রাত শেষে ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। ঘড়ির কাঁটায় ৪টা বেজে ১৫ মিনিট। রাতের আড়মোড়া ভেঙে গতকাল শনিবার পরিবার-পরিজন নিয়ে বড় বড় ব্যাগসহ বহু মানুষ রাজধানীর মিরপুর সড়কের দারুসসালাম এলাকায় পুলিশের তল্লাশি চৌকি পার হচ্ছিলেন। এ যেন ঈদযাত্রার চিত্র। তবে ঢাকা ছেড়ে বাড়িমুখী এসব মানুষের চোখেমুখে নেই উচ্ছলতা, আছে শুধু দুশ্চিন্তার ছাপ।
তল্লাশি চৌকি পার হয়েই কিছুটা সামনে চারটি মোটরসাইকেলসহ দুটি প্রাইভেট কার এবং তিনটি মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে। পাঁচ গুণ বাড়তি ভাড়া দিয়ে মাইক্রোবাস পূর্ণ না হওয়ায় যাত্রা শুরুর প্রহর গুনছিলেন বেশ কয়েকজন। আর নিম্ন আয়ের প্রান্তিক মানুষরা ছুটছে পণ্যবাহী ট্রাকে অথবা পিক-আপে। গতকাল ভোর থেকে শুরু করে দিনভরই এভাবে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করেই দলে দলে হাজার হাজার মানুষকে ঢাকা ছাড়তে দেখা গেছে। গতকাল ভোর হওয়ার আগে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল ও আমিনবাজারের চিত্রও ছিল একই রকম। একদিকে যেমন বহু মানুষ শহর ছাড়ছে তেমনি আবার অনেকে প্রবেশও করছেন। গতকাল মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়াসহ বিভিন্ন ফেরিঘাটেও ঘরমুখো মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতন। যানবাহন ও যাত্রীর বাড়তি চাপ ছিল ফেরিঘাটগুলোতে। ‘লকডাউন’ কার্যকর করার লক্ষ্যে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশমুখে পুলিশ তল্লাশি চৌকি বসালেও সেখানে তেমন একটা কড়াকড়ি ছিল না। পুলিশের নাকের ডগায় শহর ছাড়ছে রাজধানীর লোকাল বাস। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ঢাকা থেকে কোনো বাস বের হওয়ার কথা না। যদি যায় তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমন পরিস্থিতিতে একরাশ হতাশা নিয়েই জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, এরকম ‘লকডাউন’ প্রকৃত লকডাউনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এরকম ‘লকডাউন’-এর ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে আগামীকাল সোমবার থেকে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দেওয়ার পর গতকাল ভোর থেকেই দলে দলে ঢাকা ছাড়তে শুরু করে মানুষ। আগে থেকেই আগামী ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকার পার্শ্ববর্তী সাতটি জেলায় লকডাউন কার্যকর থাকায় দূরপাল্লার বাস ঢাকায় আসা যাওয়া না করতে পারলেও বন্ধ করা যায়নি ঢাকামুখী এবং ঢাকা থেকে বের হওয়া মানুষের ঢল। তবে গত শুক্রবার রাতে সরকারের তরফ থেকে সোমবার থেকে কঠোর লকডাউনের কথা বলার পর ঢাকামুখী মানুষের ভিড় কমে ঢাকা ছাড়া মানুষের ভিড় বেড়েছে। আগামীকাল সোমবার থেকে সাত দিনের জন্য জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছু বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর আগে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি ১৪ দিনের সম্পূর্ণ ‘শাটডাউন’ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। সরকার বলেছে, জরুরি পণ্যবাহী ব্যতীত সব প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। শুধু অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজে যানবাহন চলাচল করতে পারবে। জরুরি কারণ ছাড়া বাড়ির বাইরে কেউ বের হতে পারবে না। শুক্রবার রাতে এ ঘোষণার পর গতকাল ভোর থেকেই ঢাকা ছাড়ার হিড়িক পড়ে।
গতকাল ভোরে আমিন বাজারে ব্রিজের আগে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বসানো হয়েছে পুলিশের তল্লাশি চৌকি। যে বাসগুলো শহর ছেড়ে সাভার হয়ে ফেরিঘাটের উদ্দেশে যেতে চাচ্ছে সেই বাসগুলোকে সবুজ সংকেতের ইশারা দিয়ে পার করে দিচ্ছে পুলিশ। ঢাকা-সাভার রুটে চলাচল করা মৌমিতা, ওয়েলকাম ও প্রত্যয়সহ বেশ কয়েকটি লোকাল বাসকে ঢাকা অতিক্রম করতে দেখা গেছে। ভোর ৫ টা ৬ মিনিটে ওয়েলকাম পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১৩০৩৩৮, মৌমিতা পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১২০৬৪৪ এবং ক্যান্টমেন্ট বাস সার্ভিসের ঢাকা মেট্রো-ব ১১৯৯৫৮ সহ বেশ কয়েকটি বাসকে সরকারি নির্দেশ অমান্য করে চলাচল করতে দেখা যায়। এ ব্যাপারে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি। পরে অবশ্য তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। এরকম হওয়ার কথা না। অসম্ভব।’
এ প্রসঙ্গে ডিএমপির ট্র্যাফিক মিরপুর বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) ইফতেখারুল ইসলাম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো বাস এন্ট্রি এবং এক্সিট বন্ধ করে দিয়েছি। ২৪ ঘণ্টা আমাদের মনিটরিং চলছে। যদি বাস ঢাকা অতিক্রম করে থাকে তাহলে সেটা অবশ্যই লকডাউনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে। এরকম ঘটনা ঘটার কথা না। যদি হয়ে থাকে, তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সরকারি নির্দেশ অমান্য করে বাস চলাচলের বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসিচব এনায়েতউল্লাহ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে যদি বাস চলে সেটা তাদের দায়। আমরা কি ভোররাতে রাস্তায় পাহারা দিমু।’
নির্দেশ অমান্য করে রাস্তায় চললে পুলিশকে অবশ্যই অ্যাকশনে যাওয়া উচিৎ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু ড্রাইভার (চালক) এটা করতে পারে। অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
এদিকে কার্যকর লকডাউন না হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। জনস্বাস্থ্যবিদ ড. লেলিন চৌধুরী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লকডাউন বলতে যা বোঝায় জনগণের চলাচল সীমিত পরিসরে হবে। দূরপাল্লার বাস বন্ধ করে বিভিন্ন পরিবহন চললে তা লকডাউনের উদ্দেশ্য সাধিত করে না। এটা লকডাউনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘অসহায় প্রান্তিক মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করে লকডাউন ঘোষণা করলে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কারণ মনে রাখতে হবে ক্ষুধার্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি বেপরোয়া।’
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে মানুষের ঢল : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে গতকাল ভোর থেকেই ঢাকাফেরত মানুষের ভিড় দেখা গেছে। যারা বিধিনিষেধ অমান্য করে ঢাকায় যাচ্ছেন ও ঢাকা থেকে ফেরত আসছেন তাদের অনেকেরই ধারণা লকডাউন ঈদ পর্যন্ত গড়াতে পারে। এই ধারণা থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি মাথায় নিয়েও মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।
ঢাকাফেরত যাত্রী সজিব হাসান মোটরসাইকেল ভাড়া করে যাচ্ছিলেন কুষ্টিয়া। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকায় একটা অফিসে পিয়ন হিসেবে কাজ করি। বস বললেন কাল থেকে তোমাদের ছুটি, তোমরা বাড়ি চলে যাও, বস বেতনের কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন লকডাউন শেষ হলে চলে এসো। তাই এক প্রকার বাধ্য হয়েই বাড়ি ফিরছি।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. ফিরোজ শেখ বলেন, ‘সোমবার কঠোর লকডাউনে কথা শুনে ঘাটে মানুষের ভিড় বেড়েছে। পথে পথে বাধা পেলেও তাদের আটকানো সম্ভব হচ্ছে না বলেই ফেরিঘাটে এই ভিড়।’
শিমুলিয়ায় যাত্রী ও যানবাহনের চাপ : গতকাল সকাল থেকে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ঘাটে যাত্রী এবং ব্যক্তিগত ও পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ বেড়েছে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শিমুলিয়া ঘাটে ফেরিতে যাত্রীর উভয়মুখী উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে ফেরিতে গাদাগাদি করে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছেন যাত্রীরা। অধিকাংশ যাত্রীরই মুখে মাস্ক দেখা যায়নি। লকডাউনে লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচল বন্ধ থাকায় ফেরিতে চাপ বেড়েছে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের কয়েকটি পয়েন্টে ও শিমুলিয়া ফেরিঘাটের প্রবেশমুখে রয়েছে পুলিশের চেকপোস্ট। চেকপোস্টে যাত্রী চলাচল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে পুলিশ। শরীয়তপুরের গোসাইরহাট থেকে ঢাকামুখী যাত্রী রাশেদ ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বুকে ও ঘাড়ে ভীষণ ব্যথা। তাই বাধ্য হয়ে লকডাউনের মধ্যেও ঢাকায় ডাক্তার দেখাতে ঢাকায় যাচ্ছি। গোসাইরহাট থেকে শিমুলিয়া ঘাটে আসতে আগে ১৫০ টাকা খরচ হতো। আর এখন সেখানে ৫০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে। ঢাকায় যেতে আরও অন্তত ৩০০ টাকা লাগবে।’
বিআইডব্লিউটিসি শিমুলিয়াঘাটে সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) ফয়সাল আহমেদ জানান, গতকাল সকাল থেকে যাত্রীদের কিছুটা ভিড় রয়েছে। তবে গাড়ির চাপ নেই। সকালের দিকে দক্ষিণবঙ্গগামী যাত্রীদের চাপ ছিল। তবে দুপুরের পর থেকে ঢাকাগামী যাত্রীদের চাপ বেশি দেখা গেছে। বর্তমানে ফেরিঘাট এলাকায় কোনো গাড়ি পারপারের অপেক্ষায় নেই।
বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের সুপারিন্টেন্ডেন্ট মেহেদী হাসান জানান, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটের ১৫টির মধ্যে ১৪টি ফেরিই চলাচল করছে। লকডাউনের নিয়ম অনুযায়ী ফেরিতে শুধু রোগী বহনকারী গাড়ি এবং জরুরি পণ্য পরিবহনের গাড়ি ছাড়া সবকিছু পারাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মানুষের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ঘাটে ভিড় জমাচ্ছেন যাত্রীরা।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করেছেন দেশ রূপান্তরের রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি।
