থাপ্পড়ের কথা স্বীকার নাসিরের নজরদারিতে অমি সিন্ডিকেট

আপডেট : ১৭ জুন ২০২১, ০২:০৫ এএম

চিত্রনায়িকা পরীমণির করা ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মামলার অন্যতম আসামি তুহিন সিদ্দিকী অমি ও নাসির ইউ মাহমুদ সিন্ডিকেটের অনেকেই গোয়েন্দাদের নজরদারিতে আছেন। বিশেষ করে মানবপাচার ইস্যুটি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে। মানবপাচার চক্রের হোতা অমির দুই প্রতিষ্ঠান থেকে জব্দ করা হয়েছে শতাধিক পাসপোর্ট, যেগুলোর বেশিরভাই তরুণীদের। পাশাপাশি বোট ক্লাব থেকে ঘটনার সময়ের একটি ভিডিও জব্দ করা হয়েছে। এদিকে শুরুতে পরীমণির অভিযোগ অস্বীকার করলেও রিমান্ডের প্রথম দিন সেই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন তারা। সেই রাতের ভিডিও ফুটেজ দেখার পর তারা আর অস্বীকারও করেননি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, রাত ১২টা ২২ মিনিটে ঢাকা বোট ক্লাবের সামনে একটি কালো গাড়ি থামে। গাড়িটি ছিল বোট ক্লাবের সদস্য তুহিন সিদ্দিকী অমির। গাড়ির সামনের দরজা থেকে নামেন চিত্রনায়িকা পরীমণি। পেছনের ডান পাশের দরজা দিয়ে বের হন অমি, পরীমণির কস্টিউম ডিজাইনার জিমি ও তার বোন বনি। ক্লাবের বাইরের ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ক্লাবে ঢোকার সময় পরীমণি কালো টপস, জিন্সের প্যান্ট পরা ছিলেন। বনি লাল টপস, সঙ্গে জিন্সের প্যান্ট এবং জিমি কালো হাতাকাটা গেঞ্জি ও হাফপ্যান্ট পরা ছিলেন। অমির পরনে ছিল সাদা গেঞ্জি ও গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট। শুধুমাত্র অমি ছাড়া বাকি সবাই মাস্ক পরে ক্লাবে প্রবেশ করেন। রিসিপশনের ক্যামেরায় তাদের চারজনকে একসঙ্গে বারে ঢুকতে দেখা যায়। তখন রিসিপশন ডেস্কে ছিলেন দুজন এবং ডেস্কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরও একজন স্টাফ। রাত ২টায় রিসিপশনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পরীমণিকে অচেতন অবস্থায় কোলে নিয়ে বের হন জিমি ও একজন সিকিউরিটি গার্ড। পেছনে দৌড়াচ্ছিলেন তার বোন বনি। তাদের পেছনে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যাচ্ছিলেন অমি। গাড়িতে ওঠার সময় আঙুল তুলে সবাইকে ধমকের ইঙ্গিত দিতে দেখা গেছে অমিকে। বারের ভেতরে সিসিটিভি ফুটেজ না থাকলেও জিমি তার মোবাইলে ১৬ সেকেন্ডের মতো একটি ধস্তাধস্তির ভিডিও করেছিলেন। এতে নাসিরকে হই-হুল্লোড় ও গালমন্দ করতে শোনা যায়।

এদিকে বনানী থানার বাইরের আরেকটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, রাত ৩টা ৫২ মিনিটে বনানী থানায় প্রবেশ করেন পরীমণি। প্রথমে তারা ডিউটি অফিসারের রুম হয়ে থানার ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে একজন অফিসার তাদের ডিউটি অফিসারের কাছে যেতে বলেন। পরীমণি ডিউটি অফিসারের রুমে গিয়ে তার বরাবর চেয়ারে বসেন এবং ঘটনার বর্ণনা দেন। তবে ডিউটি অফিসার তার কথা বুঝতে পারছিলেন না। পরে তাকে পুলিশের একটি গাড়িতে পাঠানো হয়।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, নাসির ও অমি পরীমণির গালে থাপ্পড় মারা এবং মাটিতে ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। মূলত তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ অমির গাড়িতেই পরীমণিকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। অমি না নিয়ে গেলে এমন ঘটনা নাও ঘটতে পারত।

তদন্তকারী সংস্থার এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, আলোচিত এই ঘটনাটি বেশ স্পর্শকাতর হিসেবে দেখা হচ্ছে। মামলা দায়েরের পর থেকেই আসামি গ্রেপ্তার ও তাদেরকে রিমান্ডে নেওয়া এবং জিজ্ঞাসাবাদে বেশ সতর্ক ও সক্রিয় রয়েছেন তদন্তকারীরা। নাসির ও অমি এসব অভিযোগ প্রথমে অস্বীকার করলেও ভিডিও ফুটেজ দেখানোর পর তারা চুপসে যান। তখন পরীমণিকে জোরপূর্বক মদ খাওয়ানোর ঘটনা অস্বীকারও করতে পারেননি। 

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ে নারী ও মানবপাচার সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক অমি। বাবা তোফাজ্জল হোসেনসহ ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় বহুল আলোচিত ১০ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ করতেন অমি। সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার জন্য তারা ২০ জনের একটি চক্র গড়ে তোলেন। মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করার নামে সেই ২০ রিক্রুটিং এজেন্সি থেকে ১০ মিলিয়ন রিঙ্গিত করে চাঁদা আদায় করছিলেন অমি, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এই কাজে তাকে সহযোগিতা করেন ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের স্বপন ও অমির ভারতীয় পার্টনার এ এস খান।

পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, তারা এ এস খান সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছেন। পরীমণির দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর মাদক মামলায় নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও তুহিন সিদ্দিকী অমিকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গতকাল ছিল রিমান্ডের প্রথম দিন। রিমান্ডে তাকে মানবপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ সময় যুবদলের রাজনীতিতে জড়িত অমি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সূত্র ধরে অমির বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়েছে। তার মধ্যে আশকোনা ও উত্তরায় দুটি রিক্রুটিং এজেন্সির অফিস থেকে ১০২টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। পাসপোর্টগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই তরুণীদের। ওইসব পাসপোর্টে নানা তথ্য আছে। আমরা এগুলো যাচাই-বাছাই করছি।

ডিএমপির উত্তরা ডিভিশনের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মঙ্গলবার রাতে দক্ষিণখানের সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টার নামে অমির একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে অভিযান চালানো হয়। তা ছাড়া উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় আরেকটি ট্রাভেল এজেন্সিতে পুলিশ অভিযান চালায়। সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ১০২টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার ট্রাভেল এজেন্সিতে অভিযান চালিয়ে কিছু পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে অমি, বাছির, মশিউরসহ পাঁচজনকে আসামি করে পাসপোর্ট আইনে মামলা করেছে। তিনি আরও বলেন, জব্দ করা পাসপোর্টগুলো বিভিন্ন নারী-পুরুষের। তারা কারা, তাদের পাসপোর্ট রিক্রুটিং এজেন্সিতে কেন রাখা হয়েছে, সেগুলো বৈধ নাকি অবৈধভাবে রাখা হয়েছে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ট্রাভেল এজেন্সির বৈধ লাইসেন্স আছে কিনা, তাও দেখা হচ্ছে।

দক্ষিণখান থানার ওসি শিকদার মো. শামীম হোসেন জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো অমির হলেও এর পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বাছির ও মশিউর মিয়া। তাদের মধ্যে একজন প্রতিষ্ঠানটির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর এবং অন্যজন মার্কেটিং ডিরেক্টর। কী অভিযোগে মামলা করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশেষ কোনো অনুমতি ছাড়া একটি লোক বা একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে এতগুলো পাসপোর্ট থাকা বেআইনি। সে কারণেই তাদের আটক করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় আসামি অমিও। যেহেতু অমি অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার, তাই এ মামলায় তাকে শোন অ্যারেস্ট দেখানো হবে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আশকোনায় সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে অমির বাবা তোফাজ্জল হোসেন বিগত দেড় যুগ ধরে মানবপাচার ও মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির সিন্ডিকেট টপ টেন রিক্রুটিং এজেন্সির হোতা। নাসিরের সঙ্গে অমি গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই গা-ঢাকা দিয়েছেন তোফাজ্জল। তাকে না পেয়ে তার দুই সহযোগী বাছির ও মশিউরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া অমির ক্যাশিয়ার পলাশকে গ্রেপ্তারের জন্য মাঠে নেমেছে পুলিশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত