অবসায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডকে (পিএলএফএসএল) পুনরুজ্জীবিত করার দিকনির্দেশনা দিয়েছে উচ্চ আদালত। এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি আবার চালুর একটি সম্ভাবনা তৈরি হলো।
জানা গেছে, পিএলএফএসএলে ২০১ জন আমানতকারীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সব পক্ষের বক্তব্য ও শুনানি নিয়ে গতকাল সোমবার বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের একক ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালত পিপলস লিজিং কীভাবে পুনরুজ্জীবিত করা যায় সে লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছেন এবং কমিটিতে কারা অন্তর্ভুক্ত হবেন হাইকোর্টের লিখিত আদেশে সেটি উল্লেখ থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
২০১৯ সালের ১৪ জুলাই পিপলস লিজিংয়ের অবসায়নের জন্য হাইকোর্টে আবেদন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। হাইকোর্ট আবেদনটি গ্রহণ করে এর সাময়িক অবসায়ক (প্রবেশনাল লিক্যুইডেটর) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খানকে তলব করে। পরে বিভিন্ন সময়ে এ সংক্রান্ত বেশ কিছু আদেশ হয় হাইকোর্ট থেকে। গত বছরের নভেম্বরে আদালত অবসায়ককে পিপলস লিজিংয়ের ঋণখেলাপিদের তালিকা দাখিলের নির্দেশ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৮৬ ঋণখেলাপির নাম আসে। পরে গত ২১ জানুয়ারি হাইকোর্ট এক আদেশে তাদের আদালতে এসে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেয়। তলবের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময়ে ১২২ জন হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিলেও ১৬৪ জন হাজির হননি। যারা হাজির হননি তাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে হাইকোর্ট। এর ধারাবাহিকতায় পিপলস লিজিং পুনর্গঠনের নির্দেশনা চেয়ে সম্প্রতি ২০১ জন আমানতকারী আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্টে আবেদন করেন।
এর ধারাবাহিকতায় শুনানি শেষে গতকাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি পুনরুজ্জীবীতকরণের এ আদেশ আসে। ভার্চুয়ালি আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী আহসানুল করিম। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী তানজীব-উল আলম। পিএলএফএসএলের সাময়িক অবসায়কের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মেজবাহুর রহমান।
ব্যারিস্টার মেজবাহুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পিপলস লিজিং পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটিতে কারা থাকবেন সেটি দু-একদিনের মধ্যে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ আদেশ পেলে জানা যাবে।
আদালতের আদেশে কমিটির চেয়ারম্যান হবেন অবসর নেওয়া কোনো বিচারপতি বা সিনিয়র আইনজীবী। আর কমিটির সদস্য থাকবেন একজন আইনজীবী, আমানতকারীদের মধ্যে একজন, সরকারি উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তা এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেড।
২০১৫ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে লোকসান দিতে শুরু করে পিপলস লিজিং। খেলাপি প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা আদায় করতে না পারায় আমানতকারীদের টাকাও ফেরত দিতে পারছিল না প্রতিষ্ঠানটি। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকের কাছ থেকে মেয়াদি আমানত ও বিভিন্ন ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা ধার করে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। অর্থ পাচার করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আগে পি কে হালদারের নিয়ন্ত্রণাধীন চারটি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একটি পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড।
পিপলসের সম্পদের মধ্যে রয়েছে রাজধানীর গ্রিনরোডে সাড়ে তিন বিঘা জমি, পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে প্যারামাউন্ট টাওয়ারে দুইটি ফ্লোর এবং চট্টগ্রামের হোটেল রেডিশন ব্লুতেও পিপলসের অংশীদারত্ব। এর মধ্যে গ্রিনরোডের জমির মূল্য সাড়ে চারশ কোটি টাকা, ফ্লোর দুটির মূল্য শত কোটি টাকা।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ছয়মাস পিপলস লিজিং নিরীক্ষা করে একনাবিন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। নিরীক্ষাকালে ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার বছরের আয়-ব্যয়, সম্পদ ও দায়দেনা সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে গত ১০ মার্চ আদালতে জমা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিপলসের কাছে বিভিন্ন গ্রাহকদের পাওনার পরিমাণ ১ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৪২১ কোটি টাকা, ৮টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের ৪১০ কোটি টাকা আমানত আটকে রয়েছে। এছাড়াও কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন পিপলস লিজিংয়ের কাছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা পায়। বিপরীতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পিপলস লিজিংয়ের পাওনা ১ হাজার ৮১২ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য ১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর পিপলস লিজিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে অনুমোদন পাওয়ার পর ২০০৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।২০১৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি লোকসানে ছিল। ২০১৯ সালে ২১ মে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থমন্ত্রণালয়ে পিপলসের অবসায়নের আবেদন করে। ওই বছরের ২৬ জুন অর্থমন্ত্রণালয় তা অনুমোদন করলে ১০ জুলাই অবসানের বিষয়টি অনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
এরপর ১১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক পিপলস লিজিং থেকে টাকা উত্তোলনে বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং ১৪ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খানকে অবসায়ক নিয়োগ দেওয়া হয়।
