মৃত্যু আর শনাক্ত বাড়ছে হু হু করে। গতকাল এক দিনে দেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে করোনায়। এদিন শনাক্তের সংখ্যা কিছুটা কমলেও হার বেড়েছে। গতকাল পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ২২ যা গত ৬৯ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। নতুন শনাক্ত হওয়া রোগীদের অনেকেই ভারত সীমান্তবর্তী ১৫টি জেলার। মধ্যাঞ্চলের অনেক জেলায়ও চলছে বিধিনিষেধ। ওইসব জেলায় আংশিক বা এলাকাভিত্তিক ‘লকডাউন’ দিয়েও সংক্রমণ কমানো যাচ্ছে না। এই অবস্থায় সারা দেশে কমপক্ষে ১৪ দিন সম্পূর্ণ ‘শাটডাউন’ করতে করোনাসংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি সুপারিশ করেছে। সেই মোতাবেক সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে আগামী সোমবার থেকে সারা দেশে ৭ দিনের ‘কঠোর লকডাউন’ চলবে। তবে এর আগে থেকেই মফস্বলে এই নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভ্রান্তির পাশাপাশি ছড়াচ্ছে আতঙ্কও।
এই পরিস্থিতিতে ফরিদপুর, খুলনা, ঠাকুরগাঁও, মানিকগঞ্জ, বাগেরহাটসহ আরও কয়েকটি জেলার সাধারণ মানুষ জানিয়েছেন চলমান বিধিনিষেধের মধ্যে তাদের দুর্ভোগের কথা। কাজ বন্ধ হয়ে অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটছে অনেকের। তবে এই বিষয়ে কোনো জায়গা থেকেই কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না তারা। এই অবস্থা আরও কড়াকড়ির ‘শাটডাউন’ দিলে তাতে আরও বেশি দুর্ভোগের আশঙ্কা করছেন তারা।
ফরিদপুরের ভাঙা উপজেলা সদরের বিশ্বাসপাড়ার বাসিন্দা আকমল হোসেন গতকাল দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনি ইজিবাইক চালান। কিন্তু ‘লকডাউন’-এর কারণে সেটি বন্ধ আছে কয়েক দিন থেকে। এখন নতুন করে লকডাউন দেওয়া হলে পরিবার-পরিজন নিয়ে তিনি চরম বিপাকে পড়বেন।
আকমল বলেন, শুরুর দিকে সরকারি- বেসরকারি সহায়তা মিললেও এখন কেউ ফিরেও তাকায় না। নতুন করে লকডাউন দিলে পরিস্থিতি কী হবে তা নিয়ে শঙ্কিত তিনি।
বাগেরহাট সদরের রিকশাচালক জসিম বলেন, ‘আমার একার আয়ে পাঁচজনের সংসার চলে। লকডাউনের কারণে কেউ বাইরে আসে না। কিন্তু পেটের জন্য আমাদের আসতি হয়। রিকশা না চালালি খাতি পাবো না।’
একই সুরে কথা বলেন, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার হালিম মণ্ডল। তিনি জানান, শহরের একটি দোকানে চাকরি করেন তিনি। লকডাউনে সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। মালিক বলেছেন, বেচা বিক্রি বন্ধ থাকলে বেতন দিতে পারবে না। এই অবস্থায় তিনি কী করবেন তা নিয়ে আছেন দুশ্চিন্তায়।
সারা দেশে এই তিনজনের মতো অনেকেই কাজ হারিয়ে বা কাজ বন্ধ থাকায় ইতিমধ্যেই পড়েছেন চরম বিপাকে। নতুন করে আবার বিধিনিষেধ দিলে ‘ক্ষুধার জ্বালায় মরতে হবে’ বলেই শঙ্কা তাদের।
করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়ান্ট ডেল্টার সামাজিক বিস্তার বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ঘটায় জুনের শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে শুরু করে। এর আগে সংক্রমণের প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ে ঢাকা সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় পড়লেও এবার ভাইরাসের প্রকোপ রাজশাহী ও খুলনা বিভাগেও ব্যাপক মাত্রা পেয়েছে।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে দেখা গেছে, পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খুলনা বিভাগে। এই বিভাগে ২ হাজার ৬২৪টি নমুনা পরীক্ষা করে ১ হাজার ৩২২ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। বিভাগটিতে শনাক্তের হার ৫০ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা আগের দিন ৩৮ দশমিক ১১ শতাংশ ছিল। এছাড়া ঢাকা বিভাগে পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার আগের দিনের ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ১৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯ দশমিক ০৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং রাজশাহী বিভাগে ১৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং রংপুর বিভাগে ৩৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ দশমিক ৭৪ শতাংশ হয়েছে।
খুলনায় সর্বোচ্চ শনাক্ত, আরও ২৩ জনের মৃত্যু : করোনাভাইরাস ভয়াবহ রূপ নিয়েছে খুলনা বিভাগে। প্রতিদিনই প্রকোপ বাড়ছে। ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরও ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে বিভাগে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩২২ জন, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ শনাক্ত। এর আগে, ১৮ জুন সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়।
শুক্রবার দুপুরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক রাশেদা সুলতানা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের মধ্যে খুলনায় কুষ্টিয়ার সর্বোচ্চ ৭ জন, খুলনার ৫ জন, যশোরের ৫ জন, ঝিনাইদহের ২ জন, চুয়াডাঙ্গার একজন, সাতক্ষীরার একজন, বাগেরহাটের একজন এবং মেহেরপুরের একজন মারা গেছেন।
রামেকে আরও ১৪ মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কভিড ইউনিটে এক দিনে আরও ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। যাদের পাঁচজনের করোনা পজিটিভ ছিল। বাকিরা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার সকালের মধ্যে তারা মারা যান। মারা যাওয়া ছয়জন রাজশাহীর। বাকিদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চারজন, নাটোরের একজন ও নওগাঁর তিনজন। এদের মধ্যে দুজন মারা যান আইসিইউতে। এ নিয়ে চলতি মাসের গত ২৫ দিনে এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেলেন ২৭৪ জন। হাসপাতাল পরিচালক জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫ জন। এর মধ্যে রাজশাহীর ৪৪ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৮, নাটোরের পাঁচ, নওগাঁর ছয়, পাবনার একজন ও কুষ্টিয়ার একজন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪৩ জন।
চট্টগ্রাম জেলায় শনাক্ত ২৭৪ : চট্টগ্রাম জেলায় এক দিনে আরও ২৭৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের। শনাক্তের হার ২৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। শুক্রবার জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, চট্টগ্রামে গত বৃহস্পতিবার ৯৭৬টি নমুনা পরীক্ষা করে ২৭৪ জনের কভিড পজিটিভ শনাক্ত হয়। আক্রান্তের হার ২৮ দশমিক শূন্য সাত শতাংশ। আগের দিন বুধবার শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ২৫ শতাংশ।
নোয়াখালীতে নতুন শনাক্ত ১১৬, মৃত্যু ২ : নোয়াখালীতে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১১৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। ৪৪২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে এ ফল পাওয়া যায়। এতে ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ২৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। এদিকে নোয়াখালীতে করোনার সংক্রমণ না কমায় নোয়াখালী পৌরসভা ও ছয়টি ইউনিয়নে চলমান লকডাউন চতুর্থ দফায় আরও এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে জেলা প্রশাসন, যা আগামী ২ জুলাই পর্যন্ত চলবে। গত বৃহস্পতিবার (২৪ জুন) বিকেল ৫টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সঙ্গে চৌমুহনী পৌরসভা এবং বেগমগঞ্জ উপজেলার মীরওয়ারিশপুর ও একলাশপুর ইউনিয়নে লডডাউন ঘোষণা করা হয়।
কুষ্টিয়ায় লকডাউনের ৫ম দিন : লকডাউন কার্যকর করতে জেলা শহরের বিভিন্ন প্রবেশমুখে চেকপোস্ট বসিয়েছে পুলিশ। এছাড়া জেলা প্রশাসন পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যহত আছে। এতকিছুর পরও কোনোভাবেই ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হওয়ায় চরম উদ্বিগ্ন ও শঙ্কা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকগণ। অস্বাভাবিক হারে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমান্তবর্তী জেলা কুষ্টিয়ায় গত ২০ জুন মধ্যরাত থেকে ২৭ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত ৭ দিনের কঠোর লকডাউন ঘোষণা করে গণবিজ্ঞপ্তি দেয় জেলা প্রশাসন।
মোংলায় এক দিনে সংক্রমণের হার বেড়েছে তিনগুণ : বাগেরহাটে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার প্রতিদিনই ওঠানামা করছে। কঠোর বিধিনিষেধ দিয়েও সংক্রমণের লাগাম টেনে রাখা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যবিধি না মানাই কারণ বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। গত ২৪ ঘণ্টার নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে আরও ৭২ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
এদিকে বাগেরহাটে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় জেলাজুড়ে দেওয়া সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ প্রতিপালনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। শুক্রবার বিধিনিষেধের দ্বিতীয় দিন দোকানপাট ও যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা। নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষদের রাস্তায় পেলে তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে তাদের জরিমানা করছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে কঠোর বিধিনিষেধে নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
রিকশাচালক মধু মন্ডল ও জসিম শেখ বলেন, আমাদের আয়ে সংসার চলে। বাড়ির বাইরে না বের হলে আয় হবে না। আয় না করলে খাব কী? তাই বাধ্য হয়ে বাড়ির বাইরে বের হচ্ছি। রাস্তায় লোকজন কম, সেভাবে আয়ও হচ্ছে না। যে অবস্থা চলছে তাতে গরিব মানুষের বেঁচে থাকাই কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, করোনার সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বগতি তার লাগান টেনে ধরাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কঠোর বিধিনিষেধে জেলার নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট বেড়েছে, কিন্তু কী আর করামানুষের জীবন বাঁচাতে প্রশাসনকে কঠোর হতে হচ্ছে।
ফরিদপুরে কঠোর বিধিনিষেধের পঞ্চম দিন : গত ২৪ ঘণ্টায় ফরিদপুর পিসিআর ল্যাবে ২৫৪ নমুনা পরীক্ষার মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ১৪০ জন আর এই সময়ে করোনায় মারা গেছে আরও চারজন। জেলায় এ পর্যন্ত কভিড-১৯ এ প্রাণহানি হয়েছে ২০৯ জনের।
সোমবার থেকে শুরু হওয়া ফরিদপুরের চার পৌর শহরের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পঞ্চমতম দিন চলছে। নতুন করে জেলার সদরপুর এলাকাকে কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় আনা হয়েছে। করোনা শনাক্তের হার বেড়ে যাওয়ায় ফরিদপুর সদর, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, মধুখালী পৌর শহর এবং সদরপুর উপজেলা এলাকায় সাত দিনের এই বিধিনিষেধ জারি করে জেলা প্রশাসন।
এই সকল এলাকার সব ধরনের যানচলাচল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, মহামারীর এই সময়ে আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল না হলে চরম মূল্য দিতে হবে। এই জন্য সবাইকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
