শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, কোচিং ব্যবসা রমরমা

আপডেট : ২৩ জুন ২০২১, ১১:৫২ পিএম

শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে যাতে ব্যাপকহারে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে না পড়ে এমন যুক্তিতে টানা ১৫ মাস স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রেখেছে সরকার। যদিও বিশে^র সর্বাধিক করোনা আক্তান্ত ও মৃত্যুর দেশগুলো অতিগুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা কৌশলে সরাসরি চালু রেখেছে। তবে বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানে যেতে না পারলেও কোচিং ও প্রাইভেট সেন্টারে ঠিকই গাদাগাদি করে যাচ্ছে; বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় এই চিত্র প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশের তোয়াক্কা নেই কারও। কারণ হিসেবে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা বলেছেন, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বাঁচাতে আপাতত এ পথে না গিয়ে উপায় নেই।

২২ জুন ঢাকার বাসাবো, বালুরমাঠ, খিলগাঁও, তিলপাপাড়া ও মধুবাগ এলাকায় বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদক। জানা যায়, এসব এলাকায় সকাল-সন্ধ্যা কোচিং ও প্রাইভেট সেন্টারে পড়াশোনা চলছে। এক একটি সেন্টারে ৩ থেকে ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী দৈনিক পড়াশোনা করছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিভাবকদের আনাগোনাও নিয়মিত। কোচিং সেন্টারকে কেন্দ্র করে চটপটি-ফুসকার দোকানে ভর্তি ফুটপাত। ভেতরে সন্তানদের পাঠিয়ে অভিভাবকদের সময় কাটছে ফুসকা-চটপটির দোকানে।

করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পাশাপাশি কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট সেন্টারে পড়ানো বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ সময় থেকে অনলাইনে কোচিং ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল সেন্টারগুলো। তবে গত বছরের শেষ দিকে করোনা সংক্রমণ কিছুটা কমলে সশরীরে ক্লাস নেওয়া শুরু হয়। এরপর চলতি বছরের এপ্রিলে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে আবারও কোচিং ব্যবসা বন্ধে কড়াকড়ি ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী। তবে সেটি তেমন কাজে আসেনি।

বাসাবো বালুর মাঠ এলাকায় অক্সফোর্ড টিচিং হোম কোচিং সেন্টারে সকাল ৯টা থেকে সন্ধা ৭টা পর্যন্ত চতুর্থ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০০-এর বেশি। শুধু পাঠ কার্যক্রমই নয়, নিয়মিত পরীক্ষায় অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার গৌরাঙ্গ দত্ত বলেন, উপায় কী বলেন! সবাই তো নিরুপায়। আমাদের চেয়ে অভিভাবকদের চাপ বেশি। কারণ বাচ্চারা বিপথে যাচ্ছে। হতাশ হয়ে কেউ কেউ আত্মহত্যা করছে। কোচিং সেন্টারে এলে অন্তত পড়ার মধ্যে থাকছে।

জানা যায়, কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের করোনা সংক্রমণ হলে সে দায় এড়াতে অভিভাবকদের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিয়েছে সেন্টারগুলো। এ রকম কয়েকটি অনুমতিপত্র লেখা রয়েছে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে যত দ্রুত সম্ভব সরাসরি পাঠদানের জন্য অনুরোধ ও সম্মতি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস নামে একজন অভিভাবক বলেন, বন্ধুবান্ধব, ক্লাসরুম ও বাইরের জগৎ থেকে বাচ্চাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখলে যে ফল ভালো হয় না, তার প্রমাণ আমার বাচ্চাটা। ওর মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ। বাধ্য হয়ে আমি ওকে কোচিংয়ে দিয়েছি। হাট, ঘাট, মেলা, উৎসব সবই চলছে কিন্তু সব করোনা ধরেছে স্কুল-কলেজে, এটা কেমন কথা!

করোনায় টানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। সর্বশেষ বাংলাদেশের শিক্ষা ও শিশু রক্ষা আন্দোলনের হিসাব অনুযায়ী, এরই মধ্যে হতাশায় সারা দেশে ১৫১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। তাদের হিসাবে বিশ্বের সর্বোচ করোনা সংক্রমিত ও মৃত্যুতে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ইরান, সুইডেন, বেলজিয়াম ও পর্তুগাল কয়েক সপ্তাহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে গত বছরই তা চালু করেছে। প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানেও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি সংক্রমণ হয়েছে করোনায়। এরপরও ভারত গত বছরের অক্টোবরে, পাকিস্তান সেপ্টেম্বরে স্কুল-কলেজ খুলে দেয়। তবে দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা প্রবলভাবে শুরু হলে ভারতে বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সামনে জুলাই থেকে খুলে দেওয়ার কথা। পাকিস্তান গত মে মাস থেকে চালু করেছে।

বিশে^র মাঝারি আক্রান্ত দেশগুলোও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রেখেছে। তবে বাংলাদেশ, সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশ বিশে^র সর্বোচ্চ রেকর্ড সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে। শিক্ষার্থীরা জানায়, পড়াশোনা, খেলাধুলা ছাড়া তাদের তেমন কাজ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ছুটিও আনন্দের। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় শ্রেণিকক্ষে যাওয়া হবে না, এটা অভাবনীয়। পড়াশোনা নিয়মিত রাখতে কোচিং সেন্টারে যেতে তারা বাধ্য হচ্ছে।

একজন শিক্ষার্থী বলে, করোনা মহামারীর প্রথম দিন থেকেই কোচিং ও প্রাইভেট পড়া চালিয়ে যাচ্ছি। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সিয়াম বলে, কলেজে ক্লাস করার সৌভাগ্য হয়নি আমার। এ কারণে স্যারদের সঙ্গেও যোগাযোগ কম। তবে প্রতিদিনই ১০-১২ জন ব্যাচ আকারে প্রাইভেট পড়ছে সিয়াম। সিয়াম বলে, প্রথমে কোচিংয়ে পড়লেও শিক্ষকরা কোচিং বাদ দিয়ে নিজের বাসায় ব্যাচ আকারে পড়ানো শুরু করেছেন। উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়ন করায় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিত বিষয়ে প্রতিদিন একাধিক শিক্ষকের বাড়িতে আমাদের যেতে হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত