আশ্চর্য চেরাগের সর্বগ্রাসী অন্ধকার

আপডেট : ১৬ জুন ২০২১, ১০:৪৪ পিএম

বছরের পর বছর ধরে দেশের রাজনীতিতে বহুল উচ্চারিত এক প্রপঞ্চ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জনপ্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারের নানামুখী উন্নয়ন কর্মকা-ের সবখানেই যেন অনিয়ম ও দুর্নীতি দিন দিন আরও বেশি কাঠামোগতভাবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। দেশজুড়ে আলোচনায় আসা নানা দুর্নীতিকা- থেকে যেমন দুর্নীতির বিস্তার টের পাওয়া যায়, তেমনি প্রায়ই রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া আশ্চর্য ক্ষমতাধর মানুষদের উত্থানের খবরে বোঝা যায় যে তৃণমূল থেকে ওপর মহল পর্যন্ত কাঠামোটাই কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে উঠেছে। এজন্যই কিছুদিন পর পরই আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ পাওয়ার মতো প্রায় অলৌকিক কায়দায় বিপুল অর্থ-বিত্ত-সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা অসম্ভব ক্ষমতাধর মানুষদের কথা উঠে আসে সংবাদ মাধ্যমে। রাজনীতি, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং-আর্থিক খাত থেকে শুরু করে চিকিৎসাসেবা, পরিবহনসেবা কিংবা শিক্ষাঙ্গন বা বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় নেই এই ক্ষমতাধরদের দৌরাত্ম্য?

দেশ রূপান্তরে বুধবার ‘হকার থেকে কোটিপতি হাজি ফারুক’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উঠে আসে এমনই এক আশ্চর্য চেরাগধারীর কাহিনী। পাবনার ঠিকাদার ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ফারুক হোসেন ওরফে হাজি ফারুকের উত্থানের ঘটনা হয়তো সিনেমার গল্পকেও হার মানাবে। একযুগ আগেও পাবনা শহরের ফুটপাতে বসে টুকিটাকি জিনিস বিক্রি করা হকার ফারুক সম্প্রতি শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কোটি টাকা দিয়ে বাড়ি কিনেছেন সাবেক এক মন্ত্রীর কাছ থেকে। টুকটাক ঠিকাদারি শুরু করার সঙ্গে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলে ভেড়ার কারণে অল্পদিনেই ফারুকের কপাল খুলে যায়। হকার থেকে বনে যান কোটিপতি। ফারুকের বিস্ময়কর উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের পাবনার এক প্রভাবশালী নেতার আশীর্বাদ। নিজের চেষ্টা আর পরিশ্রমে যদি কেউ ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হন তাহলে তাকে নিয়ে গর্বই করে সমাজ। কিন্তু সেই উত্থান যখন ঘটে চোরাপথের অন্ধকারে তখন তা নিয়ে গর্ব করার সুযোগ নেই। আর ক্ষমতার ধর্মই এমন যে, যে যত বেশি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন তার ক্ষমতার দম্ভ ততই বাড়তে থাকে। ফারুকের ক্ষেত্রেও এটাই ঘটেছে। গত ৬ জুন পাবনা গণপূর্ত ভবনে সদলবলে আগ্নেয়াস্ত্রসহ মহড়া দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন স্থানীয় এই ঠিকাদার আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক হোসেন।

সংবাদ মাধ্যমের নানা প্রতিবেদন থেকে এটা স্পষ্ট যে, বর্তমানে নাইস কনস্ট্রাকশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ফারুকের উত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রভাব। একদা ফুটপাতের হকার ফারুক মাঝে বিদেশে পাড়ি জমালেও তিনি দেশে ফিরে এসে ঠিকাদারি ও রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাউবো, এলজিইডিসহ বিভিন্ন দপ্তরে দরপত্র ছিনতাই করে, সাধারণ ঠিকাদারদের টেন্ডারে অংশগ্রহণে বাধা দিয়ে এবং সিন্ডিকেট করে কাজ কেড়ে নিতে শুরু করেন ফারুক। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী এক নেতার ছত্রছায়ায় একপর্যায়ে টেন্ডার সমঝোতা কমিটির হর্তাকর্তা বনে যান আর পরিচিতি পান‘নিগো ফারুক’ হিসেবে। মাত্র ১২ বছরে ফারুক তার নাইস কনস্ট্রাকশনের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার ঠিকাদারি মেশিনারিজ, উচ্চমূল্যের গাড়িসহ অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঠিকাদারি ব্যবসা ছাড়াও জেলার বিভিন্ন নদী থেকে অবৈধভাবে উত্তোলন করা বালু ও মাটি পরিবহনের ব্যবসাও করছেন ফারুক। ফারুক শুধু সম্পদশালীই হননি, দিন দিন হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। সরকারি কর্মকর্তাদের মারধরের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার দাপটে পাবনার সরকারি সব দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ ঠিকাদাররা অতিষ্ঠ। ভুক্তভোগীরা সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়া তো দূরে থাক, তার বিরুদ্ধে মুখ খোলারই সাহস করেন না। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি মাসের শুরুতে ২০-২৫ জন সহযোগী নিয়ে পাবনার গণপূর্ত দপ্তরে সশস্ত্র মহড়ায় গিয়েছিলেন তিনি। মহড়ার ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে তদন্তে নামে এবং ওই নেতাদের আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি জব্দ করে পুলিশ। ইতিমধ্যে ফারুকসহ ওই আওয়ামী লীগ নেতাদের অস্ত্র ও গুলির লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশও করেছে পুলিশ।

পাবনার গণপূর্ত দপ্তরে ঠিকাদার আওয়ামী লীগ নেতাদের সশস্ত্র মহড়া সিসিটিভি ফুটেজের কারণে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু অস্ত্রহীন মহড়া আর অসাধু চক্রের যোগসাজশে সারা দেশের নানা দপ্তরে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে সেসব কি দৃশ্যমান নয়? রাজনৈতিক নেতৃত্ব তথা জনপ্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিনির্ধারণ করবেন আর নির্বাহী বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সেটা বাস্তবায়ন করবেন, এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে রাজনীতিই এখন চলে গেছে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে সর্বত্রই ব্যবসায়ীদের জয়জয়কার। এভাবেই অসাধু রাজনৈতিক নেতা-জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী আর ঠিকাদার-ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নানা চক্রের মধ্য দিয়েই বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন আর ক্ষমতার দৌরাত্ম্য দেখাতে শুরু করেন ফারুকের মতো এই আশ্চর্য চেরাগধারীরা। এভাবেই অনিয়ম-দুর্নীতি-ক্ষমতার আশ্চর্য চেরাগের সর্বগ্রাসী অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে দেশে। এখন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই ভাবতে হবে যে, তারা কীভাবে দেশকে এই অন্ধকার থেকে রক্ষা করবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত