বহুপাক্ষিক বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত

পণ্য ডেলিভারির পর টাকা পাবে ইভ্যালিসহ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান

আপডেট : ২৫ জুন ২০২১, ০২:০৪ এএম

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধের নতুন একটি ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গতকাল বৃহস্পতিবার ইভ্যালি ডটকম লিমিটেডের ওপর পরিচালিত পরিদর্শন প্রতিবেদন নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বহুপাক্ষিক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এছাড়া গতকাল আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক বৈঠকে ইভ্যালিসহ অন্যান্য অনলাইন প্রতিষ্ঠানে পণ্য কেনাবেচা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও। এ সময় সব ই-কমার্স সাইটের পণ্য কেনাবেচা তদারকির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাফিজুর রহমান বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, গ্রাহক পণ্য বুঝে পাওয়ার পর ডেলিভারি মেসেজ দিলে বিক্রেতা মূল্য পাবেন। আর এ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গেটওয়ের মাধ্যমে এ অর্থ লেনদেন হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের পরামর্শ, গ্রাহকরা যেন ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ বা নগদের মতো ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে কেনাকাটা করেন। গ্রাহকরা যেন আগাম নগদ অর্থ পরিশোধ না করেন।

বৈঠকের পর ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন ই-ক্যাবের সভাপতি শমী কায়সার বলেন, ‘একটি-দুটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ই-কমার্স খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এটা কারও কাম্য নয়। ভোক্তা ও বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থের জন্য এ খাতে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা পরিচালন নির্দেশিকা দরকার। এছাড়া পেমেন্টের নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি প্রয়োজন। নীতিমালা হওয়ার পর ডিজিটাল কমার্স আইনের দিকেও যেতে হবে।’ বৈঠকের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ রাসেল এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো ই-কমার্স নীতিমালা নেই। এ ধরনের নীতিমালার জন্য ইভ্যালিও দীর্ঘদিন অনুরোধ জানিয়ে আসছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত এ খাতের নীতিমালা প্রণয়নের প্রথম ধাপ বলেই আমরা বিশ্বাস করি। এর ফলে গ্রাহক, মার্চেন্ট, মার্কেটপ্লেসসহ পুরো ইকো-সিস্টেমই উপকৃত হবে।’

সম্প্রতি ইভ্যালিকে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এ বৈঠকের আয়োজন করে। ওই পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, ইভ্যালি বিপুল ছাড় দিয়ে লোকসানে পণ্য বিক্রি করছে। যে কারণে দেশের ই-কমার্স ব্যবসায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে ভালো ও সৎ ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং ভবিষ্যতে এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হবে।

এ সংবাদ প্রকাশের পর ইভ্যালিসহ ১০টি ই-কমার্স সাইট থেকে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রি-পেইড কার্ড ব্যবহার করে কেনাকাটা স্থগিত করেছে ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড, ব্যাংক এশিয়া এবং ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ইভ্যালি, আলেশা মার্ট, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং, সিরাজগঞ্জ শপিং, আলাদিনের প্রদীপ, বুম বুম, কিউকম, আদিয়ান মার্ট এবং নিডস ডটকম বিডি।

গতকাল গ্রাহকদের মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে ঢাকা ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকের কার্ডধারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে কিছুসংখ্যক অনলাইন মার্চেন্টে পরবর্তী নোটিস না দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের কার্ড লেনদেন বন্ধ থাকবে। এর আগে ব্যাংক এশিয়াও একই ধরনের স্থগিতাদেশ দেয়।

জানতে চাইলে ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমরানুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কার্ডের গ্রাহক ব্যাংকের গ্রাহক। এদের স্বার্থ আমাদেরই দেখতে হবে। অনলাইন শপিং সাইটগুলো বড় অঙ্কের ছাড়ে পণ্য বিক্রির অফার দিয়ে কার্ডের মাধ্যমে অগ্রিম মূল্য গ্রহণ করছে। তবে সময়মতো পণ্য ডেলিভারি করছে না। এতে আমাদের কার্ডের গ্রাহকরা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন। এ নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় সাময়িকভাবে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।’ এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নির্দেশনা পেলে সেই অনুযায়ী কার্ডের লেনদেন আবার চালু করা হবে বলে জানান তিনি।

এছাড়া গত মঙ্গলবার সিটি ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষও নোটিস দিয়ে জানায়, আমেরিকান এক্সপ্রেস (অ্যামেক্স) কার্ড ব্যবহার করে অনলাইন কেনাকাটা করে কেউ প্রতারণার শিকার হলে তার দায়ভার সিটি ব্যাংক নেবে না।

এদিকে অনেক ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি কার্ডে লেনদেন বন্ধ না করলেও গ্রাহকদের ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইটে লেনদেন করার বিষয়ে সতর্ক করে বার্তা পাঠাচ্ছে। সম্প্রতি গ্রাহকদের এ ধরনের সতর্কবার্তা পাঠায় ইউসিবি, সিটি ব্যাংক এবং লংকাবাংলা ফাইন্যান্স।

লংকাবাংলা ফাইন্যান্স গ্রাহকদের বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছে, লংকাবাংলার ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে কোনো লেনদেন করলে তার দায়ভার প্রতিষ্ঠানটি বহন করবে না।

ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ইভ্যালি লিমিটেডের ওপর পরিচালিত পরিদর্শনে বাংলাদেশ ব্যাংক দেখতে পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের তুলনায় দেনা ছয় গুণ। প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের বড় ধরনের ছাড়ে পণ্য বিক্রির কথা বলে আগাম টাকা নিচ্ছে যা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইভ্যালি চলতি বছর ১৪ মার্চ পর্যন্ত পণ্যমূল্য বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম ২১৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা নিয়ে কোনো পণ্য সরবরাহ করেনি। অন্যদিকে তারা যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পণ্য কেনে, তাদের কাছে ইভ্যালির বকেয়া ১৮৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ইভ্যালির চলতি সম্পদ দিয়ে গ্রাহক ও পাওনাদারদের বকেয়া অর্থের মাত্র ১৬ দশমিক ১৪ শতাংশ পরিশোধ করা সম্ভব। বাকি প্রায় ৮৪ শতাংশ বা ৩৩৮ কোটি ৬২ লাখ টাকার সমপরিমাণ দায় অপরিশোধিত থেকে যাবে। ইভ্যালির চলতি সম্পদের স্থিতি দিয়ে শুধু গ্রাহক দায়ের এক-তৃতীয়াংশেরও কম পরিশোধ করা সম্ভব হবে।

২০২০ সালের জুলাই থেকে চলতি বছর ১৪ মার্চ পর্যন্ত ইভ্যালির মোট আয় (রেভিনিউ) ২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির বিক্রয় ব্যয় হয়েছে ২০৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, কোম্পানিটি প্রতি ১ টাকা আয়ের জন্য ৩ টাকা ৫৭ পয়সা ব্যয় করেছে বলে স্টেটমেন্টে দেখিয়েছে এবং এই অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকরা পাননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত