সীমান্ত জেলাগুলোয় বিধিনিষেধ ও লকডাউন দিয়েও থামানো যাচ্ছে না সংক্রমণ। যত দিন যাচ্ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু ততই বাড়ছে কয়েকটি জেলায়; বিশেষ করে রাজশাহী, সাতক্ষীরা, যশোর, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ কয়েকটি জেলায় শনাক্তের হার হু হু করে বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার হাসপাতালগুলোর পরিস্থিতিও ভয়াবহ রকমের খারাপ। খুলনা, রাজশাহী, দিনাজপুর, যশোর, ফরিদপুরসহ বেশ কয়েকটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি আছে। এর মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের অবস্থা বেশি খারাপ। সেখানে এক আইসিইউ বেডের জন্য সব সময় ৭০ জন অপেক্ষায় থাকে।
দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানে খবরে বিস্তারিত :
রামেকে আইসিইউর হাহাকার : করোনায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর ঘটনা এখন প্রতিদিনকার। দিন যত যাচ্ছে, বাড়ছে মৃত্যুর ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাকে প্রথম পর্যায়ে গুরুত্ব না দিয়ে রোগীর অবস্থা যখন খারাপ হয়ে যাচ্ছে, তখন চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অন্যতম কারণ। এ ছাড়া শেষ সময়ে যেসব রোগীর আইসিইউ দরকার হয় তারাও সময়মতো আইসিইউ পান না। এখনকার একটি আইসিইউ বেড পাওয়ার জন্য সব সময়ই অপেক্ষায় থাকেন প্রায় ৭০ জন রোগী। এ কারণে আইসিইউর অপেক্ষা করতে করতেই মারা যাচ্ছেন অনেকেই। এ অবস্থায় অনেকেই মনে করেন সময়মতো আইসিইউ না পাওয়া মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে একটি।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী বলেন, ‘আমাদের এখানে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট আছে। এটি মারাত্মক। এর ফলে মৃত্যু বেড়ে যায়। এ ছাড়া আমাদের অনেকেই আক্রান্ত হয়ে খারাপ অবস্থাতেও বাড়িতে থাকছেন। মনে করছেন ভালো হয়ে যাবেন। যখন তারা খুব খারাপ হয়ে যান, তখন হাসপাতালে আসছেন। তখন তাদের বাঁচানো যাচ্ছে না। দ্রুত ডাক্তারদের পরামর্শ না নিলে বা হাসপাতালে ভর্তি না হলে মৃত্যুর হার কমানো যাবে না। কেউ পজিটিভ হলে তার রক্ত, ফুসফুসসহ বেশ কিছু পরীক্ষা করা দরকার। দ্রুত চিকিৎসা নিলে এটি ভালো হয়। যত বেশি দেরি করবে, তত বেশি মৃত্যুর হার বাড়বে।
আইসিইউতে জায়গা না পাওয়া মৃত্যু বাড়ার কারণ কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের হাসপাতালে আইসিইউর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বেডেরও সংকট আছে। এর মধ্যেই ম্যানেজ করে চলতে হচ্ছে। এ অবস্থায় রোগী খারাপ হওয়ার আগেই যদি চিকিৎসকের কাছে যান, তবে হয়তো তার আইসিইউর প্রয়োজনই হবে না। এ জন্য নিজেদের সতর্ক থাকতে হবে। ইগনোর করলে হবে না।’
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. কাইয়ুম তালুকদার বলেন, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যারা আসছে, বেশি খারাপ অবস্থায় আসছে। যার কারণে তাদের অক্সিজেন দিয়েও এটি রিকভার করা যাচ্ছে না।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘আগে আমাদের এখানে ৬০ থেকে ৬৫ জন রোগী ভর্তি থাকত। তখন দুই-তিনজন মারা যেত। এখন আছে ৩০০-এর ওপরে। মৃত্যুও আনুপাতিক হারে বাড়ছে।’ এমন মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, মারা যাওয়াদের মধ্যে বড় একটি অংশ বয়স্ক। যাদের বয়স ৬০ বছরের ওপরে। তাদের আরও অনেক রোগ থাকে। হার্টের সমস্যা, ডায়াবেটিসের সমস্যা. কিডনি জটিলতা ইত্যাদি। আর অন্য রোগে আক্রান্তরা করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের ঝুঁকিটাও বেড়ে যায়। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়। এ ছাড়া অনেকেই দেরিতে রোগী হাসপাতালে আনছে। তাদের অক্সিজেন লেভেল কমে যাচ্ছে। কেউ কেউ অক্সিজেন লেভেল কম থাকলেও বাসাতেই থাকছে। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসার ফলে তাদের আর বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিধিনিষেধ বাড়ল এক সপ্তাহ : চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগে আসা তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনা সংক্রমণ কমলেও বাড়ছে মৃত্যু। বুধবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনজন মারা গেছেন। এর আগে মঙ্গলবার মারা গেছেন পাঁচজন। এ নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনায় মারা গেলেন ৮৫ জন। এদিকে করোনায় মৃত্যু বাড়লেও সংক্রমণ কমেছে উল্লেখ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনা রোধে জারি থাকা ১১ দফা বিধিনিষেধের মেয়াদ আরও এক সপ্তাহ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন।
