একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনীতি থেকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়ানো আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির ফারাক আকাশ-পাতাল। বিগত পঞ্চাশ বছরে দেশের জনগণের প্রাণান্তকর শ্রম ও ঘামে বাংলাদেশ এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম উদীয়মান শক্তি। জাতীয় বাজেটের আকার থেকে শুরু করে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ অর্থনীতির নানা হিসাবেই বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও প্রশংসিত। কিন্তু একইসঙ্গে অনেক বিপরীত পরিসংখ্যানও আছে। প্রতিবেশী ভারত ও চীনের চেয়েও দ্রুতগতিতে অতিধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছে সাম্প্রতিক বাংলাদেশে। সম্পদ ও আয়বৈষম্যের বিবেচনাতেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটি দেশের একটি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই দ্বৈরথের মধ্যেই সম্ভবত বহুল আলোচিত এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে যেএত উন্নয়ন সত্ত্বেও দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন কেন কাক্সিক্ষত পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে না। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সীমাহীন দুর্নীতি দমন করতে না পারা, বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ লোপাট হওয়া এবং দেশে-বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাওয়া এই সংকটের অন্যতম কারণ। বছরের পর বছর ধরে নানারকম দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থ বেহাত হওয়ার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে এসব বিষয় সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসছে, কিছু ঘটনার তদন্ত-অনুসন্ধান এবং মামলাও হচ্ছে বটে। কিন্তু এরপর আর বেহাত হওয়া রাষ্ট্রীয় অর্থ পুনরুদ্ধারের কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এই সংকটও কাটছে না।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘চোখ যায় না চুরির মালে!’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি উপরোক্ত বাস্তবতার একটি নতুন দৃষ্টান্ত। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, পাবলিক-প্রাইভেট যৌথ মালিকানার প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (এসএওসিএল) অন্তত দেড়শ কোটি টাকা লোপাট করে দেশে ও বিদেশে সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ। এসএওসিএলের অর্ধেক মালিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং বাকি অর্ধেকের মালিক স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল। মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ এবং বেসরকারি অংশের মালিকদের প্রতিনিধি মো. মইনউদ্দিন পরস্পরের যোগসাজশে ওই অর্থ লোপাট করেন। ২০১৮ সালের শুরুর দিকে একটি জাতীয় দৈনিকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, মোহাম্মদ শাহেদ ও মইনউদ্দিনের বিরুদ্ধে এসএওসিএলের ব্যাংক হিসাব থেকে নগদ টাকা তুলে আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানে সত্যতা মিলেছে। এরপর গত জানুয়ারি মাসে দুদকের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও এসএওসিএলের অর্থ লোপাটের সত্যতা মেলার কথা জানানো হয়। দুদক এখন মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে, দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে দেশের চট্টগ্রামে ১৪টি ফ্ল্যাট, চারটি বহুতল ভবন এবং মালয়েশিয়ায় বিপণি বিতানে দামি শোরুম কিনেছেন মোহাম্মদ শাহেদ। এসব সম্পদের মূল্য অন্তত ১৫০ কোটি টাকা। এসএওসিএলের অর্থ আত্মসাৎকারী দুজনের মধ্যে সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ গত বছর করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আর মইনউদ্দিন পলাতক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মোহাম্মদ শাহেদের আত্মসাৎ করা ১৫০ কোটি টাকা পুনরুদ্ধারে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?
লক্ষ করবার মতো বিষয় হলো, মোহাম্মদ শাহেদ কেবল অর্থ আত্মসাৎই করেননি, এসএওসিএলের চাকরির বিধিমালা লঙ্ঘন করে সরকারের যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয় (আরজেএসসি) থেকে নিবন্ধন নিয়ে তিনি নিজ নামে গুডউইন পাওয়ার, ইঞ্জিনিয়ার এনার্জি অ্যান্ড ট্রেড ইন্টারন্যাশনালসহ সাতটি কোম্পানি খুলেছেন। ফলে আরজেএসসি’র পেশাদারিত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠা উচিত। কোম্পানি নিবন্ধন দেওয়ার সময় তারা কি বিধি অনুযায়ী তদন্ত করে জানতে পারেননি যে মোহাম্মদ শাহেদ একটি পাবলিক-প্রাইভেট যৌথ মালিকানা সংস্থার মহাব্যবস্থাপক? একইসঙ্গে এটাও লক্ষ করা দরকার যে, বিপিসির সঙ্গে যৌথ মালিকানার এই সংস্থাটি যে পণ্য নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদের কোম্পানি গুডউইন পাওয়ার এবং সেখানকার বেসরকারি মালিকদের প্রতিনিধি মো. মইনউদ্দিনের কোম্পানি পিরামিড এক্সিম দুটোই সমজাতীয় পণ্য অর্থাৎ লুব তেল আমদানি ও বিপণন করে থাকে।
এই দুর্নীতি প্রকাশের পর বিপিসির লোপাট হওয়া অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। সেটা অবশ্যই করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে যে প্রক্রিয়ায় এই দুর্নীতি ঘটেছে তাতে সম্পৃক্ত সব পক্ষকেই যথাযথ তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। যদিও দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ ধরনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অর্থ পুনরুদ্ধারের দৃষ্টান্ত খুবই কম। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, শতভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানাই হোক কিংবা পাবলিক-প্রাইভেট যৌথ মালিকানাতেই হোক এ ধরনের সংস্থা-প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ দেশের জনগণের অর্থেই। যেকোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাই সরকারের দায়িত্ব। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থ বেহাত হওয়া ঠেকানো এবং হয়ে থাকলে সেটা পুনরুদ্ধারই সরকারের দায়িত্ব।
