সনাতন ধারার দু’টি ব্যাংক পূর্ণাঙ্গভাবে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে রূপান্তর হওয়ায় ইসলামিক ব্যাংকগুলোর সংগৃহীত আমানতের অংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতের আমানতের ২৭ শতাংশের বেশি ইসলামিক ব্যাংকগুলোর দখলে ছিল। ডিসেম্বর শেষে মোট আমানতে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল ২৫.৩৩ শতাংশ।
গত মার্চ শেষে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। একই সময়ে গোটা ব্যাংক খাতের সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ২৭.৫৪ শতাংশ ছিল ইসলামিক ব্যাংকগুলোর হাতে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক পূর্ণাঙ্গরূপে ইসলামিক ব্যাংকিং চালু করে। এক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের নাম অপরিবর্তিত থাকলেও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক রাখা হয়।
এছাড়া আগে থেকেই পূর্ণাঙ্গরূপে ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা দিয়ে আসছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি. , সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।
নতুন করে দু’টি ব্যাংক এ খাতে যুক্ত হওয়ায় গত ডিসেম্বরের তুলনায় মার্চে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর আমানত ৩০ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা বা ৯.৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায়, আলোচিত সময়ে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বা বিনিয়োগ ২৮ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা বা ৯.৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। গত মার্চ শেষে গোটা ব্যাংক খাতের ঋণ বা বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৬৩ হাজার ২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণ বা বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ২২ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ২৭.৭২ শতাংশ।
আলোচিত সময়ে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর রেমিট্যান্স বিতরণের অনুপাত কমেছে। গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা রেমিট্যান্সের মধ্যে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল ৪০.৫১ শতাংশ। গত মার্চ শেষে রেমিট্যান্স বিতরণে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর অংশ কমে ৩৩ শতাংশে নেমে আসে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক রেমিট্যান্স দেশে আনে ইসলামিক ব্যাংকগুলো। যা এর আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। এ খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সব ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি. একাই ৮২ শতাংশ রেমিট্যান্স বিতরণ করে। এর পরেই আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, প্রায় ৫ শতাংশ রেমিট্যান্স বিতরণ করে ব্যাংকটি।
প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায়, গত ডিসেম্বরের তুলনায় মার্চে ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্যের মধ্যে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্যের অনুপাত ১৪.৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫.৩৫ শতাংশে উত্তীর্ণ হয়।
বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা দেওয়া ১০টি ব্যাংকের শাখার সংখ্যা ১ হাজার ৫৫৮টি। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ইসলামিক ব্যাংকিং শাখার সংখ্যা ১৯টি এবং ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে ১৭৮টি শাখায়। অর্থাৎ মোট ১ হাজার ৭৫৫টি ব্যাংক শাখা থেকে ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন গ্রাহকরা। গত ডিসেম্বরে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫২৮টি।
প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায়, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমানত ও বিনিয়োগ ছিল ইসলামী ব্যাংকের হাতে। এই ব্যাংকটির আমানতের অংশ ছিল ৩৪ শতাংশ এবং বিনিয়োগের অংশ ছিল ৩১ শতাংশ।
ইসলামিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ ছিল সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪১ শতাংশ। শিল্প খাতের চলতি মূলধন ঋণ ছিল ২৪ শতাংশ। বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতে বিনিয়োগ ছিল ১২ শতাংশ। নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ ছিল ৮ শতাংশের বেশি। কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৬ শতাংশ।
প্রসঙ্গত, ইসলামিক ব্যাংকগুলো সুদভিত্তিক লেনদেন না করায় এ খাতের ব্যাংকগুলো ঋণকে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে। এক্ষেত্রে মুনাফা বা লোকসানের ভিত্তিতে এই বিনিয়োগের হার নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামিক ব্যাংকগুলো কৃষি খাতে উল্লেখযোগ্য হারে বিনিয়োগ করলেও সম্প্রতি এই বিনিয়োগ কমেছে । গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর কৃষি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা। যা এর আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় ৩১ কোটি টাকা কম। আলোচিত ত্রৈমাসিকে ব্যাংক খাতের বিতরণ করা কৃষিঋণের মধ্যে ১৮ শতাংশ ছিল ইসলামিক ব্যাংকগুলোর।
