কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি নীতি

আপডেট : ২৮ জুন ২০২১, ১০:০৩ পিএম

বাংলাদেশ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও একটি শীর্ষ জলবায়ুবিপন্ন দেশ হওয়া সত্ত্বেও দেশে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। তথাপি দেশে একের পর এক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছিল সরকার। এতে সরকারের জ্বালানি নীতি বারবারই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে বিশে^র সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ও ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিবাদে দেশে বিদেশে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। এখন এই পরিস্থিতির একটি নাটকীয় মোড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রবিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে, দেশের পরিকল্পিত ও নির্মাণাধীন ২২টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করেছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী জুলাইয়ে চীনে অনুষ্ঠেয় ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে এই ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের ঘোষণা দিয়ে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার একটি বার্তা দিতে চাচ্ছে সরকার।

তবে সুন্দরবন সংলগ্ন বহুল সমালোচিত ১৩২০ মেগাওয়াটের রামপাল কয়লাভিত্তিক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হচ্ছে না। রামপালসহ দেশে ছয়টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে এখন। কিন্তু গত ১০ থেকে ৫ বছর আগে অনুমতি পেলেও এই কেন্দ্রগুলো কাজ শুরু করতে ব্যর্থ হয়। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, যেসব কেন্দ্র সময়মতো উৎপাদনে আসতে পারেনি এমন ১০টি কেন্দ্রের অনুমতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে, এসব কেন্দ্র বন্ধ হলেও আগামীতে বিদ্যুতের সংকট হবে না। অন্যদিকে, সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘ইউনেস্কো সম্মেলনের আগে ১০ বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল’ শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাতিল ঘোষিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগের জন্যই বিনিয়োগের অর্থের সংস্থান করতে পারেনি অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো। এছাড়া বিদেশি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে বিনিয়োগের বিষয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এমনকি চীন সরকার জানিয়েছে, তারা আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ করবে না। পাশাপাশি আরেকটি বড় সংকট হলো কয়েকটি প্রকল্পের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে সেখানে আমদানি করা কয়লা পরিবহনে অনেক জটিলতা রয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ যে এখন সিভিএফ বা জলবায়ু বিপন্ন দেশগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছে এর বহুমাত্রিক গুরুত্ব রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকির কারণেই বাংলাদেশ এই নেতৃত্বের দাবিদার। তেমনি এটা আশাব্যঞ্জক যে বাংলাদেশ এখন এমন বৈশ্বিক ফোরামে সফলভাবে নেতৃত্বদানে সচেষ্ট রয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ব ধরিত্রী দিবস উপলক্ষে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সম্মেলনে সিভিএফ সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বদান এরই সাক্ষ্য বহন করছে। এমতাবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসা বা সামগ্রিক জ্বালানি নীতির প্রশ্নে যেমন এটা গুরুত্বপূর্ণ তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং সামগ্রিকভাবে পরিবেশ-প্রতিবেশ-প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষার প্রশ্নেও বাংলাদেশের এই নেতৃত্ব দানের অনেক দায় ও দায়িত্ব রয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গত ১৬ জুন ইউনেস্কোর ‘রিয়েকটিভ মনিটরিং মিশনের’ এক প্রতিবেদনে সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা ধরে রাখার বিষয়ে কিছু শর্ত আরোপ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব শর্ত বাংলাদেশ কতটুকু পালন করল, তার ওপর নির্ভর করবে সুন্দরবনের এই মর্যাদা বজায় থাকবে কি না। ইউনেস্কোর শর্তগুলো হলো বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ বন্ধ রাখা এবং সেখানে আর কোনো ভারী শিল্পকারখানার অনুমোদন না দেওয়া। পাশাপাশি ইতিমধ্যে সুন্দরবন অঞ্চলে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানাগুলোর প্রভাব মূল্যায়ন করতে একটি সমীক্ষা (এসইএ) পরিচালনা করা।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুসারে পৃথিবীর সব রাষ্ট্রকেই ২০৫০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পুরোপুরি সরে আসতে হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে বাংলাদেশকে এখন থেকেই পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে বহুমুখী জ্বালানি বা একাধিক ধরনের জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এজন্য মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সম্ভাব্য জ্বালানি চাহিদার বাস্তবানুগ প্রাক্কলন জরুরি। একইসঙ্গে জরুরি বহুমুখী জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ এবং অবকাঠামোগত সংস্কার। একইসঙ্গে এটা মাথায় রাখতে হবে যে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থেই সিভিএফ-এর মতো ফোরামের নেতৃত্বদানকে অর্থবহ করে তুলতে চায় তাহলে জলবায়ু বিপন্ন দেশ হওয়া সত্ত্বেও নিজ দেশে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জ্বালানি নীতি চালু রাখতে পারবে না। কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করার ক্ষেত্রেও একথা সমভাবে প্রযোজ্য হবে। তাই সরকার যত দ্রুত পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতিমালা বাস্তবায়নের রোডম্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ ত্বরান্বিত করতে পারবে ততই মঙ্গল। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত