একটি বেসরকারি কোম্পানির ত্রুটিপূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির দায়ে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার রামেন্দ্র নাথ বসাককে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে হিসাববিদদের সংগঠন দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বাংলাদেশ (আইসিএবি)। যদিও একই অভিযোগ তদন্ত শেষে নিরীক্ষক, কোম্পানি ও ব্যাংককে শুধুমাত্র সতর্ক করে নিজেদের কাজ শেষ করে ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। গত ২২ জুন আইসিএবির কাউন্সিল সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘অনুশীলনের শংসাপত্র’ স্থগিত করে রামেন্দ্র নাথকে চিঠি পাঠিয়েছে আইসিএবি।
আইসিএবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুভাশিস বোস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ত্রুটিপূর্ণ কর্মকান্ডের জন্য এফআরসি কিংবা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবস্থা না নিলে যে আইসিএবি কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারবে না, তা কোথাও উল্লেখ নেই। সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ও প্রতিবেদনগুলো মূল্যায়নের পরই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছে কাউন্সিল।
এর আগে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর রামেন্দ্র নাথ বসাক কর্তৃক নিরীক্ষিত সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের দুটি আলাদা আর্থিক বিবরণী দুটি ব্যাংকে জমা দেওয়ার বিষয়ে এফআরসিকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ওয়ান ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকে জমা দেওয়া ওই দুটি নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে যেসব তথ্য ও পরিসংখ্যানসহ জমা দেওয়া হয়েছিল, তা ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং আইনের লংঘন ও অপরাধ। সিলভার কম্পোজিট ওয়ান ব্যাংকে জমা দেওয়া নিরীক্ষিত প্রতিবেদনের চেয়ে আইএফআইসি ব্যাংকে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বিক্রি, মুনাফা, সম্পদ, ইক্যুইটি বাড়িয়ে দেখানো হয়।
গত জানুয়ারিতে এফআরসি দেখতে পায় যে, ওয়ান ব্যাংকে জমা দেওয়া ২০১৮-১৯ হিসাব বছরের রামেন্দ্র নাথ কর্তৃক স্বাক্ষরিত নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইলের বার্ষিক বিক্রি দেখানো হয় ৪৯৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অথচ একই হিসাব বছরের জন্য আইএফআইসি ব্যাংকে জমা দেওয়া রামেন্দ্র নাথের অপর এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সিলভার কম্পোজিটের বিক্রি দেখানো হয় ৭৩৪ কোটি টাকা। শুধু বিক্রি নয়, কর-পূর্ববর্তী মুনাফা, সম্পদের পরিমাণও বাড়িয়ে দেখানো হয়।
আইএফআইসি ব্যাংকে সিলভার কম্পোজিট কর-পূর্ববর্তী মুনাফা দেখিয়েছে ৭৭ কোটি টাকা, যা ওয়ান ব্যাংকে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে ছিল ১৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ ওয়ান ব্যাংকে দেখানো হয় ৯৬৯ কোটি টাকা, যা আইএফআইসি ব্যাংকে দাখিল করা নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে ছিল ১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। একইভাবে ব্যাংকঋণ পেতে কোম্পানিটি ইক্যুইটির পরিমাণও বাড়িয়ে দেখায়। রামেন্দ্র নাথের ওই দুই নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে সব তথ্য ও পরিসংখ্যান আলাদা ছিল। এফআরসির সন্দেহ ছিল, একই হিসাব বছরের জন্য দুটি ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন ম তৈরি করার পেছনে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্য রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত ১৭ জানুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দেয় এফআরসি। একই সঙ্গে এই নিরীক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইসিএবিকেও চিঠি পাঠায় এফআরসি।
তবে একই হিসাব বছরে আলাদা তথ্য ও পরিসংখ্যান নিয়ে দুটি নিরীক্ষিত প্রতিবেদনের অনিয়মের বিষয়টিতে গত ২৪ মার্চ নিরীক্ষক, কোম্পানি ও ব্যাংককে শুধুমাত্র সতর্ক করে অব্যাহতি দেয় এফআরসি। অব্যাহতির বিষয়ে এফআরসি তাদের চিঠিতে জানিয়েছে, বিষয়টি সন্দেহের বাইরে প্রমাণিত হয়নি এবং এতে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি ফাঁক রয়েছে।
একই বিষয়ে দুটি প্রতিষ্ঠান দুই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রামেন্দ্র নাথ মজুমদার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি খসড়া প্রতিবেদন দিয়েছিলাম। এফআরসি ব্যাংক, কোম্পানিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও কথা বলে তারা একটি সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। এরপরও আইসিএবি শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে, যেটা তারা পারে কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষে। একই বিষয়ের জন্য দুইবার শাস্তি দেওয়া যায় না, এটা সংবিধান বিরুদ্ধ। তারা এটা কোনোভাবে করতে পারে না। আইসিএবির এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জ করবেন বলে জানান তিনি।
