করোনাযুদ্ধে রাজার নেতৃত্ব

আপডেট : ২৬ জুন ২০২১, ০২:২৫ এএম

টানা ১৪ মাস ধরে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিল ওয়াংচুক কখনো হেঁটে, কখনো গাড়িতে কিংবা কোথাও কোথাও ঘোড়ায় চেপে দেশের এ মাথা-ও মাথা চষে বেড়াচ্ছেন। জঙ্গল ও পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে নাগরিকদের কভিড মোকাবেলায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করছেন। ৪১ বছর বয়সী রাজার এ পরিশ্রম যে বৃথা যায়নি তা সেখানকার পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে। চীন আর ভারতের মাঝে থাকা ৭ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে ২ হাজার ৬ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে মাত্র একজনের।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী ভারতকে দুমড়ে মুচড়ে দেওয়া করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে ৭ লাখের মতো জনসংখ্যার দেশটিকে রক্ষায় কর্র্তৃপক্ষ যেসব নির্দেশনা দিয়েছে তার বাস্তবায়ন ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণে মাথায় বেসবল ক্যাপ, পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সঙ্গে পিঠে ঝোলানোর ব্যাগ নিয়ে ভুটানের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে এসে রাজধানীর একটি হোটেলে নিয়ম মেনে কোয়ারেন্টাইনেও থাকছেন তিনি।

দুর্গম এলাকাগুলোতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া কর্মীদের ধন্যবাদ দিতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতেও ভুটানের রাজা পাঁচ দিন পাহাড়ি পথে হেঁটেছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স। রাজার এই পদক্ষেপের বিষয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং বলেন, জনগণকে মহামারী নিয়ে সতর্ক করতে রাজা যখন মাইলের পর মাইল সফর করছেন, দরজায় কড়া নাড়ছেন; তখন মানুষও তার কথা গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছেন। জনগণের জন্য নির্দেশনা জারি করার তুলনায় তার উপস্থিতি বেশ শক্তিশালী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে তারা একা নন, রাজার উপস্থিতি তাদেরকে সেই আশ্বাস দিচ্ছে। 

রাজার সাক্ষাৎকার নিতে রয়টার্সের অনুরোধ তার কার্যালয় প্রত্যাখ্যান করেছে; অবশ্য তার ইনস্টাগ্রাম ও ফেইসবুক পেজেই মহামারীর মধ্যে তার কর্মকাণ্ড ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত সফরের সচিত্র বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে।

রাজপ্রাসাদের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেন, মহামারী দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে আমাদের জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে, আর এটাই আমাদের রাজার সবচেয়ে বড় ভয়।

গত শতকের ৭০ দশক পর্যন্ত বিদেশিদের জন্য দ্বার বন্ধ করে রাখা ভুটানে এখনো প্রতি দুই হাজার নাগরিকের জন্য চিকিৎসক মাত্র একজন। সংক্রমণ এড়াতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর দেশটি আবারও তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে; দেশের ভেতরেও কিছু কিছু এলাকায় দেওয়া হয়েছে লকডাউন, কভিড রোগী শনাক্তে বাড়ানো হয়েছে পরীক্ষা।

ভুটানে যারা টিকা পাওয়ার উপযুক্ত, তাদের ৯০ শতাংশের দেহে এরই মধ্যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ প্রয়োগ করা হয়েছে। সরবরাহ না থাকায় বাকিদের প্রথম ডোজ দেওয়া যায়নি। দ্বিতীয় ডোজ কবে মিলবে তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। তবে দেশটির রাজা ও সরকারের যে পদক্ষেপ তাতে মনোবল বাড়ছে দেশটির নাগরিকদের। রাজা নিজের সর্বময় ক্ষমতা কমিয়ে ভুটানে ২০০৮ সাল থেকে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র চালু করলেও দেশটির সামাজিক-রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো রাজপরিবারের প্রতি আনুগত্যের প্রভাব প্রবল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত