মহামারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। করোনা রোগী হিসেবে শনাক্ত হয়েছে আরও ৩ হাজার ৫৭ জন। রাজধানী ঢাকা বাদ দিলে এই সব শনাক্ত ও মৃত্যুর বেশির ভাগই হয়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয়; বিশেষ করে খুলনা বিভাগের জেলাগুলোয় পরিস্থিতি ক্রমশই খারাপের দিকে যাচ্ছে। এই অঞ্চলে নতুন নতুন এলাকায় বিধিনিষেধ জারি করেও সংক্রমণে লাগাম টানা যায়নি। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে মৃত্যু ও রোগী শনাক্ত দুটোই ৫০ শতাংশের বেশি হারে বেড়েছে। এ অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য ও দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুসারে কয়েক দিনের ধারায় গত ২৪ ঘণ্টায় বেশি মৃত্যু হয়েছে খুলনা বিভাগে ২৪ জনের। তারপরই বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে ১৪ জনের। এর মধ্যে বেকল ফরিদপুরেই মারা গেছেন ৬ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ৮ জন করে মারা গেছেন। এ ছাড়া সিলেট বিভাগে এক ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
রোগী শনাক্তের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে শুক্রবার ঢাকার বাইরে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ৬২৫ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এরপর চট্টগ্রামে শনাক্ত হয়েছে ৪০১ জনের। রাজশাহীতে শনাক্ত হয়েছে ৩৪৫ জন। সিলেটে গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ৫৩, রংপুরে ১১৩, ময়মনসিংহে ৫৩ ও রবিশালে ৫৬ জন।
খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৪ মৃত্যু : খুলনা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়ে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়ায় সর্বোচ্চ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। একই সময়ে বিভাগে ৬২৫ জনের শরীরে করোনার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সুস্থ হয়েছেন আরও ১৯২ জন। গতকাল শনিবার দুপুরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক রাশেদা সুলতানা এসব তথ্য দিয়েছেন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের তথ্যমতে, ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়ার ৭, খুলনায় ৩, সাতক্ষীরায় ৪, যশোরে ৩, চুয়াডাঙ্গায় ২, মেহেরপুরে ২ ও ঝিনাইদহে একজন মৃত্যুবরণ করেছেন। এর আগে বৃহস্পতিবার বিভাগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৮ জনের মৃত্যু হয়। আর শুক্রবার বিভাগে ৮ জনের মৃত্যু হয়।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জেলাভিত্তিক করোনাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১৪৯ জন। বাগেরহাটে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৩ জন। সাতক্ষীরায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৫৬ জন। যশোরে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১৬৩ জন। ২৪ ঘণ্টায় নড়াইলে নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১৮ জন। মাগুরায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১০ জন। ঝিনাইদহে ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ২৪ জন। ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়ায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১১২ জন।
চুয়াডাঙ্গায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৭৬ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৫২৩ জন।
মেহেরপুরে নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১৪ জন। এ নিয়ে
খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল কর্মকর্তা (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. শেখ সাদিয়া মনোয়ারা ঊষা বলেন, মৃত্যু-আক্রান্তের সংখ্যায় পুরুষ এগিয়ে। খুলনায় আক্রান্তের সংখ্য ১৪৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৯৯ জন আর নারী ৫০ জন।
চট্টগ্রাম বিভাগে কমছে না সংক্রমণ : চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় কভিড শনাক্ত হয়েছে ৪০১ জনের, মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের। চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বেপরোয়া চলাফেরা এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনসমাগম করায় সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। এখনই জোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, না হলে হাসপাতালগুলোয় আবার চাপ বাড়বে, সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সর্বশেষ শনাক্ত ৪০১ জনের মধ্যে চট্টগ্রামে ১৫৭ ও নোয়াখালীতে ৯১, কক্সবাজারে ৪৬, বান্দরবানে ১, খাগড়াছড়িতে ১৫, ফেনীতে ২০, লক্ষ্মীপুরে ২, চাঁদপুরে ২২, কুমিল্লায় ২৭। তবে রাঙ্গামাটি জেলায় এদিন কোনো কভিড রোগী শনাক্ত হয়নি।
বিভাগে শনাক্তের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুও। গত এক সপ্তাহে বিভাগের ১১টি জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন মোট ৩৮ জন। এর মধ্যে ১৭ জনই চট্টগ্রাম জেলার।
