পরিকল্পনা ও নির্মাণাধীন দেশের ২২টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে সরকার ১০টি কেন্দ্র বাতিল করেছে। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ছিল সাড়ে আট হাজার মেগাওয়াট। গত ১০ থেকে ৫ বছর আগে অনুমতি পেলেও কেন্দ্রগুলো কাজ শুরু করতে ব্যর্থ হয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এ যুক্তিতে দেশে গত ১০ বছরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। গতকাল রবিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগে এক সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানান বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। কয়লাভিত্তিক ১৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে নীতিগত সম্মতির জন্য চলতি জুন মাসে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো বিদ্যুৎ বিভাগের সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়। সেখানে ১০টি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণ বন্ধের সুপারিশ করা হয়।
তবে বহুল আলোচিত সুন্দরবনের পাশে বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হচ্ছে না। রামপালসহ দেশে ছয়টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে এখন।
বাংলাদেশ আগামী জুলাই মাসে চীনে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেবে, তার আগে ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের ঘোষণা দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কয়লা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে সরকার এমনটি মনে করেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে নসরুল হামিদ বলেন, যেসব কেন্দ্র সময়মতো উৎপাদনে আসতে পারেনি এমন ১০টি কেন্দ্রের অনুমতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সায় আছে। এসব কেন্দ্র বন্ধ হলেও আগামীতে বিদ্যুতের সংকট হবে না।
সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে আন্তরিক জানিয়ে তিনি বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে ৪১ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ¦ালানি থেকে আসবে। ইতিমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটা মহাপরিকল্পনা করা হচ্ছে।
যেসব কেন্দ্র বন্ধ হচ্ছে : এসব কেন্দ্র ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদনে আসার কথা ছিল। বন্ধ হওয়া তালিকার মধ্যে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে দুটি ছাড়া বাকিগুলোর সঙ্গে সরকারের চূড়ান্ত চুক্তি হয়েছিল। দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওরিয়নের পাঁচটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধ করা হয়েছে। এগুলো হলো মাওয়া ৫২২ মেগাওয়াট, গজারিয়া ৬৩৫ মেগাওয়াট, ঢাকা ২৮২ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামে ২৮২ মেগাওয়াট ও বাগেরহাটে ৫৬৫ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র। এর মধ্যে মাওয়া ৫২২ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি ২০১১ সালে চূড়ান্ত অনুমতি দেওয়া হয়, কেন্দ্রটি উৎপাদনে আসার কথা ছিল ২০১৬ সালের মার্চে। মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় পদ্মা নদীতে পর্যাপ্ত নাব্য না থাকায় কয়লাবাহী জাহাজ আসা সম্ভব নয়। অর্থাৎ কেন্দ্রটি স্থাপন করাই বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ওরিয়ন তার পাঁচটি কেন্দ্রের একটির জন্যও ব্যাংক ঋণ পায়নি। এসব কেন্দ্র নির্মাণ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিতে দেশি ও বিদেশি ব্যাংক অর্থ দেয়নি।
বন্ধ হচ্ছে সরকারি কোম্পানি আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের (এপিএসসিএল) পটুয়াখালী ১৩২০ ও উত্তরবঙ্গের ১২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। সরকারের আরেক সংস্থা কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় করা দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ‘হাব’ (কেন্দ্র) করার চিন্তা করেছিল সরকার। এখানে ৯টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা ভেবেছিল সরকার। এর মধ্যে তিনটি কেন্দ্র নির্মাণের ব্যাপারে চূড়ান্ত হয়। এখন সরকার একটি বাদে দুটিই বাতিল করছে। মহেশখালী ও মাতারবাড়ীতে অনুমতি পাওয়া চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল হচ্ছে। এ দুটি হলো সিপিজিসিবিএল ও সিঙ্গাপুরের সেমকর্পের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। সিপিজিসিবিএল ও জাপানের সুমিতমোর সঙ্গে যৌথ মালিকানায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কক্সবাজারের মহেশখালীতে ১৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এছাড়া পিডিবি ও চীনা প্রতিষ্ঠান সিএইচডিকের যৌথ মালিকানায় মহেশখালীতে আরেকটি ১৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রও বন্ধ হচ্ছে।
যেসব কেন্দ্র থাকছে : বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ মালিকানায় বাগেরহাটের রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট, বাংলাদেশ চীনের যৌথ মালিকানায় পটুয়াখালীর পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াটের দ্বিতীয় ইউনিট, সিপিজিসিবিএলের কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে ১২০০ মেগাওয়াট, এস আলমের চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ১২৪০ মেগাওয়াট, সরকারি প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি ও চীনা কোম্পানির যৌথ মালিকানায় পটুয়াখালীর ১৩২০ মেগাওয়াট এবং বরগুনার আমতলীতে আইসোটেকের ৩০৭ মেগাওয়াট কেন্দ্রগুলোর কাজ অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।
যে কারণে বন্ধ হলো কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র : অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানি থেকেও কয়লা পরিবেশের বেশি ক্ষতি করে। তবে বাংলাদেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার একমাত্র কারণ পরিবেশ নয় বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধানত চারটি কারণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর অনুমতি বাতিল করেছে সরকার।
এক. কেন্দ্র নির্মাণে অর্থের সংস্থান করতে পারেনি অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো; দুই. বিদেশি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে বিনিয়োগের বিষয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এমনকি চীন সরকার জানিয়েছে, তারা আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ করবে না; তিন. যেসব স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল সেখানে আমদানি করা কয়লা পরিবহনে অনেক জটিলতা রয়েছে ও চার. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে পরিবেশবান্ধব জ¦ালানি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়, দেশীয় গ্যাস সরবরাহ দ্রুত হ্রাস পাওয়ার কারণে সরকার মানসম্মত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতরি সঙ্গে সংগতি রেখে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংরক্ষণের কথা মাথায় রেখে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। এর পাশাপাশি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সক্স, নক্স ছাই ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও কেন্দ্রগুলো সরকারের বেঁধে দেওয়া বিধিনিষেধ মানছে কি না তা কঠোরভাবে মনিটরের ব্যবস্থা করা হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বহুমুখী জ্বালানি বা একাধিক ধরনের জ্বালানি ব্যবহার একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। জনগণকে সাশ্রয়ীমূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস, আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তেলভিত্তিক কেন্দ্রের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের প্রয়োজনও রয়েছে।
সারসংক্ষেপে আরও বলা হয়, বৈশ্বিক পর্যায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে আপত্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় সামগ্রিক বিবেচনায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্যমাত্রা যৌক্তিক পর্যায় পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ‘২০৩০ সাল নাগাদ দেশে বিদ্যুতের প্রকৃত কত চাহিদা হবে সরকার এখনো জানে না। যেটা তারা জানে সেটা যথাযথ না। ফলে কী কারণে তখন সরকার একের পর এক কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের অনুমতি দিয়েছিল সেটা যেমন রহস্যজনক, এখন কেন সেটা বন্ধ করছে সেটার ভিত্তি অস্পষ্ট।’
