আ.লীগ নেতার বিরুদ্ধে ২০ হাজার গাছ কাটার অভিযোগ

আপডেট : ২৪ জুন ২০২১, ০২:০৫ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৫ জুন মুজিব আদর্শের অনুসারী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অন্তত তিনটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানালেও মৌলভীবাজারের এক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে ২০ হাজার গাছ কাটার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার নাম হেলাল উদ্দিন। তিনি বড়লেখা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

কাটা গাছগুলো জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থায়নে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে এবং একাধিক এনজিওর সহযোগিতায় বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর রোপণ করেছিল।

অভিযোগ রয়েছে, হাকালুকি হাওরের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) বিল ইজারা নিয়ে সেখানে আসা-যাওয়ার রাস্তা ও বাঁধ তৈরি করতে ২০ হাজার হিজল-করচগাছ কেটে ফেলেন আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল উদ্দিন। ছোট ছোট গাছ কেটে ট্রাক্টরের মাধ্যমে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই গাছগুলো ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ এবং ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সময়ে লাগানো হয়েছিল।

গাছ কাটার ঘটনায় সম্প্রতি হাকালুকি ইসিএ ব্যবস্থাপনা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সদস্য ও জলজ বনের পাহারাদার মো. আবদুল মনাফ বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়, গত ২৭ মে থেকে ইজারাদারের লোকজন বাঁধ নির্মাণের নামে বিলের পাড়সহ ১২ বিঘা জমির প্রায় ২০ হাজার গাছ অবৈধভাবে কেটে ফেলে। এরপর তারা সেখানে ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করে গাছগুলো মাটিতে মিশিয়ে দেয়। এতে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

অভিযোগের অনুলিপি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসককে দেওয়া হয়েছে। তবে গাছ নিধনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো আইনি পদক্ষেপ নেননি সংশ্লিষ্টরা। এতে হাওরপাড়ের সাধারণ মানুষ ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি তদন্ত করে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

আবদুল মনাফের দেওয়া অভিযোগ ও এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাকালুকি হাওরের অন্তর্ভুক্ত বড়লেখা উপজেলার অধীনে মালাম বিলের (মৎস্য জলাশয়) আয়তন ৪২৮.৯২ একর। ১৪২৭ বাংলা সন থেকে ১৪৩২ বাংলা সন পর্যন্ত সময়ের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ২১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৪৩ টাকায় মালাম বিলটি খাতাকলমে ইজারা নিয়েছে বড়লেখা উপজেলার মনাদি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। বিল ইজারা নেওয়ার জন্য মনাদি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নাম ব্যবহার করা হলেও মূল সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল উদ্দিন।

এ প্রসঙ্গে মনাদি মৎস্যজীবী সমিতির পরিচালক জয়নাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জলমহাল ইজারায় শুধু মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নাম ব্যবহার করা হয় তা সবাই জানে, প্রভাবশালীরা বিনিয়োগ করেন। এখানে প্রফেসর বিনিয়োগ করেছেন।’ জয়নাল তার বক্তব্যে প্রফেসর বলতে হেলাল উদ্দিনকে বুঝিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল উদ্দিন বড়লেখা নারী শিক্ষা একাডেমির অধ্যক্ষ।

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলীর বক্তব্যেও উঠে এসেছে হেলাল উদ্দিনের নাম। গাছ নিধনের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়টি জানার পর আমরা তদন্ত করছি। যেহেতু অভিযোগ পেয়েছি, আশপাশের ইজারাদাররা এ কাজ করেছে, সেই হিসেবে এর পাশের ইজারাদার হেলাল উদ্দিনকে আমরা ডেকেছিলাম। উনি তদন্তে সহযোগিতা করবেন বলেছেন। সেই সঙ্গে উনি নিজ থেকেই বলেছেন পাঁচ হাজার গাছের চারা কিনে দেবেন। তবে আমরা তদন্তের আগে কাউকে অভিযুক্ত করতে পারছি না।’

সব অভিযোগ খারিজ করে দিয়ে হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘আমি পাঁচ-ছয় বছর আগে বিল ইজারার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, এখন আর নেই। গাছ কেটেছে আশপাশের মানুষ, আমার সংশ্লিষ্টতা নেই।’

গাছ নিধন না করে থাকলে কেন নিজ থেকে পাঁচ হাজার গাছের চারা দেওয়ার কথা ইউএনওকে বলেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে হেলাল বলেন, ‘আমি ইউএনও অফিসে উপস্থিত ছিলাম, সে সময় অভিযুক্তদের বলি তুমরা গাছ লাগিয়ে দিয়ো। এর বাইরে আর কিছু বলিনি।’

হাকালুকি হাওরে ২০০৬ সাল থেকে হিজল-করচ বনায়নে কাজ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) সিএনআরএফ। প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন কো-অর্ডিনেটর তৌহিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হিজল-করচগাছ খুব ধীরে ধীরে বড় হয়। যার কারণে একটি গাছ রোপণ করার পর থেকে তা বড় করে তোলা পর্যন্ত গড়ে ৩ হাজার টাকা খরচ হয়।’

পরিবেশ অধিপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ইবিএ প্রজেক্টের অ্যাডমিন অ্যান্ড ফাইনান্স অফিসার (এএফও) সাহিদ আল শাহিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের প্রকল্পের মাধ্যমে ইসিএভুক্ত মালাম বিল এলাকায় প্রায় ৭০ একর জায়গায় হিজল-করচসহ পরিবেশবান্ধব গাছ লাগানো হয়েছিল। গাছগুলো অনেক বড় হয়েছিল। গাছ নিধনের ঘটনায় পাহারাদার থানায় ও ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ইসিএভুক্ত এলাকায় সরকারি অনুমোদিত প্রকল্প ব্যতীত গাছ কাটা, খনন, স্থাপনা নির্মাণ, পাখি শিকার ইত্যাদি বেআইনি। গাছগুলো কাটায় হাওরের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’

হাওরের গাছ নিধনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আব্দুল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিবেশমন্ত্রীর নিজ উপজেলায় এতগুলো গাছ কাটার খবর হতাশার। এভাবে গাছ কেটে ফেলা ও তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাঁচ হাজার চারা দেওয়া হাস্যকর। কারণ একটি চারার দাম হয়তো ২০-২৫ টাকা, কিন্তু একটি গাছকে চার-পাঁচ ফুট করে বড় করে তুলতে খরচ হয় তিন-চার হাজার টাকা এবং সময় লাগে কয়েক বছর।’

হাকালুকি হাওরের বিপুল পরিমাণ গাছ নিধনের খবরে ক্ষোভ ও হতাশার কথা জানিয়ে প্রাণ ও প্রতিবেশবিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুনিয়ার সবচেয়ে বড় হাওরের ২০ হাজার হিজল-করচ, বরুণগাছ কেটে ফেলা ভয়ংকর পরিবেশ সংকট তৈরি করবে। এতে মালাম বিলের জলজ বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্যশৃঙ্খলা বিনষ্ট হবে। হিজল, করচ, বরুণগাছ হাওরের মাছ, পাখি ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। হাওরবাসীর আশ্রয়স্থল এই গাছ। মাছের খাদ্য তৈরি হয় হিজলগাছে। পবিত্র গাছ হিসেবে এসব গাছের নিচে গড়ে ওঠে হিজলবাগ করচবাগ। এসব গাছ হাওরে ধানের আবাদকেও সহায়তা করে। অনেক ঔষধি গাছ হিসেবে ব্যবহার আছে এই সব জলাবৃক্ষের।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি ইসিএ এলাকার এত গাছ কেটে ফেলা হলো! হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড, বন বিভাগ, প্রশাসন কী করল? এক দিনে তো এত গাছ কাটা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী যেখানে সুন্দরবন বাড়ানোর উদোগ নিয়েছেন, সেখানে দেশের সবচেয়ে বড় হাওরের গাছ কেটে ফেলা অন্যায়। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যত দ্রুত পারা যায় মালাম বিলে আবারও হিজল, করচ, বরুণ লাগানো ও সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষদের যুক্ত করতে হবে।’

হাকালুকি হাওরের গাছ নিধনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (প্রকৃতি ও বণ্য প্রাণী সংরক্ষণ বিভাগ) রেজাউল করিম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জায়গাটি পরিবেশ অধিপ্তরের অধীনে। তাই ঘটনা জেনেও আমরা কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পরিনি। তবে ঘটনাটি জানার সঙ্গে সঙ্গে আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানিয়েছি। আমরা মৌখিকভাবে যে অভিযোগ পেয়েছি তাতে স্থানীয় একজন প্রিন্সিপাল হেলাল উদ্দিনের নাম উঠে এসেছে, যদিও আমরা তা যাচাই করিনি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত