নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য শহীদুল ইসলাম বকুলের বাড়িতে লালপুর উপজেলা সরকারি খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে আটকে রেখে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে ৮ লাখ টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় লালপুরের গোপালপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ সাংসদের তিন অনুসারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন খাদ্য কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংসদের বাগাতিপাড়ার বাড়িতে ওই ঘটনার পর গতকাল শুক্রবার ভোরে থানায় মামলা করেন তিনি। পুলিশ ইতিমধ্যে এজাহারভুক্ত দুই আসামি রাসেল ও কালামকে গ্রেপ্তার করেছে।
এদিকে সাংসদের দুই অনুসারী গ্রেপ্তার হওয়ার পর গতকাল বিকেলে মামলার বাদী খাদ্য কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের বাসায় অভিযান চালিয়ে ২০০ বস্তা সরকারি গম উদ্ধার দেখানো হয়েছে।
খাদ্য কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে গোপালপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রোকনুল ইসলাম নিজেকে সাংসদ শহিদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠজন পরিচয় দিয়ে রফিকুল ইসলামকে ফোন করে বাগাতিপাড়ায় সাংসদের বাড়িতে আসতে বলেন। তার কথামতো তিনি দুপুর দেড়টায় সাংসদের বাড়ির অতিথিকক্ষে পৌঁছান। সেখানে ১০ মিনিট কথা বলার পর সাংসদ ওই কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। ওই কক্ষে আগে থেকেই সাংসদের সঙ্গে রোকনুল এবং রাসেল ও কালাম নামে দুই যুবক বসেছিলেন। সাংসদ চলে যাওয়ার পর রফিকুল ওই কক্ষ থেকে বের হয়ে আসতে চাইলে রাসেল বাইরে থেকে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দেন। তখন কালাম রফিকুলের পেটে পিস্তল ঠেকিয়ে ওই কক্ষে বসে থাকতে বাধ্য করেন। সাড়ে চার ঘণ্টা আটকে রাখার পর একটা সাদা কাগজে তাকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। রাসেলের কাছ থেকে তিনি ৮ লাখ টাকা ধার নিয়েছেন এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যে ওই টাকা পরিশোধ করবেন এমন সব কথা লেখা ছিল ওই কাগজে। কাগজে স্বাক্ষর করার পর রফিকুল ইসলামকে সাংসদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে রোকনুল ইসলাম তাকে ফোন করে বলেন, ‘লেনদেনটা সেরে ফেলেন, কখন দেবেন?’ এমন পরিস্থিতিতে রাত ১০টার দিকে রফিকুল ইসলাম লালপুর থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দিতে যান। থানার ওসি দীর্ঘ সময় ধরে তার কাছে পুরো ঘটনা শোনেন। তবে ঘটনাস্থল (সাংসদের বাড়ি) বাগাতিপাড়া থানা এলাকায় হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি অভিযোগটি জমা নেননি।
পরে বিষয়টি জেলার পুলিশ সুপারকে জানান রফিকুল। পুলিশ সুপারের নির্দেশে গতকাল ভোর ৪টায় রফিকুলকে তার বাসা থেকে বাগাতিপাড়া থানায় নিয়ে গিয়ে লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়। এরপর জেলা পুলিশের নির্দেশে লালপুর থানা পুলিশ এজাহারভুক্ত রাসেল ও কালামকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। আটক রাসেল লালপুরের চংধুপইল ইউনিয়নের গোয়ালপাড়া গ্রামের এবং কালাম গোপালপুর পৌরসভার বিজয়পুর গ্রামের বাসিন্দা।
গতকাল বাগাতিপাড়া মডেল থানার ওসি সিরাজুল ইসলামের কাছে খাদ্য কর্মকর্তার করা মামলায় দুজনকে আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ সংক্রান্ত কিছু জানেন না বলে উল্লেখ করেন। তবে নাটোর গোয়েন্দা পুলিশের ওসি শফিকুল ইসলাম রাসেল ও কালামকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আটক দুজন খাদ্য কর্মকর্তার করা মামলার প্রধান আসামি আওয়ামী লীগ নেতা রোকনুলের সহযোগী বলে জানা গেছে।
সংসদ সদস্য শহীদুল ইসলাম বকুল তার বাড়িতে খাদ্য কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে আটকে রেখে অস্ত্রের মুখে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই কর্মকর্তা আমার বাড়ি আসার পর কথা বলে চলে গেছেন। আমার বাড়িতে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। সব মিথ্যা অভিযোগ।’
এদিকে সাংসদ বকুলের দুই অনুসারী গ্রেপ্তার হওয়ার পর গতকাল বিকেলে খাদ্য কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের বাসায় অভিযান চালিয়ে ২০০ বস্তা সরকারি গম উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন লালপুরের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাম্মী আক্তার। তার দেওয়া তথ্যমতে, তিনি এবং নাটোর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রবীন্দ্রলাল চাকমার উপস্থিতিতে উদ্ধার করা গম খাদ্যগুদামে স্থানান্তর করা হয়।
শাম্মী আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গোপালপুর সরকারি খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম ২০০ বস্তা সরকারি গম নিজের বাসায় সরিয়ে রেখেছেন এমন খবর পাওয়ার পর আজ (গতকাল শুক্রবার) বিকেলে অভিযান চালিয়ে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। পরে গমের বস্তাগুলো পুনরায় গোডাউনে মজুদ করা হয়।’
কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে নিজের বাসায় গম রাখার ঘটনায় খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রবীন্দ্রলাল চাকমা।
এর আগেও সাংসদ বকুলের কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধে বাগাতিপাড়া থানার একজন এসআইকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে মামলা হয়েছিল। পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করেছিল। তখনো সাংসদ ওই ঘটনাটিকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছিলেন।
সবশেষ গত মে মাসে সাংসদ বকুলের এক ভাগ্নে নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হানকে তার কার্যালয়ে মারধর করে রক্তাক্ত করেন বলে অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় সদর থানায় মামলা হলে পুলিশ সাংসদের ওই ভাগ্নেকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।