চট্টগ্রাম জেলার সাবেক সিভিল সার্জন মুক্তিযোদ্ধা ডা. সরফরাজ খান বাবুল বলেন, এক জেলা থেকে আরেক জেলায় মানুষ যাচ্ছে-আসছে কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। এ ক্ষেত্রে উদাসীনতাও বেশি। বর্তমানে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের আধিক্য বাড়ছে আর এই ভ্যারিয়েন্ট যেহেতু দ্রুত ছাড়চ্ছে তাই সবার মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে চট্টগ্রাম বিভাগের সংক্রমণ পরিস্থিতি গত কয়েক দিনের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে রোগী শনাক্তের সংখ্যা অনুযায়ী, তবে তা সামগ্রিকভাবে অবস্থার উন্নতি নয় উল্লেখ করে চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত দুদিনের তুলনায় আজ কভিড রোগী কমছে, কিন্তু সংক্রমণ পরিস্থিতি ভালো বলা যাবে না।’
রামেক হাসপাতালে আরও ১০ মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সকালের মধ্যে তারা মারা যান। রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী এ তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, মৃত ১০ জনের মধ্যে ৩ জনের করোনা পজিটিভ ছিল। বাকিরা মারা যান উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। তাদের মধ্যে ৮ পুরুষ ও ২ জন নারী। মৃতদের মধ্যে রাজশাহীর ৫ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫ জন।
করোনা সংক্রমণ কমাতে রাজশাহী শহরে শনিবার নবম দিনের মতো বিশেষ লকডাউন চলছে; বিশেষ বিধিনিষেধে খানিকটা ঢিলেঢালা ভাব দেখা যাচ্ছে। শহরের বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান বন্ধ থাকলেও পাড়া-মহল্লার ছোট দোকানপাট খুলেছে। রাস্তায় রিকশা ও অটোরিকশার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।
রংপুরে আরও ৮ মৃত্যু : বিভাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রংপুরের ১, ঠাকুরগাঁওয়ের ৩ ও দিনাজপুরের ৪ জন রয়েছে। এ নিয়ে রংপুর বিভাগে করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৫২ জন। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. আবু জাকিরুল ইসলাম জানান, বিভাগটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় ১১৩ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। নতুন শনাক্তের মধ্যে রংপুরে ২০, পঞ্চগড়ে ২, নীলফামারীতে ৫, লালমনিরহাটে ৫, কুড়িগ্রামে ৩, ঠাকুরগাঁওয়ে ১১, দিনাজপুরে ৬৫ ও গাইবান্ধায় ২ জন রয়েছেন।
সিলেটে ৫০ নতুন রোগী : সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত ২৪ হাজার ৯৯ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন ৪৪৫ জন। গত শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবার সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক ডা. সুলতানা রাজিয়া জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে আরও ৫৩ জনের শরীরে। এ ছাড়া এই ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে হাসপাতালে ও বাড়িতে চিকিৎসাধীন আরও ৭২ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
এদিকে সিলেট বিভাগের চার জেলা মিলে ২৩২ জন করোনা আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। যাদের মধ্যে ২২০ জন সিলেট জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে, সুনামগঞ্জে ৪, হবিগঞ্জে ২ ও মৌলভীবাজারে ৬ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সিলেট বিভাগে আরও ২৫ জনকে নতুন করে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে।
ময়মনসিংহ বিভাগে ৫৩ জনের করোনা শনাক্ত : ময়মনসিংহ বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৫৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ময়মনসিংহ বিভাগে কারও মৃত্যু হয়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলায় ৩১০ জনের নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে ২৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শেরপুরে ৩ জনের মধ্যে ১ জনের করোনা শনাক্ত। নেত্রকোনায় ৩৭ জনের মধ্যে ৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে এবং জামালপুরে ৮৮ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২৪ জন শনাক্ত।
বরিশালে করোনার নতুন ৫০ রোগী : বরিশাল বিভাগে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি আবারও খারাপ হচ্ছে। বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় একজনের মৃত্যু হলেও একই সময়ে বিভাগে নতুন করে ৫০ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষার তুলনায় করোনা শনাক্তের হার ১৪ শতাংশের বেশি। তবে গত দুই দিন আগেও বিভাগে শনাক্তের হার ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৬ ভাগ।
ফরিদপুরে ৬ মৃত্যু : মহামারী করোনাভাইরাসে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে ফরিদপুরে। মৃত্যুর দিক দিয়ে এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ এটি। আর ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৭৯ জন।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, কিছু দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে নমুনা পরীক্ষার গড়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হারে বাড়ছে, হঠাৎ করে মৃত্যুর সংখ্যা আজ ছয় হলো; যা এক মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ।
