ঠিকাদার ‘দ্য বিল্ডার্সে’ ধরাশায়ী দক্ষিণ সিটি!

আপডেট : ২১ জুন ২০২১, ০১:৪১ এএম

নির্ধারিত সময় পার করে কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে রাজধানীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্ক ‘ওসমানী উদ্যান’ দীর্ঘ সাড়ে দিন বছর ধরে অবরুদ্ধ। পার্ক বন্ধ থাকায় নানা মহলের সমালোচনায় উঠে আসছে সিটি করপোরেশনের কথা। চাঁনখারপুলে সংস্থাটির একটি মার্কেট নির্মাণ কাজেরও একই অবস্থা। ইতিমধ্যে মার্কেটের বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে পুরো টাকাও আদায় করে নিয়েছে করপোরেশন। কিন্তু দোকান নির্মাণের কাজ বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রায় ১২০ কোটি টাকার এ দুটি প্রকল্পে ঠিকাদারির কাজ পায় ‘দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স লি.’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের মালিক বিতর্কিত ঠিকাদার জিকে শামীমের ব্যবসায়িক অংশীদার ফজলুল করীম চৌধুরী স্বপন। ফলে শামীম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গ্রেপ্তারের পর ঠিকাদার স্বপন কিছুটা চাপে পড়ে যান। এরই প্রভাব পড়ে ডিএসসিসির দুটি বড় প্রকল্পে। অবশেষে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী একটি বাতিল করে অপরটিও বাতিলের দাপ্তরিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। তবে এ বিষয়ে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা গণমাধ্যমে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাঁনখারপুল মার্কেটের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দুই বছর মেয়াদ বেঁধে দিয়ে তা শেষ করতে বলা হয় ২০১৯ সালের ১ অক্টোবরে। ১২ তলা ভিত্তির ওপর ৬ তলা ভবনে হবে ২৮১টি দোকান। ৬ তলা ভবন নির্মাণের জন্য ব্যয় ধরা হয় ২৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। প্রতিটি দোকানের দাম নির্ধারণ করা হয় আয়তনভেদে ১১ থেকে ১৩ লাখ টাকা। বরাদ্দ দেওয়ার বছরখানেকের মধ্যে দু’দফা কিস্তির মাধ্যমে ডিএসসিসি ৫ লাখ টাকা করে আদায়ও করেছে। সেই হিসেবে বরাদ্দগ্রহীতাদের কাছ থেকে করপোরেশনের টাকা আদায়ের পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি। এরপর করোনার মধ্যেই আরও দুই কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে চিঠি দেয় কর্তৃপক্ষ। বরাদ্দগ্রহীতারা আবারও দুই কিস্তির মাধ্যমে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা করে জমা দেয়। সব মিলিয়ে বরাদ্দগ্রহীতাদের ওপর ধার্য করা সব টাকা আদায় করেছে ডিএসসিসি। কিন্তু দোকান বুঝিয়ে দেওয়ার কোনো লক্ষণই নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতিমধ্যে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজের বিপরীতে করপোরেশন থেকে বিপুল পরিমাণ টাকাও নিয়ে গেছে।

প্রকল্প সূত্রে আরও জানা যায়, প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে টিন আর কংক্রিটে আবদ্ধ রাজধানীর ওসমানী উদ্যান। সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করে সেখানে চলছে উন্নয়ন কর্মকা-। গাছপালায় আচ্ছাদিত এ পার্কে রয়েছে দুটি জলাশয়ও। এখানে ‘গোস্বা নিবারণী পার্ক’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জলাশয় সংস্কার, স্বাধীনতা চত্বর, পাঠাগার, নগর জাদুঘর ও শিশু কর্নার নির্মাণ ও সাউন্ড সিস্টেম যোগ, ওয়াইফাই জোন প্রতিষ্ঠা, টেবিল টেনিস, বিলিয়ার্ডসহ বিভিন্ন ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা, ফুড কর্নার, এটিএম বুথ বসানোর মতো বিষয় যুক্ত আছে পরিকল্পনায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রকৌশলী জানান, এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ৯০ কোটি টাকা ধরা হলেও সংশ্লিষ্ট নকশা প্রণেতা স্থপতি রফিক আজম আরও বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করেন। ফলে প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে জিকে শামীম গ্রেপ্তার হলে পুরো বিষয়টির মোড় ঘুরে যায়। ঠিকাদার স্বপন শামীমের সঙ্গে বন্দরবান রিসোর্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেন। ফলে শামীমের ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবেও তার (স্বপন) প্রায় সব কাজে স্থবিরতা নেমে আসে। ফলে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া কাজটি পরবর্তী বছর দেড়েকের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা আর হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পিপিআর অনুযায়ী একটানা ৩০ দিন কাজ বন্ধ থাকলে ঠিকাদারকে চিঠি দেওয়া হয়। এরপরও কাজ শুরু না করলে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে ত্রিপক্ষীয় পরিমাপ করতে হয়। সেখানে মূলত ঠিকাদার কাজের কী পরিমাণ অর্থ পাবে তা নির্ধারণ হয়। এরপর তা বাতিল করা হয়। ঠিকাদার কাজের শুরুতেই চুক্তিকালীন নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প দাখিল করেন। সেখানে অঙ্গীকারনামায় নির্ধারিত সময়ে শতভাগ কাজ শেষ করার অঙ্গীকার করেন। উল্লিখিত সময়ে কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে কর্তৃপক্ষ দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী তা বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে। সেখানে অবশিষ্ট কাজের যে পরিমাণ ব্যয় বাড়বে সেই দায়দায়িত্বও ঠিকাদারের ওপর বর্তাবে।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ‘দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স লি.’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল করীম চৌধুরী স্বপনের ব্যক্তিগত মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত