বোট ক্লাবে তাকে ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টা করা হয়। সেখানে তাকে আক্রমণ করে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে অপরাধীরা। ঘটনার পরপরই বনানী থানায় অভিযোগ করতে গিয়েছিলেন পরীমণি। অভিযোগ উঠেছে, সে সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা তার অভিযোগ রেকর্ড করেননি। এই ঘটনায় মারাত্মক ভেঙে পড়েন পরীমণি। ঘটনার চারদিন পরে ‘আমাকে রেপ এবং হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে’ অভিযোগ করে নিজের ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা কামনা করেন এই অভিনেত্রী। এরপরই মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরীমণির অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলা গ্রহণ করে। ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মামলায় নাসির উদ্দিন মাহমুদসহ (৫০) পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ইতিমধ্যে আটকদের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। 

পরীমণির যে সামাজিক অবস্থান ও পরিচিতি সেই জায়গা থেকে মামলা দায়েরের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা কোনো মতেই বিচারপ্রার্থীদের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। পুলিশের কাজ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আমলে নিয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। এই ঘটনার শুরুতে যার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। ঘটনাটি দেশজুড়ে সমালোচিত হওয়ার পর অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনাটা অবশ্যই শেষ পর্যন্ত স্বস্তির। 

পরীমণির সঙ্গে সংঘটিত এই ঘটনা নারীর প্রতি সহিংস আচরণেরই একটি দৃষ্টান্ত। এসব অপরাধ বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি স্থায়ী সামাজিক ব্যাধির মতো ঘটে চলেছে। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ করার জন্য কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ। ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের খবর যত বেশি পাওয়া যায়, এসব অপরাধের দায়ে অপরাধীদের শাস্তির দৃষ্টান্ত তার চেয়ে অনেক কম। একটার পর একটা ঘটনার সমান্তরালে যদি একটার পর একটা শাস্তির খবরও নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই প্রবণতা হ্রাস পাবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না পেলে অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ থেকে যায়। ফলে সব ধরনের অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই আইনের শাসন মজবুত করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তবে ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারীর সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু আইনের শাসনই যথেষ্ট নয়, সামাজিক শক্তিরও প্রবল সমর্থন প্রয়োজন। নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র, ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে নারীর মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটা শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সম্ভব নয়। এ জন্য সামাজিক শক্তিগুলোকেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংস আচরণের বিরুদ্ধে ব্যক্তি, পরিবার, পাড়া-মহল্লাসহ গোটা সমাজকে সোচ্চার হতে হবে।

দেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নানা আইন ও নীতিমালা রয়েছে। এটা পরিষ্কার যে শুধু আইন করে নারীর ওপর নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না। কেননা, মূল সমস্যা হচ্ছে নারীর প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। সমাজের একাংশের কাছে নারী মানেই দুর্বল, তাদের বুদ্ধি নেই, তারা কেবলই ভোগের বস্তু, তাদের কাজ শুধু রান্নাবান্না করা ও সন্তান লালনপালন করা। এই দৃষ্টিভঙ্গির যত দিন না পরিবর্তন ঘটবে, ততদিন নারীরা নির্যাতিত হতেই থাকবেন। নারীর প্রতি সমাজের এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। অভিনেত্রী পরীমণিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা নেতিবাচক বক্তব্য ও তীর্যক মন্তব্য সমাজের এমন অবস্থাকেই প্রকাশ করে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নারী নির্যাতনকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে । বিচারপ্রার্থী নারীর জন্য থানা থেকে হাসপাতাল ও আদালত পর্যন্ত সর্বত্র অনুকূল ও সম্মানজনক পরিবেশ গড়তে হবে। তারা যেন হেনস্তা না হয়, সুবিচার পায়, এ বিষয়ে মনোযোগ দরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত