বাংলাদেশে জাতীয় থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত যেকোনো নির্বাচন মানেই সরকারি দলের একতরফা জয়। অনেকেই বলতে পারেন, বিএনপি নির্বাচনের মাঠে থাকে না, তাদের এজেন্টরা ভোটকেন্দ্রে যায় না, ক্যাডার দিয়ে কেন্দ্র পাহারা দেয় নাআর তাই আওয়ামী লীগ একচেটিয়া নির্বাচনের দখল নেয়। গণতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরে দাঁড়িয়ে এই ধরনের কথা শুধু বিস্মিতই না, দুঃখিতও করে। এখনো যদি পেশিশক্তি আর পাহারা দিয়ে কেন্দ্র দখলে রাখতে হয়, ক্যাডার দিয়ে প্রতিপক্ষের মাথা ফাটিয়ে মাঠের দখল নিতে হয়, তাহলে কী ধরনের নির্বাচনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো দেশে? এমনকি পাকিস্তান আমলেও তো নির্বাচন মানে মল্লযুদ্ধ ছিল না। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই রাজনীতিতে শক্তির প্রয়োগ প্রচলিত এবং বহু পুরনো তাহলেও একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। একটি রাজনৈতিক দল তার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে মোকাবিলা করতে পারে; কিন্তু তাকে যদি বছরের পর বছর পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র মোকাবিলা করতে হয় তখন বিষয়টা কেমন দাঁড়ায়? বাংলাদেশে গত এক যুগের বেশি সময় বিএনপিকে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হচ্ছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দ্য ইলেক্টোরাল ইনটিগ্রিটি প্রজেক্ট ২০১৯’ তার রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেখানে নির্বাচনের মানের বিবেচনায় বাংলাদেশের স্কোর ৩৮, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। সারা পৃথিবীতেই বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ নির্বাচন হয় মাত্র ২১টি দেশে। এই স্টাডিতে বাংলাদেশের শুধু ২০১৪ সালের নির্বাচনকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের তথাকথিত নির্বাচন বিবেচনায় নেওয়া হলে বাংলাদেশ সম্ভবত থাকত বিশ্বের সর্বশেষ অবস্থানে। বলে রাখি, ফ্রিডম হাউজের সর্বশেষ রিপোর্টে ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসির তালিকায় বাংলাদেশ আর নেই, যার অর্থ হচ্ছে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার লেশমাত্র নেই বাংলাদেশে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মতে বাংলাদেশে এখন হাইব্রিড রেজিম, ফ্রিডম হাইজের মতে আংশিক মুক্ত, কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশ আসলে একটি স্বৈরতান্ত্রিক দেশ, যা ২০১৮ সালেই জার্মান গবেষণা সংস্থা বেরটেলসম্যান স্টিফস্টুং পরিষ্কার ভাষায় ব্যক্ত করেছে। ২০২০ সালে প্রকাশিত এই সংস্থার দেশভিত্তিক বেরটেলসম্যান ট্রান্সফরমেশন ইন্ডেক্সে (বিটিআই) বিএনপি সরকারের শেষ বছর, ২০০৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন সূচকের তুলনা করলে দেখা যায় নির্বাচন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার সম্পর্কিত ২০টি সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমাগত নিম্নমুখী।
বাংলাদেশের স্বৈরতান্ত্রিকতার স্বীকৃতি এখন আসছে নানা দিক থেকে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ ৭টি মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্র্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। কিছুদিন আগে আবারও একই ধরনের অভিযোগ তুলে জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ১০টি মানবাধিকার সংস্থা। একটি দেশে যখন কর্র্তৃত্ববাদী, স্বৈরতান্ত্রিক সরকার থাকে তখন তার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ সেখানে মানবাধিকার, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমশই সংকুচিত হতে থাকে। ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়, ভিন্নমত রুদ্ধ হতে থাকে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে মানুষ এখন লিখতে ভয় পায়, বলতে ভয় পায়, স্বাধীনভাবে নিজের মতপ্রকাশ করতে ভয় পায়, হয়তোবা চিন্তা করতেও ভয় পায়। এটা এমন একসময় যখন বুদ্ধিজীবীরাও সত্য সঠিক কথা বলতে দ্বিধাবিভক্ত হন। যাদের জাতিকে পথ দেখানোর কথা তারা ক্ষুদ্র স্বার্থ আর হিসাবনিকাশ কিংবা স্রেফ ভয়ে সরকারের সুরে কথা বলে অথবা চুপ থাকে। ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী সুবিধাবাদিতায় মুখ গুঁজেছেন’। তার ভাষায় ‘বুদ্ধিজীবীরা চামচাগিরি করছেন, মীরজাফরি করছেন। বুদ্ধিজীবীরা তাদের দায়িত্ব পালন না করে উল্টো কাজ করছেন’। এর মধ্যে যে দু-একজন ভীষণ ব্যতিক্রম আছেন, গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাদের অন্যতম। সম্প্রতি তিনি শিরোনাম হয়েছেন এই কঠিন দুঃসময় বিএনপির হাল যিনি শক্ত হাতে ধরেছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে একটি মন্তব্যের মধ্য দিয়ে। দল হিসেবে বিএনপির সহনশীলতা, দলটির নেতাকর্মীদের সহনশীলতার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে যদি আমরা ফিরে তাকাই বিএনপির শাসনকাল ১৯৯১-৯৬ কিংবা ২০০১-০৬ সালের দিকে। সেই সময় আজকের মতো সরকারি সংস্থার রক্তচক্ষু, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের শতেক ধারা কিংবা অলিখিত নিয়ম মেনে সরকারের সমালোচনাকারীদের গুমের সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কিংবা তার পরিবার নিয়ে বহু মিথ্যা সমালোচনা এমনকি ভয়ানক প্রোপাগান্ড বহু তথাকথিত সুশীল, বুদ্ধিজীবীকে নির্বিচারে করতে দেখেছি। এমন কোনো দিন নেই যেদিন দৈনিক সংবাদপত্রের প্রথম পাতা প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের কার্টুন দিয়ে শুরু হয়নি। কই তখন তো শুনিনি কারও নামে মামলা হতে, কোনো পত্রিকা বন্ধ হতে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কিংবা কোনো বুদ্ধিজীবীর এতটুকু সমস্যা হতে। এখন তো পরিষদ গঠিত হয়েছে কে, কোথায়, কখন, কোন ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সরকারের সমালোচনা করছে তা খুঁজে বের করে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে। আর সংবাদপত্রের কার্টুন? তার সমাধি হয়েছে ২০১৪ সালেই।
বিএনপির মতো বহুত্ববাদী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, অতি সহনশীল একটি দলের ছাত্র সংগঠনের একজন নেতা কেন তবে প্রতিবাদ করলেন সেদিন ডা. জাফরুল্লাহর সমালোচনার? এর কয়েকটি কারণ আছে বলে আমি মনে করি।
প্রথমত, ১২ বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে প্রধান বিরোধী এই দলটিকে ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়েছে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণ বিনা অপরাধে স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ২ বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে। এই বয়সে এসে শারীরিক অসুস্থ অবস্থায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটুকু থেকে বঞ্চিত তিনি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশে ফিরতে পারছেন না। দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত মামলার পাহাড়। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও খুন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এখন নিত্যদিনের রুটিন। এসব কিছু সরিয়ে বাজেটের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে হঠাৎ করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে নিয়ে কটূক্তি দলের কর্মীদের আঘাত দিতেই পারে।
দ্বিতীয়ত, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে বিতর্কিত করার প্রচেষ্টা এ দেশে বহুদিন ধরে চলছে। যে দলটি গত এক যুগে দেশ থেকে ভোটব্যবস্থা বিদায় করে প্রশাসন আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করে ক্ষমতায় আছে তার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার সাহস বেশির ভাগ গণমাধ্যম আর সুশীল সমাজের নেই। তারা আজকে ঘটা গুমের জন্য ১৪ বছর আগে ক্ষমতা থেকে যাওয়া বিএনপিকে দায়ী করেন। ন্যূনতম বিবেক বা লজ্জা তাদের নেই। এর মধ্যে অল্প যে কজন সত্য বলার চেষ্টা করেন, প্রতিবাদ করেন ডা. জাফরুল্লাহ তাদের একজন। তাই তার কাছে মানুষের প্রত্যাশাও বেশি। তিনি যখন অপ্রাসঙ্গিকভাবে বিএনপির প্রধানকে আঘাত করেন, তখন সেই আঘাত দলের প্রতিটি কর্মীর বুকে লাগে।
তৃতীয়ত, দুঃসময়ের টিকে থাকা সুসময়ের বিপ্লবের শামিল। দেশি-বিদেশি চক্রান্ত মোকাবিলা করে যেভাবে বিএনপি দেশের কোটি মানুষের একমাত্র আশার আলো হয়ে টিকে আছে শুধু সেজন্যই সে অভিবাদন পেতে পারে। আর এই টিকে থাকা যার নেতৃত্বে তাকে করা আঘাত কর্মীরা দলের ওপর আঘাত বলেই ধরে নেবে।
চতুর্থত, এ মুহূর্তে বিরোধী দল বা মতের যেকোনো সমালোচনাই দিনের শেষে এ সরকারের হাতকে শক্তিশালী করবে। এটা দেশ ও জাতিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময়, পারস্পরিক সমালোচনা আর বিভেদের সময় না। পঞ্চমত, বিএনপি প্রতিটি নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করে। খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা, চিকিৎসক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমাদের সবারই শ্রদ্ধার মানুষ। তিনি চাইলে যেকোনো সময়ই তার পরামর্শ দলকে দিতে পারেন। চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকেও জানাতে পারেন। কিন্তু সেই পরামর্শ দেওয়ার জায়গা প্রেস ক্লাব হওয়া এ মুহূর্তে কতটা সমীচীন সে ভার আমি তার ওপরই ছেড়ে দিলাম।
নিশ্চিতভাবেই বিএনপি একেবারে নিখুঁত কোনো দল নয়; পৃথিবীতে ‘নিখুঁত দল’ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। এই জাতির ইতিহাসের চরমতম স্বৈরাচারী সময়টায় বিএনপি তার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এই লড়াইয়ে পদ্ধতিগতভাবে বিএনপির আর কোথায় কোথায় উন্নতির জায়গা আছে, সেটি নিয়ে আলোচনা হোক, কিন্তু এমন কোনো অযৌক্তিক সমালোচনা বিএনপির হওয়া উচিত না, যেটা প্রকারান্তরে বিএনপি নেতাকর্মীদের হতোদ্যম করে এবং দেশের মানুষকে আশাহত করে। আর সেটা হওয়া মানেই হলো এই রাষ্ট্রের ওপরে প্রচণ্ডভাবে চেপে বসা কর্তৃত্ববাদকে আরও শক্তিশালী করা।
লেখক আইনজীবী, সংসদ সদস্য ও বিএনপিদলীয় হুইপ