লকডাউনে ফল পাওয়া যাচ্ছে না সাতক্ষীরায় : দুই সপ্তাহের লকডাউনেও সুফল পাচ্ছে না সাতক্ষীরা জেলাবাসী। সাতক্ষীরায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন চারজন রোগী মারা গেছেন।
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় শেষ জেলা ও সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে সাতক্ষীরায় দুই সপ্তাহের লকডাউন চলল। কিন্তু আশানুরূপ ফল মিলল না। সংক্রমণ ও মৃত্যু সমানভাবে বাড়ছে তো বাড়ছেই। এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলে লকডাউন বেশি এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও কঠিন। এত সংক্রমণ, এত মৃত্যু তারপরও মানুষের সচেতনতা বাড়ছে না; বরং উল্টো চিত্র। বুধবারও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা মেডিকেলের করোনা ওয়ার্ডে তিন ও বেসরকারি (ন্যাশনাল) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একজন মারা গেছেন। এ পর্যন্ত করোনায় মৃত্যু হয়েছে ৫৫ জনের। করোনা উপসর্গে ২৫২ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। করোনা পজিটিভ হয়েছে ২ হাজার ৬১১জন।
দিনাজপুরে আক্রান্তের হার ৫৩ শতাংশ : করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন কর্র্তৃক ঘোষিত কঠোর লকডাউনে সাধারণ মানুষকে বাড়ি রাখা সম্ভব হচ্ছে না। প্রশাসন ও পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করলেও কোনো লাভ হচ্ছে না। জেলায় ২৪ ঘণ্টায় ৭৬ জন নতুন করে করোনা আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু দিনাজপুর সদর উপজেলায় ৬০ জন রয়েছে; যা দিনাজপুর সদর উপজেলায় আক্রান্তের হার দাঁড়িয়েছে ৫৩ শতাংশ।
এদিকে সংক্রমণ ও মৃত্যু বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রশাসন কর্র্তৃক ঘোষিত কঠোর লকডাউনের গতকাল বুধবার দ্বিতীয় দিন। কঠোর লকডাউনের মাঝেও সাধারণ মানুষকে বাড়িতে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। জেলা সদর উপজেলার প্রবেশের সব সড়কে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও আনসারের নেতৃত্বে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। তবে জেলা শহরের চিত্র ছিল ভিন্ন। শহরের ভেতরে ইজিবাইক, রিকশাভ্যান, মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ রাখার কথা থাকলেও তা কেউ মানছে না।
মোংলায় বাড়ানো হয়েছে বিধিনিষেধ : মোংলায় চলমান করোনা বিধিনিষেধ আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। এর আগে তিন দফায় দেওয়া বিধিনিষেধের শেষ দিন ছিল গতকাল। গতকাল দুপুরে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মো. আজিজুর রহমান সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক শেষে চতুর্থ দফায় আরও এক সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। চলমান করোনা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। মোংলায় রোজার ঈদের পর থেকে হঠাৎ করে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় গত ৩০ মে থেকে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করে প্রশাসন।
এদিকে কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় বুধ ও বৃহস্পতিবার পৌর শহরের প্রধান কাঁচামাল ও মাংসের বাজার বন্ধ রাখার জন্য মঙ্গলবার ঘোষণা দেয় স্থানীয় প্রশাসন।
চলমান বিধিনিষেধে মোংলার করোনা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জীবিতেষ বিশ^াস। চলমান বিধিনিষেধ আরও এক সপ্তাহের জন্য বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি সময়োপযোগী বলেও জানান তিনি। এতে করোনা সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
যশোরে শনাক্তের হার ৪৯.২৭ শতাংশ : যশোর সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডা. রেহনেওয়াজ জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় এ জেলায় ৪১৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ২০৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৪৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। এ সময়ে করোনা উপসর্গ নিয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালে দুজন মারা গেছেন।
যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী মো. সায়েমুজ্জামান জানান, করোনা সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় চলমান বিধিনিষেধ আরও সাত দিন বাড়ানো হয়েছে। যশোর ও অভয়নগর পৌরসভার সঙ্গে যশোর সদরের চাঁচড়া, উপশহর, আরবপুর, নওয়াপাড়া ইউনিয়নসহ বেনাপোল, ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার বেশ কিছু এলাকা নতুন করে এই বিধিনিষেধের আওতায় আনা হয়েছে। বুধবার থেকে জেলার অভ্যন্তরীণ সব রুটে গণপরিবহন বন্ধ।
