যোগ্যতা থাকার পরও নারী হওয়ায় শিক্ষক নিয়োগে না!

আপডেট : ৩০ জুন ২০২১, ০১:৫৪ এএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগ বোর্ডের সদস্যদের বিরুদ্ধে লিঙ্গবৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির রসায়ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের সাক্ষাৎকার শিটে প্রার্থীদের নামের পাশে অদ্ভুত সব মন্তব্য করেছেন নিয়োগ বোর্ডের সদস্যরা। গত ১৪ জুন অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকার বোর্ডের সভায় এক প্রার্থীর নামের পাশে মন্তব্য করা হয়, ‘“নারী” বেশি হয়ে যাচ্ছে’। আবার আরেকজনের নামের পাশে মন্তব্য করা হয় ‘স্বামী-স্ত্রী দুজন নিয়োগ পাচ্ছে’। গত ২১ জুন বিষয়টি সিন্ডিকেট সভায় উত্থাপিত হলে সমালোচনার মুখে পড়েন সাক্ষাৎকার বোর্ডের চেয়ারম্যান উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাকসুদ কামাল।

অবশ্য সমালোচনার মুখে সাক্ষাৎকার শিটের অনুলিপিটি সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হয়। সাক্ষাৎকার শিটের ওই অনুলিপি দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। সেখানে উল্লিখিত তথ্যমতে, গত বছর ৫ অক্টোবর প্রকাশিত বিজ্ঞাপন অনুযায়ী রসায়ন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে দুজন এবং প্রভাষক পদে চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এর বিপরীতে সহকারী অধ্যাপক পদে ছয় ও প্রভাষক পদে ২১ জন প্রার্থী আবেদন করেন। উপ-উপাচার্যের (শিক্ষা) অফিসে অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকার বোর্ডের সভায় সদস্যদের মধ্যে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী, বিভাগটির অধ্যাপক ড. মো. আফতাব আলী শেখ ও অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল রউফ মামুন উপস্থিত ছিলেন।

সাক্ষাৎকার শেষে মো. আতাউর রহমানকে সহকারী অধ্যাপক এবং প্রভাষক পদে মাকসুদা পারভীন, রায়হানা আফরোজ, মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান ও শতাব্দী রায়কে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাক্ষাৎকার শিট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২১ নম্বর ক্রমে থাকা মরিয়ম রহমান নামে এক প্রার্থীর নামের পাশে মন্তব্য হিসেবে লেখা হয়েছে ‘মেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে’। এ প্রার্থীর ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। সিজিপিএ ৩.৭৩ নিয়ে বিভাগটিতে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। ২০১৮ সালে একই বিভাগ থেকে সিজিপিএ ৩.৯৩ নিয়ে স্নাতকোত্তরে প্রথম স্থান অধিকার করেন। মরিয়মের দাবি, নারী হওয়ায় তাকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। দেশ রূপান্তরের হাতে থাকা শিটের তথ্যের সঙ্গে মরিয়মের দাবির মিলও পাওয়া যায়। কারণ মরিয়মের চেয়ে গড়ে কম শিক্ষাগত যোগ্যতার তিনজনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করেছে নিয়োগ বোর্ড। তাদের মধ্যে রায়হানা আফরোজ স্নাতকে সিজিপিএ ৩.৮৪ ও স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.৮১ পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। নিয়োগের সুপারিশ পাওয়া আরেক প্রার্থী মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান স্নাতকে সিজিপিএ ৩.৭০ ও স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.৯১ পেয়েছিলেন। সুপারিশ পাওয়া অন্য আরেক প্রার্থী শতাব্দী রায় স্নাতকে সিজিপিএ ৩.৭০ ও স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.৯৫ পেয়ে দ্বিতীয় হন।

মরিয়ম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নারী হওয়ার কারণে যদি আমাকে বাদ দেওয়া হয় তাহলে আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে, বঞ্চিত করা হয়েছে। আমার থেকে কম রেজাল্টের প্রার্থী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা ঠিক করা হয়নি।’

শেখ যুবায়ের জামান নামে আরেক প্রার্থীর নামের পাশে মন্তব্য হিসেবে লেখা হয়েছে ‘হাজবেন্ড, রায়হানা আফরোজ’। সাক্ষাৎকার শিটের তথ্যমতে, তার ফল স্নাতকে সিজিপিএ ৩.৭০ ও স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.৯৮। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রায়হানা আফরোজ যুবায়েরের স্ত্রী। যুবায়ের ২০১৮ সালে স্নাতকোত্তরে বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিন্ডিকেটের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের নামের পাশে এ ধরনের মন্তব্য করা ঠিক নয়। দেখলাম একটা মেয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন, অথচ মেয়ে বলে তাকে নেওয়া হলো না। তাকে নিয়ে মন্তব্য করা হলো মেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে। এটা কোন কথা! আবার আরেকজনের ক্ষেত্রে স্ত্রী নিয়োগ পেয়েছে বলে স্বামী নিয়োগ পেল না। সাক্ষাৎকার বোর্ডে প্রার্থীদের নিয়ে এমন মন্তব্য করা দুঃখজনক।’

নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা বা ফল বিবেচনা না করে লিঙ্গ বা স্বামী-স্ত্রীর মতো সম্পর্ক বিবেচনার কারণ জানতে চাইলে সাক্ষাৎকার বোর্ডের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় সবার আলাদা শিট ছিল। কে কী মন্তব্য করেছেন এটা তো জানি না। সবার শিট আলাদা ছিল, তাই কে কী লিখেছেন তা জানি না। যদি কেউ কোনো মন্তব্য করে থাকেন সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়।’

এ প্রসঙ্গে মন্তব্য জানতে সাক্ষাৎকার বোর্ডের চেয়ারম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাকসুদ কামালের মোবাইল ফোনে গত এক সপ্তাহে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এর মধ্যে গত ২৬ জুন দুপুরে ও বিকেলে এই প্রতিবেদক তার দপ্তরে (উপ-উপাচার্য কার্যালয়) বক্তব্য জানতে গেলে দপ্তরটির অফিস সহকারী বলেন, ‘স্যার মিটিংয়ে আছেন, পরে আসেন।’ পরে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে এই প্রতিবেদক ফের মাকসুদ কামালের দপ্তরে তার বক্তব্য জানতে গেলে তাকে সেখানে পাননি। এর আগে একইদিন সকালে কল করার কারণ জানিয়ে (নিয়োগ বোর্ডের সুপারিশ ও প্রার্থীদের নামের পাশে লেখা অদ্ভুত সব মন্তব্য সম্পর্কে বক্তব্য) মাকসুদ কামালের মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘সিন্ডিকেটে তো অনেক বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়। তবে এটা (রসায়ন বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ) এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত