করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিপর্যস্ত ভারত আসছে অক্টোবর মাসেই তৃতীয় ঢেউয়ের মুখোমুখি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক জরিপে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আসন্ন ঢেউটি চলমান দ্বিতীয় ঢেউয়ের তুলনায় নিয়ন্ত্রিত হলেও এটি আরও এক বছর ধরে ভোগাতে পারে ভারতবাসীকে। গত ৩ থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত ৪০ জন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, ভাইরোলজিস্ট তাদের মতামত দেন এই জরিপে।
এদিকে ভারতে করোনার তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়লে তার ঝুঁকি আছে বাংলাদেশেও। এ জন্য তার আগেই যত সম্ভব টিকাকরণ ও কঠোর স্বাস্থ্যবিধির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ এ বিষয়ে গতকাল দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে আমাদের দেশের বিশাল সীমান্ত এলাকা। তাই সেখানে তৃতীয় ঢেউ এলে আমাদেরও ঝুঁকি থাকে। নানা কারণেই ভারতের সঙ্গে সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এজন্য অবশ্যই এখন থেকেই আমাদের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের যত বেশি সম্ভব টিকাকরণ করতে হবে আর মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি।’
রয়টার্সের পাশাপাশি গতকাল শুক্রবার মহারাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে করোনার সম্ভাব্য তৃতীয় ঢেউ নিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজ্যে আগামী দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে করোনার ‘ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্ট’ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার আলোকে রাজ্য সরকার এবার আগেই লোকজনকে সম্ভাব্য নতুন দফার সংক্রমণ ঢেউ নিয়ে সতর্ক করছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে দেশটির স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বিনোদ পালও তৃতীয় ঢেউ সম্পর্কে সতর্ক করে জানিয়েছিলেন, গণটিকাকরণ শেষ হওয়ার আগেই তৃতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা চলে আসতে পারে। তার মতে, সেই সংক্রমণের চরিত্র কেমন হবে, তার আগাম আন্দাজ এখনো করা যাচ্ছে না। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ডেল্টা ধরনের পরিবর্তিত রূপই তৃতীয় ঢেউয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ ছাড়া দেশটির ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলও চলতি বছরের শেষ দিকে তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, গণটিকাকরণ ছাড়া তৃতীয় ঢেউ মোকাবিলা অসম্ভব।
গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত রয়টার্সের ওই জরিপে দেখা গেছে, বিশেষজ্ঞদের ৮৫ শতাংশই মনে করছেন, ভারতে করোনার তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে অক্টোবর মাসে। তবে কারও কারও মত আগস্ট-সেপ্টেম্বরই শুরু হতে পারে ‘ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্ট’-এর উচ্চমাত্রার সংক্রমণ। আরও কয়েকজনের মত, ভারতে করোনার পরেও ঢেউ শুরু হতে পারে চলতি বছরের নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে।
তবে বিশেষজ্ঞদের ৭০ শতাংশই মনে করেন দ্বিতীয় ঢেউয়ের মতো সুনামির আকার ধারণ না করতে পারে তৃতীয় ঢেউ। টিকাকরণ ও ওষুধের প্রয়োগের কারণে আসন্ন ঢেউটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হবে বলে মত তাদের। তবে ১৫ শতাংশের মত হলো সেটা দ্বিতীয় ঢেউয়ের চাইতেও ভয়ংকর হতে পারে। আর বাকি ১৫ শতাংশের মত, তৃতীয় ঢেউয়ের ভয়াবহতা হতে পারে দ্বিতীয় ঢেউয়ের মতোই।
অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের পরিচালক ড. রণদীপ গুলেরিয়ার বলেন, তৃতীয় ঢেউ এলেও তা হবে অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। কারণ এই সময়ের মধ্যে অনেককেই টিকা দেওয়া সম্ভব হবে। এ ছাড়া অনেকের মধ্যেই প্রাকৃতিকভাবে প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে উঠবে তার আগেই।
অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস এর আগে এক সমীক্ষায় বলেছিল, টিকা নেওয়া মানুষজনের পক্ষে কভিডের মোকাবিলা করা সহজতর হয়েছে। মৃত্যুহারও এই মানুষদের মধ্যে কম। তাই টিকাকরণ ছাড়া করোনার প্রতিরোধের বিকল্প কোনো উপায় নেই।
৩০ মে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জুন মাসে দেশের ১২ কোটি টিকার জোগান নিশ্চিত হবে এবং ডিসেম্বর শেষ হওয়ার আগেই সবাইকে টিকা দেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে ভারতে এখনো মাত্র সাড়ে ৯ কোটি মানুষের টিকাকরণ হয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ।
মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক আর রামকুমার বলেন, যেভাবে চলছে, তাতে কোনোভাবেই এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সরকারের পক্ষে সম্ভবপর নয়। এই আশঙ্কা সত্য হলে সেটা হবে দেশের নাগরিকের প্রতি সরকারের আরও এক মিথ্যাচার।
এ ছাড়া দেশটির জনগণের স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতাও আশাব্যঞ্জক নয়। তাই সত্যিকার অর্থে তৃতীয় ঢেউ কী পরিমাণ ভয়াবহতা ডেকে আনতে যাচ্ছে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট করে বলার ক্ষমতা নেই কারোই।
এদিকে দেশটিতে এখনো যেহেতু ১৮ বছরের কম বয়সীদের টিকা দেওয়া হচ্ছে না তাই শিশু-কিশোররা তৃতীয় ঢেউয়ে বেশ ঝুঁকির মুখেই আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞদের ৬৫ শতাংশই মনে করেন, তৃতীয় ঢেউ ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ভয়ংকর হতে পারে। তবে বাকি ৩৫ শতাংশের মত, তৃতীয় ঢেউয়ের কারণে শিশুদের বিশেষ কোনো ঝুঁকি নেই।
ভারতের প্রখ্যাত চিকিৎসক দেবী শেঠির মতে, ‘বিপুল সংখ্যায় শিশুরা আক্রান্ত হলে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দিক থেকে সত্যিই ভারত প্রস্তুত নয়। শেষ মুহূর্তে এসে সত্যিই আর কিছু করার নেই। দেশে শিশু চিকিৎসার জন্য আইসিইউ বেডের সংখ্যা খুবই কম। এর ফলে ভয়ংকর পরিণতি হতে পারে।’
এদিকে জরিপে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞদের বেশিরভাগের মতে, তৃতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রিত হলেও ৭০ শতাংশের মত তা অন্তত পরবর্তী এক বছর ধরে ভোগাবে ভারতকে। এই সময়টাতে দেশটির জনস্বাস্থ্য পড়তে পারে অন্যান্য রোগের ঝুঁকিতে।
মহারাষ্ট্র সরকারের করোনা টাস্কফোর্স মহামারীর ওপর করা একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন কর্র্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছে। এই সমীক্ষার ভিত্তিতে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে চিকিৎসক ও সরকারি কর্মকর্তাদের জরুরিভাবে প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময় রাজ্য সেভাবে প্রস্তুত ছিল না। তখন রাজ্যে যথাযথ সুযোগ-সুবিধাও ছিল না। দ্বিতীয় ঢেউ তাকে অনেক বেশি সাবধানী করে তুলেছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ যেভাবে রাজ্যে আছড়ে পড়েছে, তা থেকে তিনি যথেষ্ট শিক্ষা নিয়েছেন। সম্ভাব্য তৃতীয় ঢেউয়ে রাজ্যে কোনোমতে ওষুধ ও অক্সিজেনের ঘাটতি তিনি হতে দিতে চান না।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি ঢেউয়ের হাত থেকে শিশুদের কীভাবে রক্ষা করা যায়, তার জন্যও কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। কেন্দ্রের পাশাপাশি মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, দিল্লির মতো বেশ কয়েকটি রাজ্যও শিশুদের চিকিৎসা পরিকাঠামো উন্নয়নে জোর দিতে শুরু করেছে।
